আজকাল ওয়েবডেস্ক: আরও ক্ষমতাধর মার্কিন প্রেসিডেন্ড ডোলান্ড ট্রাম্প। ঐতিহাসিক রায়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ, নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে প্রেসিডেন্ট ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (এফটিসি) সদস্যদের বরখাস্ত করতে পারেন। এই রায়ের ফলে, স্বাধীন ফেডারেল সংস্থাগুলোর ওপর রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেল, সেই সঙ্গেই বাতিল হয়ে গেল ১৯৩৫ সালের একটি যুগান্তকারী নজির।
এই রায় হোয়াইট হাউস এবং স্বাধীন সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। এটি নির্বাহী বিভাগের বড় অংশের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণকেও শক্তিশালী করে, তবে আদালত স্পষ্ট করেছে যে- এই সিদ্ধান্তকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বা তা দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
৬-৩ ব্যবধানের এই সিদ্ধান্তটি আদর্শগত বিভাজনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করেছে এবং তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেছেন।
আদালত ৯১ বছরের পুরোনো নজির বাতিল করল
রেবেকা স্লটারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই মামলা হয়। রেবেকা ডেমোক্র্যাটিক দলের সদস্য এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মারফৎ এফটিসি কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। নীতিগত মতপার্থক্যের জেরে ট্রাম্প রেবেকা স্লটারকে বরখাস্ত করেছিলেন। যদিও একটি ফেডারেল আইনে বলা ছিল যে, এফটিসি কমিশনারদের কেবল অদক্ষতা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা অসদাচরণের মতো সুনির্দিষ্ট কারণে অপসারণ করা যেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে, ওই সুরক্ষাব্যবস্থাগুলো মার্কিন সংবিধানের লঙ্ঘন, কারণ সেগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতাকে সীমিত করে।
সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে রায় লেখার সময় প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, রেবেকা স্লটারকে অপসারণের বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত "খুব একটা জটিল বা বিতর্কিত বিষয় ছিল না" (অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি ছিল স্পষ্ট)।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচারপতি রবার্টস লেখেন, "এফটিসি-র কর্মকর্তাদের 'সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া অপসারণ করা যাবে না' - এমন বিধান ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির লঙ্ঘন। বর্তমান কাঠামোয় এফটিসি প্রায় ৮০টি আইন প্রয়োগ ও পরিচালনা করে, যা আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি দিককে স্পর্শ করে। সংস্থাটি যেসব কাজ সম্পাদন করে তা হল 'আইন বাস্তবায়নের মূল নির্যাস'—যা মূলত প্রেসিডেন্টের সাংবিধানিক দায়িত্ব।"
এই রায়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে 'হামফ্রিস এক্সিকিউটর বনাম ইউনাইটেড স্টেটস' মামলাটির ১৯৩৫ সালের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হল। ওই সিদ্ধান্তে কংগ্রেসকে কিছু স্বাধীন সংস্থার প্রধানদের রাজনৈতিক বা নীতিগত কারণে বরখাস্ত হওয়ার হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্পের 'বড় জয়' উদযাপন
ট্রাম্প দ্রুতই এই রায়কে স্বাগত জানান এবং এটিকে কয়েক দশকের মধ্যে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার বিষয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসিডেন্ট এই রায়কে একটি "বড় জয়" হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এই রায়টি "আমাদের দেশে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের অধীনে নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সংস্থার নিয়োগপ্রাপ্ত বা প্রতিনিধিদের অপসারণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে" নিশ্চিত করেছে।
ট্রাম্প লিখেছেন, "১৯৩০-এর দশক থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা এই ধরনের একটি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন।" তিনি আরও বলেন, "প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার বিষয়ে দেওয়া এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রায়।"
প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে এই রায় একটি বড় জয়। এটি "ইউনিটারি এক্সিকিউটিভ" বা "একক নির্বাহী" তত্ত্বকে শক্তিশালী করে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সংবিধান মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে নির্বাহী বিভাগের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে, যার মধ্যে কংগ্রেসের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও স্বাধীন সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের অপসারণের ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত।
ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের বিষয়ে বিচারপতিদের সতর্কতা
আদালতের তিনজন উদারপন্থী বিচারপতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের সঙ্গ তীব্র দ্বিমত পোষণ করেছেন। বিচারপতি সোনিয়া সোটোমায়র (যাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিচারপতি এলেনা কাগান ও কেটানজি ব্রাউন জ্যাকসন) সতর্ক করে বলেন যে, এই সিদ্ধান্ত ফেডারেল সরকারের কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনবে।
রয়টার্সের তথ্যমতে, সোটোমায়র লিখেছেন, "সহজ কথায় বলতে গেলে, আজ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতি আমাদের সরকারের কাঠামো নতুন করে সাজাচ্ছেন। এখন ডজন ডজন স্বাধীন কমিশন সম্ভবত পুরোপুরি নির্বাহী সংস্থায় পরিণত হতে পারে, যার ফলে আমেরিকানদের জীবনের বিশাল অংশের ওপর ব্যাপক ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে চলে যাবে।"
ভিন্নমত পোষণকারী বিচারপতিরা আরও যুক্তি দেন যে, এই রায় প্রেসিডেন্টকে এমন এক ক্ষমতা প্রদান করে "যা এমনকি সেই ব্রিটিশ রাজতন্ত্রেরও ছিল না, যার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা বিদ্রোহ করেছিলেন।"
সিদ্ধান্তটি ঘোষণার পর স্লাটারও এর সমালোচনা করেন। সিএনবিসি-র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন যে- তিনি হতাশ এবং "হতবাক হয়েছেন যখন আদালত ৯১ বছরের পুরনো একটি সর্বসম্মত নজির বাতিল করে দিল- যে নজিরটি আমাদের অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাঠামো গঠনে ভূমিকা রেখেছিল।"
স্লাটার বলেন, "আমার মতে, এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তা ঠিক সেভাবেই বোঝা যায় যেভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন—এটি নজিরবিহীন।" তাঁর কথায়, "এটি কংগ্রেসের হাত থেকে বিপুল পরিমাণ ক্ষমতা সরিয়ে প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দিচ্ছে, যাতে তিনি এমনভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন যা সাধারণ আমেরিকানদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে ধনী ও ক্ষমতাবানদের সুবিধা দেবে।"
ফেডারেল রিজার্ভ সুরক্ষিতই থাকছে
এফটিসি-র ওপর ট্রাম্পের ক্ষমতা বাড়ালেও, সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ফেডারেল রিজার্ভের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রেখেছে। একই দিনে দেওয়া আরেকটি রায়ে আদালত ফেডারেল রিজার্ভের গভর্নর লিসা কুককে অপসারণের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ইচ্ছাকে অনুমোদন দেয়নি, যার ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। বিচারকরা উল্লেখ করেছেন যে ফেডারেল রিজার্ভ একটি অনন্য সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক অবস্থানে রয়েছে এবং তাঁরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সোমবার এফটিসি-র নেওয়া সিদ্ধান্তটি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়।















