আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের আকাশসীমায় কি তবে মৃত্যুর ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে? গত এক সপ্তাহে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ভারতীয় বিমানচালকের অকাল মৃত্যু দেশের এভিয়েশন সেক্টরে এক গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে। এয়ার ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন তরুণদীপ সিং বালিতে বিরতির সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান এবং তার ঠিক পরের দিনই বেঙ্গালুরুতে প্রশিক্ষণ চলাকালীন প্রাণ হারান আকাসা এয়ারের ক্যাপ্টেন অর্জুন নাইডু। এই দুই অভিজ্ঞ পাইলটের মৃত্যু কেবল ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়, বরং এটি ভারতের পাইলটদের চরম ক্লান্তি (Fatigue) এবং সরকারের উদাসীনতার এক ভয়ঙ্কর দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এয়ারলাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (ALPA) এই মৃত্যুর জন্য সরাসরি নরেন্দ্র মোদি  সরকারের দুই বছরের দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করেছে। তাদের অভিযোগ, পাইলটদের নিরাপত্তার জন্য নতুন নিয়ম বা ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশনস (FDTL) কার্যকর করতে সরকার অহেতুক বিলম্ব করছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে এ পর্যন্ত ডিউটি চলাকালীন বা বিশ্রামের সময় অন্তত পাঁচজন ভারতীয় পাইলট মারা গেছেন, যাদের প্রত্যেকেরই বয়স ছিল ৫০ বছরের কম। সেফটি ম্যাটারস ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শারীরিকভাবে অসুস্থ বা 'টেম্পোরারি মেডিকেল আনফিট' (TMU) হিসেবে চিহ্নিত পাইলটের সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে ৫২০ শতাংশ বেড়েছে। উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ এবং হৃদরোগের মতো সমস্যা এখন পাইলটদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত জানুয়ারিতে সরকার পাইলটদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের কথা মাথায় রেখে নতুন নিয়ম ঘোষণা করেছিল। যেখানে সাপ্তাহিক বিশ্রাম ৩৬ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ঘণ্টা করা এবং টানা উড়ানের সময় ১০ ঘণ্টায় বেঁধে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো চাপের মুখে নতি স্বীকার করে সরকার সেই নিয়ম কার্যকর করার সময়সীমা বারবার পিছিয়ে দিচ্ছে। বিমান সংস্থাগুলোর যুক্তি ছিল, এই নিয়ম মানতে গেলে তাদের প্রচুর নতুন পাইলট নিয়োগ করতে হবে এবং অন্তত ২০ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল করতে হবে। নিজেদের মুনাফা বাঁচাতে গিয়ে সংস্থাগুলো যে প্রকারান্তরে পাইলটদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।

পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা বোঝা যায় যখন দেখা যায়, গত জুনে আহমেদাবাদ-লন্ডন ফ্লাইটের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ২৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ভারতের বিমান চলাচল খাত ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কয়েক গুণ বাড়লেও, এই খাতের বাজেট কিন্তু আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। গত অর্থবছরেও যেখানে বাজেট ছিল ৭৫৫ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫-২৬ সালে তা কমিয়ে মাত্র ৭০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এমনকি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বিভাগেও বহু পদ শূন্য পড়ে আছে। 

অভিজ্ঞ পাইলটদের মতে, বর্তমানে কোনো পাইলট ক্লান্তির কথা জানালে বিমান সংস্থাগুলো তাকে পুরস্কৃত করার বদলে উল্টো শাস্তি দেয়। তাদের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয় বা ডিউটি রোস্টারে রদবদল করে হেনস্থা করা হয়। ফলে লোকলজ্জা আর কেরিয়ারের ভয়ে মুখ বুজে কাজ করে চলছেন হাজার হাজার বিমানচালক। কিন্তু এই নিরবতা যে কত বড় বিপদের সঙ্কেত, তা তরুণদীপ বা অর্জুনদের নিথর দেহগুলো আজ বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। দেশের আকাশপথ নিরাপদ রাখতে মুনাফার চেয়ে মানুষের জীবনের দাম যে বেশি হওয়া প্রয়োজন, সেই সত্যটাই এখন সব মহলে জোরালোভাবে উঠে আসছে।