ওয়েব সিরিজে হাতেখড়ি রাজকুমার হিরানির। চেনা ম্যাজিক দেখাতে পারল কি ‘প্রীতম অ্যান্ড পেড্রো’? লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
গল্প জুড়ে বসন্তের মিঠে হাওয়ার মতো ফুরফুরে মেজাজ। খেলাচ্ছলেই সমাজকে চিনিয়ে দেওয়া ভাল-মন্দের ফারাক। সঙ্গে গুনগুনিয়ে ওঠার মতো গান। রাজকুমার হিরানির ছবি মানেই তো মনের ভিতর এমন জাদুকাঠির পরশ!
আজকাল জীবন মানেই তো ঘোরতর সব জটিলতার গুমোট। এ সবের মাঝে ওয়েব-সিরিজে পরিচালকের হাতেখড়ির খবর পেতেই তাই হিরানি-ম্যাজিকের প্রত্যাশায় বসে ছিলেন দর্শক। হলও তাই! মুন্নাভাই-সার্কিটের হাসিখুশি দুনিয়ায় আপামর ভারতবাসীকে বুঁদ করে রাখার পরে এবার প্রীতম আর পেড্রোর যুগলবন্দিতে দর্শককে নিমেষে মজিয়ে দিলেন খুশিয়াল কমেডির রাজকুমার। জিও হটস্টারে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া, তাঁর প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘প্রীতম অ্যান্ড পেড্রো’ হরেক প্রজন্মের মন কেড়ে নিল যথারীতি। কুড়ি বছর বাদে ‘সার্কিট’ পর্দায় দেখা দিলেন ‘পেড্রো’ রূপে। সঙ্গে ‘প্রীতম’ হয়ে আর কেউ নয়, খোদ জুনিয়র হিরানি। রাজকুমারের ছেলে বীর।
গল্পে গোয়ার ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার পেড্রো গনজালভিস (আর্শাদ ওয়ারসি) তার জীবন নিয়ে নাজেহাল। কুয়োয় ডুবে একমাত্র ছেলের মৃত্যু দূরে ঠেলে দিয়েছে স্ত্রী স্টেসিকে (মোনা সিং)। ছেলের মৃত্যুর জন্য স্বামীর অবহেলাকেই সে দায়ী করে। শোকের সঙ্গে সমঝোতা করতে কাজে ডুবে থাকা পেড্রোর বাড়িতে সময় না দেওয়া নিয়ে নিত্য খিটিমিটি লেগেই থাকে দু’জনের। ঠাকুর্দার বহু পুরনো টেপরেকর্ডার আর তার ভিতরে থাকা প্রয়াত ঠাকুরমার গান রেকর্ড করা ক্যাসেট চুরি যাওয়ার রিপোর্ট লেখাতে একদিন পেড্রোর থানাতেই আসে তরুণ সাইবার জিনিয়াস প্রীতম (বীর হিরানি)। কোনও এক গোপন কারণে সাইবার দুনিয়া থেকে ঢের দূরে সে এখন ভ্যাকুয়াম ক্লিনার সেলসম্যানের চাকরি করে। এটিএম মেশিন চুরি যাওয়ার কেস নিয়ে হিমশিম পে়ড্রোকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে প্রীতম। সাইবার দুনিয়ার স-টুকুও বুঝতে না পারা পেড্রো মুগ্ধ হয়। এদিকে ক’দিন পরে গোয়ার ক্রীড়ামন্ত্রীর স্ত্রীর মোবাইল চুরির তদন্তে গিয়ে খোদ মন্ত্রীকেই চটিয়ে বসে সে। শাস্তিস্বরূপ তার বদলি হয় সাইবার সেলে। সেখানে নাকানিচোবানি খাওয়া পেড্রো ডিআইজি-র কাছে ক্রাইম ব্রাঞ্চে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালে আসে তিনটে বড় কেস সমাধান করার শর্ত। অতএব পেড্রো ফের শরণাপন্ন হয় প্রীতমের। ক্যাসেট-সহ ঠাকুর্দার টেপরেকর্ডার খুঁজে দেওয়ার শর্তে প্রীতমও রাজি হয়। এর মধ্যে হঠাৎ ক্রীড়ামন্ত্রীরই আট বছরের ছেলে নিখোঁজ। গোয়া পুলিশ তদন্তে ডাকে পেড্রোর সাইবার সেলকে। মন্ত্রী প্রথমে নারাজ হলেও শেষমেশ প্রীতম আর পেড্রোর হাতেই সঁপে দেয় ছেলেকে খুঁজে আনার ভার। তদন্ত এগোতে দেখা যায় নেপথ্যে আছে আর এক সাইবার জিনিয়াস (বিক্রান্ত মাসে)। প্রীতম-পেড্রোর জুটি কি পারবে ঘরের ছেলেকে ঘরে ফেরাতে? প্রীতম কি ফিরে পাবে তার সাধের টেপরেকর্ডার আর অমূল্য ক্যাসেট? তার অতীতে লুকিয়ে আছে কোন অজানা কাহিনি? সে সব উত্তর রাখা ছয় পর্বের টানটান সিরিজে।
হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ বুনতে বুনতে এগিয়ে চলা থ্রিলারে কোথাও অনাবশ্যক মেদ নেই। বরং আছে গোয়েন্দা গল্পের নিখাদ মজা। যার পরতে পরতে হরেক রকম ট্যুইস্ট। সিরিজ জুড়ে ছড়িয়ে সাইবার দুনিয়ার ভালমন্দের খুঁটিনাটি, অপরাধের চোরাগলির হদিশ আর বিপজ্জনক গেমের নেশায় ছোটদের পরিণতির গল্প। রোমাঞ্চের মোড়কে চিনিয়ে দেওয়া বিপদের ঝুঁকি। তবু কোথাও উপদেশ বা নীতিকথার পাঠ বলে মনে হয়না কাহিনিকে। সেখানেই পরিচালক-কাহিনিকারের মুন্সিয়ানা।
যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে জমাটি অভিনয়। আর্শাদ বরাবরের মতোই দুরন্ত। ‘সার্কিট’সুলভ চেনা কমেডি টাইমিং থেকে সন্তান-হারানো বাবার মনে জমাট বেঁধে থাকা কষ্ট, সবেতেই পেড্রো তাই বড্ড জীবন্ত। পাল্লা দিয়ে দারুণ অভিনয় করেছেন বীর। একদিকে সাইবার অপরাধের সমাধান যার বাঁয় হাতকা খেল, তারই বুকের ভিতর পাথর চাপা দেওয়া সত্যি— দুয়ের টানাপোড়েনে প্রীতম ভীষণ রকম বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে তাঁর দৌলতে। প্রীতম আর পেড্রোকে পদে পদে টক্কর দেওয়া আর এক সাইবার জিনিয়াসকে যথারীতি নিখুঁত করে গড়েন বিক্রান্তও। ছোট্ট চরিত্রে সন্তানহারা মায়ের দোলাচল থেকে স্বামীর প্রতি ভালবাসার টান, সবটুকু যত্নে বোনেন মোনা। প্রীতমের কলেজের প্রোফেসর হিসেবে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতেও প্রত্যাশিত ভাবেই চোখ টেনে ছাড়েন বোমান। বাকিরাও মন কেড়েছেন যে যার মতো করে।
ইদানীং থ্রিলার মানেই জটিলতা-কুটিলতায় মোড়া কাহিনি, যার সবটাতেই প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে যায় খুন-ধর্ষণের মতো গা শিউরে দেওয়া সব অপরাধ, চরিত্র বা দৃশ্যায়নের নৃশংসতা এবং নিষ্ঠুরতা। সরলরেখায় এগিয়ে চলা হিরানির এই সাইবার অপরাধের গল্প সেখানে পুরোদস্তুর আস্থা রাখে বুদ্ধির লড়াই আর হাল্কা মেজাজের গল্প বলায়। এখনকার থ্রিলার মোড়া ওটিটি ময়দানে এ জিনিস তাই যাকে বলে ওয়েলকাম ব্রেক। তবে হ্যাঁ, এটাই খানিক খামতির জায়গাও বলা যায় বটে। অন্তত শুরুর দিকে গোটা তিনেক পর্বে সাইবার অপরাধের জাল যেন বড্ড হাল্কা হাতে বোনা, যার রহস্য অনায়াসে ভেদ করে ফেলা যায় ফোনের টাওয়ার ডাম্প, সোশ্যাল মিডিয়ার মতো সরল অস্ত্রে। সাইবার দুনিয়ার অপরাধও মনে হয় যেন অতি সরলীকৃত। শুধু তাই নয়, ক্লু থেকে অপরাধী সবই যেন ধরা দেয় বড্ড সহজে। বরং শেষের তিনটে পর্বেই মগজাস্ত্রের আসল পরীক্ষা। সেটাই দর্শককে টানটান বসিয়ে রাখে শেষ অবধি। তবে ওই যে, চারপাশের একরাশ জটিল, গুরুগম্ভীর গল্পের ভিড়ে সহজসরল গল্পের ফুরফুরে মেজাজ— হিরানি মন কাড়েন তাতেই।
আর যেটার কথা না বললেই নয়, তা হল গান। সিরিজের একেবারে শেষপাতে তার মিঠে উপস্থিতি। স্টেসির কণ্ঠে প্রীতমের ঠাকুরমার হারিয়ে যাওয়া সেই গান যেন এখনকার সম্পর্কের টানাপোড়েনে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মনগুলোকে নতুন করে শিখিয়ে যায় ভাল থাকার ম্যাজিক-মন্ত্র। ভঙ্গুর সম্পর্কের দিনকালে ক্ষমা চেয়ে আর ক্ষমা করে দিয়ে এগিয়ে চলার অমোঘ পাঠ। মধুরেণ সমাপয়েৎ তো একেই বলে, নাকি?
















