আজকাল ওয়েবডেস্ক: স্বাক্ষরিত ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তি। সেই চুক্তি মেনেই আগামী ৬০ দিন চীনের বাইরে অন্যান্য দেশের বাজারে আবারও তেল রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে ইরান। এই সুযোগে ভারতের মতো এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশগুলির সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ শুরু করেছে তেহরান। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার আগে থেকেই ইরানের তেল বিক্রেতা, মধ্যস্থতাকারী এবং 'ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি'র প্রতিনিধিরা ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার তেল শোধনাগারগুলির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজেদের তেলের বিশাল মজুত খালি করা এবং ফের ব্যবসাবাণিজ্য চালু করার জন্য তেহরান যে মরিয়া, তা আন্দাজ করা যায়। মূলত সমুদ্রে ট্যাঙ্কারগুলিতে জমে থাকা বিশাল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল খালি করাই লক্ষ্য। যেহেতু এই কার্গো বা জাহাজগুলির বড় অংশই এশিয়ার আঞ্চলিক জলসীমায় রয়েছে, তাই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতেই এই তেল বিক্রির সম্ভাবনা বেশি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল কেনা বন্ধ করার আগে ভারতই ছিল ইরানের অন্যতম শীর্ষ ক্রেতা। বর্তমানে চুক্তিতে স্বাক্ষরের পর বাণিজ্য শুরুর সুযোগ তৈরি হলেও, ভারতের তেল শোধনাগারগুলি এখনই ইরানি তেল কেনার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো দেখাতে চায় না।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুসারে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে গত কয়েক মাসের অনিশ্চয়তার কারণে এশিয়ার অধিকাংশ ক্রেতাই ইতিমধ্যে বিকল্প উৎস থেকে তেলের জোগান নিশ্চিত করে ফেলেছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভারতীয় শোধনাগারগুলো আগামী অগস্ট মাস পর্যন্ত তাদের প্রয়োজনীয় তেলের ব্যবস্থা করে রেখেছে। ফলে, এই মুহূর্তে ইরানি তেলের জরুরি কোনও প্রয়োজন তাদের নেই। তা ছাড়া, এ বারও দু'দেশের চুক্তি সাময়িক সময়ের জন্য হতে পারে, এই ভয়ে ক্রেতারা তেল কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। এছাড়া ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকায় বীমা, অর্থায়ন এবং শিপিংয়ের ক্ষেত্রে বড় জটিলতা রয়ে গেছে। 'ডার্ক ফ্লিট' বা ছায়া জাহাজের (যা নিষেধাজ্ঞার মাঝে ইরানি তেল পরিবহন করত) সঙ্গে যুক্ত কোনও জাহাজকে নিজেদের বন্দরে ভেড়াতেও অনেক দেশ ও বন্দর কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করছে।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের কিছু কার্গো মাত্র দু'থেকে তিন দিনের মধ্যে ভারতীয় বন্দরে পৌঁছাতে পারে। সাগরে ভাসমান লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল দ্রুত বিক্রির জন্য ভারতের চেয়ে ভাল গন্তব্য আর নেই। মার্কিন ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই তেল বিক্রি করার জন্য ইরানের যে তাড়ায় রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় ক্রেতারা বড় অঙ্কের ছাড় করতে পারে।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অপরিশোধিত তেলের বাইরেও ভারত ও ইরানের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এলপিজি গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, সার এবং সামগ্রিক জ্বালানি খাতের অন্যান্য দিকগুলি ভারত-ইরান সম্পর্ককে মজবুত করতে পারে। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের এই প্রক্রিয়া স্থায়ী হলে ইরান দ্রুত তাদের উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হবে।

রুশ সংবাদসংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফয়সাল আলশাম্মেরি বলেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির ঘোষণার পর ইরান আগামী চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে প্রতিদিন ১৬ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উৎপাদন বাড়াতে পারে। একইভাবে, অন্য এক বিশেষজ্ঞ জানান, আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই ইরানের তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

তবে উভয় বিশ্লেষকই সতর্ক করেছেন যে, কেবল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াই শেষ কথা নয়। ব্যাঙ্কিং খাতের জটিলতা, বীমা ও শিপিংয়ের সমস্যা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং মার্কিন-ইরান রাজনৈতিক সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা—এই সবকিছুই ইরানের তেল রপ্তানি স্থায়ীভাবে বাড়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে।