আজকাল ওয়েবডেস্ক: আপাতত আসার আলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া, হরমুজ প্রণালী নিয়ে তৈরি নতুন করে জটিলতা নিষ্পত্তির জন্য আগামী মঙ্গলবার কাতারে এই দুই দেশের প্রতিনিধিরাবৈঠকে বসবেন। একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এই তথ্য প্রকাশ করেছে ‘অ্যাক্সিওস’। বিগত কয়েক দিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপকে আক্রমণ করছে। ফলে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি আগে মধ্য এশিয়ায় ফের যুদ্ধের আশঙ্কা জোরদার হয়েছে। সাম্প্রতিক এই সামরিক সংঘাত ও উত্তেজনার পর দুই দেশের হামলা বন্ধে সম্মত হওয়া ও হরমুজ জট খুলতে আলোচনায় বসার উদ্যোগই প্রথম বড় ধরনের কূটনৈতিক অগ্রগতি। 

মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহায় আলোচনা এগিয়ে চলার সময় দুই পক্ষই সামরিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে। মার্কিন ওই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, “আমরা সব ধরনের সামরিক সংঘাতমূলক কার্যক্রম (কাইনেটিক অ্যাক্টিভিটি) বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

কাতারের রাজধানীতে হওয়া এই বৈঠকে বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ (হরমুজ প্রণালী) নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে হওয়া বিভিন্ন হামলার ফলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পৃথকভাবে রয়টার্স জানিয়েছে যে, গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪-দফা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) কাঠামোর আওতায় উভয় পক্ষের মধ্যে কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

রয়টার্স এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানায়, “এমওইউ-এর আওতাভুক্ত সব বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকবে। আপাতত উভয় পক্ষই সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে এবং জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করতে পারবে।” উল্লেখ্য, এই চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালী ফের নৌ-চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীতে একটি কার্গো জাহাজে ইরানের ছোড়া প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর সংঘাত নতুন করে শুরু হয় এবং উভয় দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।

রবিবার ভোরে কুয়েত ও বাহারিনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর ঠিক আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন যে, সংঘাত অবসানের চুক্তি মেনে চলতে ব্যর্থ হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের “অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।”

হরমুজ প্রণালীতে একটি ট্যাঙ্কারে আঘাতের কয়েক ঘণ্টা পরই মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালায়। হরমুজ প্রণালীটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিবহনের একটি প্রধান পথ, যা সংঘাত চলাকালে তেহরান অনেকাংশে বন্ধ করে রেখেছিল।

'অ্যাক্সিওস'র প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করতে পারে। ট্রাম্প লেখেন, “এমন এক সময় আসতে পারে যখন আমরা আর নমনীয় বা যৌক্তিক আচরণ করতে পারব না এবং অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করা কাজটির সামরিক সমাপ্তি টানতে বাধ্য হব।” তিনি আরও যোগ করেন, “যদি তেমনটা ঘটে, তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না!”

কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বাধা
১৭ জুনের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির লক্ষ্য ছিল সংঘাত বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি-সহ বৃহত্তর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করা। সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে ইতিমধ্যে এক দফা আলোচনা হয়েছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মহম্মদ বাকের কলিবফ।
সেই থেকে ওয়াশিংটন, তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সামরিক সংঘাত পুনরায় শুরু হয় এবং তীব্র আকার ধারণ করে।

ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে যে, তাদের নৌ ও বিমান বাহিনী কুয়েত ও বাহারিননে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মার্কিন হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।

আইআরজিসি সতর্ক করে দিয়েছে যে, মার্কিন হামলার ফলে "সমস্ত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।" একইসঙ্গে তাদের নৌ-কমান্ড জানিয়েছে, ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে "আগামী দিনগুলোতে নরকযন্ত্রণার মুখোমুখি হতে হবে।"

একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন যে ইরান মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করেছিল। তবে তিনি জানান, এতে কোনও মার্কিন নাগরিক হতাহত বা বড় ধরনের কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। যদিও পরিস্থিতি ঘন ঘন বদলাচ্ছে।

উত্তেজনা অব্যাহত
লেবাননের সঙ্গে সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও শনিবার একটি হামলার পর, রবিবার ইজরায়েল দক্ষিণ লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লার পরিকাঠামো লক্ষ্য করে আবারও হামলা চালিয়েছে। ইরান বরাবরই বলে আসছে যে, বৃহত্তর আঞ্চলিক চুক্তি টিকিয়ে রাখতে হলে লেবাননের সংঘাত অবশ্যই বন্ধ হতে হবে।

অন্যদিকে, বাহারিন জানিয়েছে যে, ইরানের হামলায় মুহাররাক প্রদেশে একটি আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে এতে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। দেশটি এ বিষয়ে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে কুয়েত সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা দু'টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং এতে কোনও হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
পাশাপাশি কাতার নিশ্চিত করেছে যে, ওই অঞ্চলে সামরিক অভিযানের কবলে পড়া একটি জাহাজে থাকা তাদের এক নাগরিক শার্পনেলের আঘাতে মারা গিয়েছেন এবং আরেকজন আহত হয়েছেন।