আজকাল ওয়েবডেস্ক: প্রকৃতির এক আকস্মিক ও প্রলয়ঙ্করী তাণ্ডবে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। গত বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প আছড়ে পড়ে দেশের উত্তর ও মধ্য উপকূলীয় অঞ্চলে। রিখটার স্কেলে প্রথম কম্পনটির মাত্রা ছিল ৭.২ এবং তার ঠিক পরেই ধেয়ে আসে ৭.৫ মাত্রার প্রধান ভূকম্পনটি, যা গত ১২৫ বছরের মধ্যে সে দেশে হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এই জোড়া ধাক্কায় বা 'ডাবলেট আর্থকোয়েক'-এ রাজধানী কারাকাস এবং উপকূলীয় প্রদেশ লা গুয়াইরাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার শয়ে শয়ে বহুতল ও ঘরবাড়ি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিপর্যয় এ পর্যন্ত অন্তত ৫৮৯ জন মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এছাড়া আহতের সংখ্যা প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে প্রশাসন।
সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে উত্তর উপকূলের বন্দর শহর লা গুয়াইরাতে, যাকে ইতিমধ্যেই ‘দুর্যোগ কবলিত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সংস্থা (OCHA) জানিয়েছে, শুধুমাত্র লা গুয়াইরা অঞ্চলেই আড়াইশরও বেশি বহুতল আবাসিক ভবন পুরোপুরি ধসে গেছে, যার মধ্যে 'রিতাসল প্যালেস' এবং সমুদ্রতীরের বিলাসবহুল 'এডুয়ার্ডস হোটেল'-এর মতো বড় বড় ইমারত রয়েছে। রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দর ‘সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সমস্ত বিমান চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, রাজধানী কারাকাসের আলতামিরা এবং লস পালোস গ্র্যান্ডেসের মতো অভিজাত এলাকাগুলোতে অন্তত ৩০টি বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। লস পালোস গ্র্যান্ডেসের একটি ১৪ তলা আবাসিক ভবনের ওপরের তলাগুলো ভেঙে নিচে পড়ে যায়। ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, ভেনিজুয়েলার সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার দূরে ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চল এবং কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতাতেও তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে, যার জেরে সেখানেও আতঙ্কিত মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
বিপর্যয়ের পর দুই দিন পার হয়ে গেলেও ধসে পড়া কংক্রিটের স্তূপের নিচে আটকে থাকা জীবিত মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা এখন সময়ের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছেন। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ধুলো আর রক্তে মাখা শরীরে সাধারণ মানুষ নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ সরাতে হাত লাগিয়েছেন। বিপর্যয়ের ভয়াবহতা অনুধাবন করে আন্তর্জাতিক মহলও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইতিমধ্যেই ভেনিজুয়েলার জন্য ১৫ কোটি ডলারের জরুরি আর্থিক ও মানবিক সহায়তা ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মাধ্যমে ত্রাণ বণ্টন এবং দুটি বিশেষ আরবান সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ টিম পাঠানো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও মেক্সিকো থেকে ২৫০ জন সামরিক উদ্ধারকর্মী ও প্রশিক্ষিত কুকুর এবং এল সালভাদর থেকে ১৫০ জন ত্রাণকর্মী চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ভেনিজুয়েলায় পৌঁছেছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনো কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়ার কথা জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা, তাই উদ্ধারকাজ যত এগোবে, ক্ষয়ক্ষতির এবং মৃত্যুর এই খতিয়ান আরও কয়েক গুণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মহল।















