আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফুটবল বিশ্বকাপের চেনা উন্মাদনার মাঝেই এবার বাংলাদেশের বুকে এক অদ্ভুত ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, মিরপুর, ফরিদপুর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত দিনাজপুর—সবখানেই বাড়ির ছাদ কিংবা রাস্তার মোড়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিকার পতাকার পাশাপাশি হঠাৎ করেই দেখা মিলছে ‘কালেমা’ খচিত কালো ও সাদা রঙের পতাকার। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের কাছে এটি একটি ধর্মীয় প্রতীক মনে হলেও, এর পেছনের সুগভীর রাজনৈতিক ও উগ্রপন্থী সংযোগ দেশের নিরাপত্তা মহলকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। কারণ, এই পতাকার একটির নকশা আফগানিস্তানের তালেবানের মতো, অন্যটি আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর ব্যবহৃত পতাকার সাথে হুবহু মিলে যায়।

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার একটি ফ্লাইওভারে প্রথম এই পতাকাগুলো দেখা যাওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে একের পর এক মোটরসাইকেল মহড়া ও মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও এই মিছিলগুলো হচ্ছে 'তৌহিদী জনতা'র ব্যানারে, যাদের বিরুদ্ধে গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার, সুফি প্রতিষ্ঠান ও বাউলদের ওপর বর্বরোচিত হামলার অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ সালে নিষিদ্ধ হওয়া উগ্রপন্থী সংগঠন ‘হিযবুত তাহরীর’ গত বছর ঢাকার প্রধান মসজিদের সামনে বিশাল সমাবেশ করার পর থেকে যেভাবে তরুণদের মাঝে নিজেদের জাল বিস্তার করছে, তাতে এই পতাকা সংস্কৃতির পেছনে তাদের হাত থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। উগ্রপন্থী নেতারা প্রকাশ্যেই যুক্তি দিচ্ছেন যে বিশ্বকাপে ভিনদেশি পতাকা উড়তে পারলে কালেমার পতাকা কেন উড়ানো যাবে না, যা মূলত সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে বিদেশি চরমপন্থী সংস্কৃতিকে মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করার একটি বিপজ্জনক কৌশল।

এই আকস্মিক পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকেই হুমকিতে ফেলেনি, বরং প্রতিবেশী দেশ ভারতের কপালেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের এক বিশাল ও সংবেদনশীল সীমান্ত রয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বাংলাদেশে যদি এই ধরনের বিদেশি জিহাদি ভাবাদর্শ ডালপালা মেলার সুযোগ পায়, তবে তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর। বিশেষ করে সম্প্রতি উগ্র ভারত-বিরোধী এবং উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য আলোচিত কিছু তরুণ নেতার এমন পতাকার সাথে জড়ানো নাম পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, দেশজুড়ে এই পতাকা প্রদর্শনের হিড়িক আসলে কোনও  বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি কোনও  উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর নিজেদের উপস্থিতি ও শক্তির জানান দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত 'মহড়া' হতে পারে। বিগত রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের জন্য এটি এখন এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। এই ক্রমবর্ধমান উগ্রবাদের বিস্তারকে এখনই শক্ত হাতে দমন করা না গেলে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক যেমন ঝুঁকির মুখে পড়বে, তেমনই দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতেও এর বড় ধরনের খেসারত দিতে হতে পারে।