আজকাল ওয়েবডেস্ক: একটি মশা আপনার শরীরে বসে রক্ত চুষে উড়ে গেল। কয়েক দিনের মধ্যেই আপনার জ্বর, শরীরব্যথা বা ডেঙ্গুর মতো গুরুতর ভাইরাসজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। কিন্তু যে মশাটি ভাইরাস বহন করছিল, সেটি নিজে কখনও অসুস্থ হয় না। বরং সারাজীবন সেই ভাইরাস বহন করে একের পর এক মানুষকে সংক্রমিত করতে থাকে। বহুদিন ধরেই এই বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য ছিল। এবার সেই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে পেয়েছেন স্পেনের গবেষকরা।


স্পেনের বার্সেলোনার পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সম্প্রতি মশার কোষে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস কীভাবে টিকে থাকে, তা নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষণার নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকিউলার ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান জুয়ানা দিয়েজ। তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে, মশার শরীরে প্রবেশ করার পর ভাইরাস নিজের কার্যকলাপ ইচ্ছাকৃতভাবে অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এই কৌশলের ফলেই মশার কোষ ধ্বংস হয় না এবং মশাও সুস্থ থাকে।


গবেষকরা দেখেছেন, ভাইরাসের জিনগত উপাদান মশার কোষে প্রচুর পরিমাণে জমা হলেও সেই তথ্য থেকে ভাইরাসের প্রোটিন খুব কম তৈরি হয়। অর্থাৎ ভাইরাস নিজের বংশবৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে 'ট্রান্সলেশনাল রিপ্রেশন' নামে চিহ্নিত করেছেন।


গবেষকদের মতে, এটি অনেকটা এমন, যেন ভাইরাস নিজেই নিজের কার্যকলাপের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে মশার কোষে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয় না, কোষের শক্তি বজায় থাকে এবং কোষ স্বাভাবিকভাবে বিভাজিত হতে পারে। তাই ভাইরাস সারাজীবন মশার শরীরে থাকলেও মশা অসুস্থ হয়ে পড়ে না।


অন্যদিকে মানুষের শরীরে একই ভাইরাস সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণ করে। মানুষের কোষে প্রবেশ করার পর ভাইরাস দ্রুত কোষের প্রোটিন তৈরির যন্ত্র দখল করে নেয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণে নিজের কপি তৈরি করতে শুরু করে। এর ফলে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের লক্ষণ দেখা দেয়।


গবেষণায় আরও জানা গেছে, মানুষের শরীরে ভাইরাস দুটি বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে। একটি ভাইরাল প্রোটিন কোষের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে প্রবেশ করে স্বাভাবিক জিনের কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি ভাইরাস কোষের প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়াকেও নিজের অনুকূলে বদলে নেয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মশার কোষে এই দুটি কৌশলের কোনওটিই কাজ করে না। ফলে ভাইরাস সেখানে ধীরগতিতে টিকে থাকে এবং কোষকে ধ্বংস করে না।


গবেষকদের মতে, ভাইরাসের এই আত্মসংযমই তার সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার ভবিষ্যতে এটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যদি এমন কোনও প্রযুক্তি তৈরি করা যায়, যার মাধ্যমে ভাইরাসকে মশার শরীরে অতিরিক্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে বাধ্য করা যায়, তাহলে ভাইরাসই মশার কোষ ধ্বংস করতে পারে। আবার ভাইরাসের দীর্ঘদিন টিকে থাকার ক্ষমতা নষ্ট করলেও মশার মাধ্যমে রোগ ছড়ানো বন্ধ করা সম্ভব হতে পারে।


তবে গবেষকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই গবেষণা এখনও পরীক্ষাগারের কোষভিত্তিক পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তবে মশার শরীরে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রযুক্তি এখনও তৈরি হয়নি। তবুও এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং অন্যান্য মশাবাহিত ভাইরাস প্রতিরোধে নতুন ও কার্যকর চিকিৎসা বা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি তৈরির পথ খুলে দিতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

&t=1s