বলিউডের প্রথম ‘সুপারস্টার’ রাজেশ খান্না এবং ওঁর প্রথম জীবনের লিভ-ইন পার্টনার তথা অভিনেত্রী অঞ্জু মহেন্দ্রুর প্রেমকাহিনি কোনও সিনেমার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর ছিল না। উত্থান, অদম্য স্টারডম, তীব্র অধিকারবোধ, অহঙ্কার এবং পরিশেষে এক চরম ট্র্যাজিক বিচ্ছেদ— যা সাতের দশকে বলিপাড়ার সবচেয়ে বড় চর্চিত বিষয় ছিল। আজ এত বছর পরেও অঞ্জুর জীবনে আর কেউ আসেননি। তিনি নিজের ইচ্ছেতেই অবিবাহিত রয়ে গেছেন।

সম্প্রতি অঞ্জুর একটি পুরনো ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে প্রবীণ এই অভিনেত্রীকে যখন প্রশ্ন করা হয়, শেষ বয়সে একাকীত্ব দূর করতে বা একজন ‘সঙ্গী’ পেতে তিনি কেন বিয়ে করলেন না? অঞ্জু হেসেই কূল পাননি। ওঁর দেওয়া জবাবটি ছিল একাধারে বাস্তববাদী ও চাবুক!


সেই সাক্ষাৎকারে অঞ্জু মহেন্দ্রু ওঁর বর্তমান জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আমি একাই থাকি। জীবনের সিংহভাগ সময় আমি আমার মায়ের সঙ্গে কাটিয়েছি, কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর জীবনটা বদলে গেছে। আমার বোন আর ভগ্নিপতি অন্য জায়গায় থাকলেও মাঝে মাঝেই আমার কাছে আসে। সত্যি বলতে, আমি কোনও একাকীত্ব বোধ করি না।”

বিয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই অঞ্জু হেসে বলেন, “অনেকে আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন যে এই বয়সে এসে অন্তত একটা সঙ্গীর জন্য আমার বিয়ে করা উচিত। আমি ওঁরদের বলি— ‘আপনারা কি পাগল?’ এই বয়সে এসে যদি আমি বিয়ে করি, তবে আমার সমবয়সী বা আমার চেয়ে বড় কাউকে বিয়ে করতে হবে। তারপর আমরা দুজনে সারাদিন বসে কী নিয়ে গল্প করব— কার কোন ওষুধ চলছে? কার রক্তচাপ কত বাড়ল-কমল? আমি এই সবের মধ্যে জড়াতে চাই না। আমি যেভাবে আছি, খুব ভাল আছি। একাকীত্ব অনুভব করার মতো সময় আমার নেই, দুনিয়ায় এত কিছু ঘটছে, আমি নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখি।”

 

 

১৯৬৬ থেকে ১৯৭২— টানা সাত বছর রাজেশ খান্নার সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন অঞ্জু। রাজেশের কেরিয়ারের স্ট্রাগলিং পিরিয়ড থেকে সুপারস্টার হয়ে ওঠার রূপান্তর— সবটার সাক্ষী ছিলেন তিনি। রাজেশের আইকনিক বাংলো ‘আশীর্বাদ’-এর প্রতিটি লেট-নাইট পার্টি, তারকাদের আপ্যায়ন— সবটাই সামলাতেন অঞ্জু। কিন্তু রাজেশের আকাশছোঁয়া সাফল্য ওঁর মধ্যে এক তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও গোঁড়ামি তৈরি করেছিল। ১৯৭৩ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অঞ্জু বলেছিলেন, “রাজেশ বড্ড বেশি পজেসিভ ছিল। ও আমার কেরিয়ার পছন্দ করত না। আমি স্কার্ট পরলে ও বলত শাড়ি পরো না কেন? আবার শাড়ি পরলে বলত তুমি ভারতীয় ট্র্যাডিশনাল নারী সাজার নাটক করছ কেন? ও সারাক্ষণ আমার ওপর নজরদারি চালাত।”

অভিনেত্রী মুমতাজ একবার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, রাজেশের চাটুকার ও বন্ধুদের দল যখন রাত ৩টে পর্যন্ত মদ্যপান করত, অঞ্জু একা হাতে ওঁরদের খাবার ও পানীয় পরিবেশন করতেন। অন্যদিকে, রাজেশের যখন ফ্লপ পর্ব শুরু হল, তখন তিনি অঞ্জুর থেকে ২৪ ঘণ্টা ‘প্যাম্পারিং’ বা তোষামোদ আশা করতেন, যা অঞ্জুর পক্ষে সম্ভব ছিল না। ১৯৭১ সালে রাজেশ অঞ্জুকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে অঞ্জু নিজের কেরিয়ারের স্বার্থে তা প্রত্যাখ্যান করেন। আর ওখানেই ফাটল ধরে সম্পর্কে।

ঠিক এই সময়েই বলিউডে উদয় ঘটে ১৬ বছরের কিশোরী ডিম্পল কপাডিয়া-র। রাজেশ ও ডিম্পলের সম্পর্কের গুঞ্জনের মাঝেই ‘আশীর্বাদ’ বাংলোয় এক পার্টির আয়োজন করা হয়, যার গেস্ট লিস্ট বানানোর দায়িত্বে ছিলেন অঞ্জু। ইচ্ছে করেই কপাডিয়া পরিবারকে আমন্ত্রণ জানাননি অঞ্জু। কিন্তু রাজেশ নিজে ফোন করে ডিম্পলকে ডাকেন।

পার্টিতে ডিম্পল নাকি অঞ্জুকে খোঁচা মেরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমি কি ভেতরে আসতে পারি?” রেগে গিয়ে অঞ্জু জবাব দেন, “নেমন্তন্ন থাকলে নিশ্চয়ই আসবে, না থাকলে ফিরে যাও!” সাংবাদিক রউফ আহমেদের দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনার পর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে রাজেশ সোজা ডিম্পলের বাড়ি চলে যান, ওঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং সেখান থেকে দু'জনে খাণ্ডালা চলে যান। অঞ্জু খাণ্ডালা ছুটে গেলেও রাজেশের দেখা পাননি। ফিরে এসে অঞ্জু রাজেশের ড্রাইভার মারফত ওঁর সমস্ত জিনিসপত্র ফেরত পাঠিয়ে দেন এবং সম্পর্ক চিরতরে শেষ করেন। ১৯৭৩ সালে রাজেশ ডিম্পলকে বিয়ে করেন।

বিচ্ছেদের পর দীর্ঘ ১৭ বছর ওঁরদের মধ্যে কোনও মুখ দেখাদেখি বা কথাবার্তা ছিল না। কিন্তু আশির দশকের শেষের দিকে ওঁরদের মান-অভিমানের বরফ গলে এবং তাঁরা আবার একে অপরের সবচেয়ে ভাল বন্ধু হয়ে ওঠেন।

অঞ্জু মহেন্দ্রু কোনওদিন বিয়ে না করলেও, রাজেশ খান্নার জীবনের শেষ দিনগুলোতে ওঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিলেন। রাজেশের অসুস্থতার সময় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ওঁর দেখভাল করা— সবটাই করেছিলেন এই অঞ্জু। আজও সোশ্যাল মিডিয়ায় রাজেশের পুরনো ছবি পোস্ট করে অঞ্জু ক্যাপশনে লেখেন, “মিস ইউ, কাকাজি।” 

ওঁদের প্রেম হয়তো হেরে গিয়েছিল, কিন্তু  বন্ধুত্ব আজ ২০২৬ সালেও বলিউডের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।