উদ্দালক

আসলে সমস্ত শিল্পই, যখন তা হয়ে ওঠে আঁতের কথা, ভিতরের কথা, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় সত্য। সৌরভ পালোধী পরিচালিত ছবি 'অনেকদিন পর' তেমনই সত্য়। ভাল-মন্দ বিচারের পূর্বে যে কোনও শিল্পের এই সত্যকে ছোঁয়াটা বিশেষ দরকার। বাংলা ছবির ক্ষেত্রে একঝাঁক তেমনই নতুন শিল্পীর উদয় হয়েছে, যাঁদের ভাবনায় সেই সত্য আছে। তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন নতুন এক দিগন্ত। যে যাঁর মতো করে দেখছেন ঠিকই, কিন্তু সকলেই ছুঁতে চাইছেন সত্যকে। তার জন্য পরিশ্রম করছেন, রাগ-অভিমান করছেন, কখনও কখনও আপোষও করছেন হয়ত, কিন্তু সবেতেই শিল্পকে ছোঁয়ার একটা উদগ্র তাগিদ রয়েছে। ভাল লাগছে দেখে, এই তালিকায় সৌরভের স্থান আরও শক্ত করল তাঁর নির্মিত নতুন ছবিটি। 

বাংলায় বাণিজ্যিক ছবির ধারায় মিশেছে অন্যধারার ছবির জলও। দুইয়ে মিশে এক নতুন স্রোত তৈরি হয়েছে। সেখান থেকেই নতুন করে বাংলা ছবির একটা ভাষা নির্মাণের চেষ্টা চলছে শেষ বেশ কয়েকবছর ধরে। তার ফলে যেটা হয়েছে, বাংলা মানচিত্রে অসামান্য সব অভিনেতারা নিজেদের মতো স্থান করে নিয়েছেন। এ কথা হলফ করে বলতে পারি, আবীর চ্যাটার্জি, ঋত্বিক চক্রবর্তীরা বাংলা মূলধারার ছবির শ্রেষ্ঠ আবিস্কার হতে পারতেন না, যদি না ছবির ভাষা পাল্টাতো। ফলে এই স্রোতের ভেলায় ভেসে বেশ কয়েকজন অভিনেতার লালন-পালন হচ্ছে সমাদরে। সৌরভ তেমনই অসামান্য অভিনেতাদের একটা ঝাঁক পেয়েছেন এই ছবিতে। কাকে ছেড়ে কার কথা বলা চলে, শঙ্কর দেবনাথ, বিপ্লব ব্যানার্জি, বিমল চক্রবর্তী, সীমা মুখার্জি, দীপক হালদার, সঞ্জিতা, দেবেশ রায়চৌধুরী, সুপর্ণা দাস-সহ প্রত্যেকেই। কী অসামান্য অভিনয় করেছেন বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি যেন সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গিয়েছেন ভাল অভিনয়ের। মনে পড়ছে দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা, তাঁর মঞ্চের অভিনয়ের কথা, তাঁর কমিক টাইমিং ও আবেগী অভিনয়ের মিশেলের কথা। বিপ্লব যেন মনে করাচ্ছেন সেই মানুষটিকে। শঙ্কর, সীমা ও বিমল চক্রবর্তীকে দেখেও গর্বে বুক ভরে যায়। এমন মানুষদের আমরা চলতে-ফিরতে দেখি, এদিক-ওদিক অভিনয়ের আঙিনায় তাঁদের হেঁটে চলে বেড়াতে দেখতে পাই আমরা, এ তো আমাদের ভাগ্য! ছবিতে একটি গানে সমস্ত অভিনেতারা নিজেরাই গলা দিয়েছেন। সেখানে সীমা ও বিমলের অংশটি যখন প্রবেশ করে, তখন হৃদয় নিংড়ে দেওয়া গলায় দু'জনের দু'টি লাইন শুনতে-শুনতে মনে হয়, আমাদের যে চলা, তার কিছুই কী নেই বাকি? এত হা-হুতাশের কী আছে! আমাদের বিমল বা সীমার মতো শিল্পীরা এখনও দাপটে কাজ করছেন। আলাদা করে বলতে হয় শঙ্কর দেবনাথের কথা। শৈশবের বিস্ময় ছিলেন তিনি, 'তিস্তা পারের বৃত্তান্ত'-এর বাঘারুকে অভিনয়ের ছাত্ররা তাঁদের খেলার শচিন মনে করেন। তিনি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন এই ছবিতে। অসামান্য চরিত্র নির্মাণ করেছেন দেবেশ রায়চৌধুরী। আলাদা করে অভিনেত্রী সঞ্জিতা, সুপর্ণা দাস ও দীপক হালদারের কথাও বলতে হয়। আসলে এই ছবিতে প্রত্যেকের নিজস্ব নির্মাণ ও নিজস্ব যাত্রাপথ আছে। যাঁদের থিয়েটার দেখে এই চোখ তৈরি হয়েছে, তাঁদের বয়স বেড়েছে, চুলে পাক ধরেছে, তাই সিনেমার পর্দায় তাঁদের আবারও যেন একটা রিইউনিয়ন দেখতে পেয়ে মন দুর্গাপুজোর ছুটির স্বাদ পেয়েছে। 

সাধারণত রিভিউয়ে একটি অনুচ্ছেদেই সীমাবদ্ধ থাকে অভিনয় নিয়ে আলোচনায়। কিন্তু এক্ষেত্রে আরও একটি অনুচ্ছেদ লিখতে হচ্ছে। তাঁর প্রধান কারণ, চিত্রাঙ্গদা শতরূপা ও বিমল গিরি। চিত্রাঙ্গদা অপরূপ অভিনয় করেছেন, বিমলও তাই। এঁরা একাধারে গল্পের সূত্রধর ও জুটি। স্তম্ভ সমান অভিনেতাদের পাশে দাঁড়িয়ে এই দুই নতুন অভিনেতাও নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন। অভিনেতাদের শক্তি লুকিয়ে থাকে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। কতটা করব, কতটা করব না, সেই সরু সুতোর উপর দাঁড়িয়ে থাকে অভিনেতাদের সাফল্য। চিত্রাঙ্গদা ও বিমল দু'জনেই সাবধানে সেই সেতু পার করেছেন, এবং পার করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। আরও অনেক কথা হয়ত বিশেষ স্থান ধরে-ধরে আলোচনা করা যেত, কিন্তু সে-সব পরে হবে। এ ছাড়াও আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় সেঁজুতি মুখার্জি, শুভঙ্কর ঘটক, স্বাতী মুখার্জির কথাও। তাঁরাও চরিত্রের নিজস্ব চলনকে পাথেয় করে তৈরি করেছেন পরিচয়। প্রতিটি চরিত্র আলাদা করে নিজেদের মতো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এঁদের কৌশল ও প্রয়োগ দেখলে সে কথা স্পষ্ট হয়। 

ছবিতে সঙ্গীতের প্রয়োগে পাশ্চাত্য যন্ত্রের ব্যবহার করেছেন সপ্তক সানাই দাস। সৌমিত দেব ও ধ্রুবজ্যোতি চক্রবর্তীর গানের কথায় সুর দিয়েছেন তিনি। দু'টি গানের অসামান্য প্রয়োগ নজরে পড়ে, সেই সঙ্গে নেপথ্য সঙ্গীতের ব্যবহারও আলাদা করে নজর কাড়ে। উল্লেখ্য, ছবির গল্প সৌরভের সঙ্গে লিখেছেন সৌমিত, সেটিই এই সিনেমার মেরুদণ্ড। দুর্নিবার ও তিতাসের গাওয়া দু'টি গান ও অভিনেতাদের নিজেদের কণ্ঠের গানটি ছবিকে অন্যমাত্রা দিয়েছে। ছবির পরিচালক সৌরভ ইতিমধ্যে বাংলা ছবির ক্ষেত্রে তাঁর ছাপ রেখেছেন প্রথম কাজেই। এই ছবিতে সেই মায়া যেন শরতের শিউলির মতো ঝরে পড়েছে। প্রযোজক প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ, তিনি বাণিজ্যিক ছবির গতে বাধা রসায়নের বাইরে গিয়ে এমন একটি সিনেমাকে দর্শকের সামনে নিয়ে আসতে চেয়েছেন, যার সম্ভাবনা বিপুল। তিনি প্রযোজক হিসাবে হয়ত ঝুঁকি নিয়েছেন, কারণ, কোনও নির্দিষ্ট গতে বাণিজ্যিক ছবির সূত্র এই সিনেমা মানছে না, ফলে বক্স অফিসের সরল সমীকরণ এতে খাটবে না। তা সত্ত্বেও সিনেমার জন্য, ভাল সিনেমার জন্য তিনি যেভাবে সামগ্রিক একটি আয়োজন করেছেন , তা ধন্যবাদের যোগ্য। আর যে স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে এই ছবি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, সেই থিয়েটারে একই সঙ্গে ছবি দেখেছেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় ও শমীক ভট্টাচার্য, এমন মিলনক্ষেত্র প্রসেনজিতের পক্ষেই নির্মাণ করা সম্ভব। 

এই ছবির আলোচনা যখন লিখছি, তখন শহরে ঘটে গিয়েছে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এদিকে সারাদিন ধরে বৃষ্টি ধুয়ে দিচ্ছে মলিনতা। একই সঙ্গে দুই ছবি। কানের পাশ দিয়ে হুস-হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে অস্থির সময়ের নিজস্ব দিনলিপি। কবি রণজিৎ দাশ অশ্রুর দেবতা বইয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, ছবিটা দেখতে-দেখতে মনে পড়ছিল  'মিনিস্ট্রি অফ লোনলিনেস' কবিতার কথা, সেখানে শেষ লাইনে তিনি লিখছেন, 'এ জন্য তাঁরা নিঃসঙ্গতার শপিং মলের জিনিস চুরি করে, ভালবাসার জেলখানায় যেতে চান।/এই পৃথিবীতে, নিঃসঙ্গতা মৃত্যুর সমান।' আমরা অপর হয়ে যাই একটা বয়সের পর। অপ্রয়োজনীয়, অকারণ, এক্স্ট্রা হয়ে যাই। আমরা জানি, একদিন না একদিন এমন একটা জীবন আসবে, আসবেই। আর সেদিন নাগাল পেতে হবে কারণ বা পারপাসের। এতদিন যে পারপাস ছিল স্বাভাবিক, সেদিন সেটা খুঁজে বার করতে হবে। এ পৃথিবীতে জন্মমৃত্যুর মতো বসন্তও আসবে যাবে, কখনও সেই বসন্তের চলে যাওয়া নজরে পড়বে না, কখনও আবার নিরন্তর বেদনা বয়ে নিয়ে আসবে বসন্ত। এই ছবি দেখতে দেখতে তাই মনের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে আসতে থাকে শহরের অগোছালো সেই সমস্ত বেদনার কথা। অজস্র অভিভাবক, বন্ধু, আত্মীয়ের কথা, যাঁরা আসলে ভালেবেসেছিলেন, কিন্তু ফেরত চাননি কিছুই। তাঁদের দাওয়ায় আজ কেউ আসে না, তাঁরা জানতেন, একদিন সত্যিই কেউ আসবে না। তবু বিদায়ের আগে বলতেন, 'আর ক'টা দিন থেকে গেলে পারতি!' আজ, আর ক'টা দিন থাকার সুযোগ যাঁদের নেই, সৌরভের ছবি তাঁদের একটি মাত্র গোপণ কথার মতো থেকে যাক। এই প্রত্যাশা।