আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডিজিটাল যুগে এক অদ্ভুত এবং কিছুটা করুণ দৃশ্য দেখা গেল রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে। চাকরি বাঁচানোর তাগিদে, কেবল মাত্র অনলাইনে হাজিরা (অ্যাটেনডেন্স) দেওয়ার জন্য পাহাড়ে উঠে একটি আম গাছে চড়তে হল এক প্রধান শিক্ষককে! গত ১৬ জুনের এই ঘটনাটি ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছে, যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার নেটওয়ার্কের বেহাল দশা।
ঘটনাটি ঘটেছে বাঘাইছড়ি উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য সরকার একটি নতুন নিয়ম চালু করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে স্কুলে পৌঁছে উপস্থিতির খাতার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে পাঠাতে হবে। আর এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার প্রথম দিনেই চরম বিপাকে পড়েন ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহের।
আবু তাহের জানান, তাঁর স্কুলটি উপত্যকার প্রায় ৪০০ ফুট ভেতরে অবস্থিত। সেখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক প্রায় থাকেই না বললে চলে। এমনকি স্কুলের ছাদের ওপর উঠলেও সিগন্যাল মেলে না। তাই বাধ্য হয়েই তিনি কাছের একটি পাহাড়ে ওঠেন। সেখানেও বেশ কয়েকটি জায়গায় চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর, শেষমেশ একটি আম গাছে চড়ে তবেই মোবাইলে সিগন্যাল পান তিনি। অনেক কসরত করে অবশেষে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে উপস্থিতির খাতার ছবিটি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে পাঠাতে সক্ষম হন।
কিন্তু এত কষ্ট, এত লড়াইয়ের পরও তাঁকে শুনতে হয়েছে তিরস্কার! কারণ, নেটওয়ার্ক খুঁজতে খুঁজতেই তাঁর হাজিরা পাঠাতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। আক্ষেপ করে ওই শিক্ষক বলেন, কেবল চাকরিটা বাঁচাতেই তাঁকে এই জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। এই বেতনের ওপরই তাঁর পুরো পরিবার নির্ভরশীল, চাকরিটা গেলে পরিজনদের নিয়ে তাঁকে পথে বসতে হবে।
বাঘাইছড়ি উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সঞ্চয়ন চাকমা জানিয়েছেন, নতুন নিয়মের প্রথম দিন ১১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৮টি স্কুল থেকে অনলাইনে হাজিরা পাওয়া গেছে। দুর্গম এলাকার কারণে বাকি ২৮টি স্কুলের ৮৩ জন শিক্ষকের তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, যেখানে ফোর-জি (4G) নেটওয়ার্ক আছে সেখানে হোয়াটসঅ্যাপে, আর যেখানে ইন্টারনেট নেই সেখানে এসএমএসের মাধ্যমে হাজিরা নেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনে এই ব্যবস্থায় সবার অংশগ্রহণ আরও বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী।
তবে এই বাস্তবতায় জেলা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি নাজির আহমদ তালুকদারের গলায় শোনা গেছে উদ্বেগের সুর। তিনি বলেন, রাঙামাটির মতো পাহাড়ি এলাকায় অনলাইনে হাজিরা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ এখানকার অনেক জায়গায় এখনও বিদ্যুৎ বা মোবাইলের ন্যূনতম নেটওয়ার্কটুকুও পৌঁছায়নি। তাই এই দুর্গম অঞ্চলগুলোর জন্য সরকারের কাছে বিশেষ বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কফিল উদ্দিন জানিয়েছেন, বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ ও এসএমএসের মাধ্যমে হাজিরা সংগ্রহ করা হচ্ছে। নেটওয়ার্কের আওতার বাইরের এলাকার তথ্যগুলো ঢাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে, যাতে তারা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
প্রযুক্তির এই যুগে একদিকে যখন আমরা সব কিছু ডিজিটাল করার কথা বলছি, তখন স্রেফ নিজের ডিউটি পালন করতে গিয়ে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকের গাছে চড়ে হাজিরা দেওয়ার এই দৃশ্য আমাদের অনেক কিছু ভাবতে বাধ্য করে।















