একবার চোখ বন্ধ করে এমন এক দেশের কথা ভাবুন তো, যেখানে রাজা যাতায়াত করেন ব্যক্তিগত বিমানে, তাঁর গ্যারাজে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রোলস রয়েসের মতো মহামূল্যবান সব বিদেশি গাড়ি। প্রতি বছর ঘটা করে এক জন নতুন রানি আসেন রাজার প্রাসাদে। অথচ, সেই দেশেরই অর্ধেকের বেশি মানুষ দু'বেলা পেট ভরে খেতে পান না! শুনতে কোনও প্রাচীন রূপকথার স্বৈরাচারী রাজার গল্পের মতো লাগলেও, আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এটাই রূঢ় বাস্তব।
2
11
আফ্রিকার ছোট্ট স্থলবেষ্টিত দেশ ইসোয়াতিনির (আগে যার নাম ছিল সোয়াজিল্যান্ড) দৈনন্দিন চিত্র ঠিক এমনই। ২০১৮ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে রাজা এমসোয়াতি দেশের নাম বদলে ইসোয়াতিনি রাখেন, যার অর্থ 'সোয়াজিদের ভূমি'। কিন্তু নাম বদলালেও, দেশের মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি।
3
11
রাজা এমসোয়াতির বিলাসবহুল জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে সাধারণ মানুষের হাহাকার। প্রতি বছর ঐতিহ্যবাহী ‘রিড ড্যান্স’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নিজের জন্য নতুন রানী বেছে নেন। রিপোর্ট বলছে, তাঁর বর্তমানে ১৫ জন স্ত্রী এবং ৩৫ জনেরও বেশি সন্তান রয়েছে। রাজা এবং তাঁর পরিবার যখন সম্পদের পাহাড়ে বসে আছেন, বিশ্বব্যাঙ্কের ২০২৫ সালের তথ্য তখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে এই দেশের ৫৪ শতাংশ মানুষই দারিদ্রসীমার নীচে বাস করেন।
4
11
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেশের তরুণ প্রজন্মের। বিশ্বজুড়ে বেকারত্বের তালিকায় এই মুহূর্তে শীর্ষস্থানে রয়েছে ইসোয়াতিনি। দেশের সার্বিক বেকারত্বের হার ৩৪.২ শতাংশ, আর ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের মধ্যে এই হার চমকে দেওয়ার মতো— প্রায় ৫৬ শতাংশ!
5
11
6
11
মাত্র ৬,৭০৪ বর্গমাইলের এই দেশটিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিক্ষা— সব কিছুতেই চূড়ান্ত অব্যবস্থা। সরকারি হাসপাতালে সাধারণ ওষুধের আকাল, আর অর্থাভাবে মাঝপথেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন পড়ুয়ারা। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে খরার প্রকোপে বহু মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
7
11
এর উপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো রয়েছে মারণ রোগ এইচআইভি। দেশের প্রায় ২ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত, যা এই ছোট দেশের কর্মক্ষমতা ও অর্থনীতিকে আরও পঙ্গু করে দিচ্ছে। ইসোয়াতিনির অর্থনীতি মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর নির্ভরশীল। তাদের মুদ্রা 'লিলাঙ্গেনি' সরাসরি দক্ষিণ আফ্রিকার 'র্যান্ড'-এর সঙ্গে যুক্ত থাকায়, প্রতিবেশী দেশের যে কোনও অর্থনৈতিক ওঠানামা সরাসরি এই দেশের ঘাড়েই এসে পড়ে।
8
11
তবে কর্মহীনতার এই ভয়ংকর জ্বালা শুধু ইসোয়াতিনির একার নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (আইএইচডি)-এর যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং ধীর গতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কারণে বেকারত্বের এই তালিকায় ইসোয়াতিনির ঠিক পরেই রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা (৩২.৪ শতাংশ) এবং জিবুতি (২৬ শতাংশ)।
9
11
এবার একটু নিজেদের দেশের দিকে তাকানো যাক। সার্বিক বেকারত্বের হারে ভারত হয়তো এই দেশগুলোর তুলনায় বেশ কিছুটা স্বস্তিদায়ক জায়গায় রয়েছে, কিন্তু ভিতরের চিত্রটা আমাদের জন্য যথেষ্ট চিন্তার। আমাদের দেশের জনসংখ্যায় তরুণদের ভাগ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ, যা আগামী কয়েক দশক ধরে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির বড় হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু এই সুবিধার উল্টো পিঠেই রয়েছে বিরাট চ্যালেঞ্জ— প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ তরুণ কাজের বাজারে প্রবেশ করছেন, আর তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কাজের অভাব।
10
11
'ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট'-এর পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে বেকারদের মধ্যে একটা বিশাল অংশই হলেন তরুণ প্রজন্ম। হিসেবটা শুনলে চমকে যেতে হয়— দেশের মোট বেকারদের মধ্যে প্রায় ৮৩ শতাংশেরই বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, সহজ কথায় বললে, আমাদের দেশের প্রতি ১০০ জন বেকারের মধ্যে ৮৩ জনই হলেন যুবক-যুবতী।
11
11
বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান আজ এক বিরাট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফ্রিকার দরিদ্র ইসোয়াতিনির স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র হোক বা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারত— তরুণ প্রজন্মের হাতে কাজ তুলে দিতে না পারলে, সমাজের এই দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব আগামী দিনে আরও বড় কোনও আর্থ-সামাজিক বিস্ফোরণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। উপযুক্ত কাজের সুযোগ এবং সম্পদের সঠিক বণ্টন ছাড়া যে কোনও দেশের ভবিষ্যৎই আদতে অন্ধকার।