তাঁদের বন্ধুত্ব, একে অন্যের পাশে থাকা অনেক বন্ধুদেরই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বারংবার। এই বন্ধুত্ব দিবসে 'গাবলু' অনুত্তমাকে নিয়ে আজকাল ডট ইনের কাছে মনের ঝাঁপি খুলে দিলেন রত্নাবলী রায়। তাঁদের রসায়নের পাশাপাশি বন্ধুত্ব মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কতটা আর কীভাবে প্রভাব ফেলে, বন্ধুত্ব নিয়ে সমাজের স্টিরিওটাইপিংয়ের বিষয়েও কথা বললেন তিনি। 

অনুত্তমা ব্যানার্জির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের বিষয়ে এদিন রত্নাবলী রায় বলেন, "আমার আর অনুত্তমার বন্ধুত্বের ১৫ বছর হয়ে গেল। ও আমার বন্ধু, তবে আমি আবার কখনও ওর দিদিও বটে, কখনও ওর মা-ও। এইটা আমাদের কেন বোঝাতে হয়? তার মানে বন্ধুত্ব বলতে আমাদের মনে যেটা কাজ করে সেগুলোর মধ্যে হয়তো মাতৃত্ব বা সিস্টারহুড ততটা থাকে না। সেই জন্যই সম্ভবত আমাদের বলার সময় বলতে হয় আমি ওর দিদি বা মা-ও বটে। আমার আর অনুত্তমার বন্ধুত্বের মধ্যে একে অন্যের ইকো চেম্বার হয়ে থাকা, স্তাবকতা করাটা নেই। হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো নেই। কারণ ও অনেক সময় আমাকে আয়না দেখায়। বলে, 'না, রতন তোমার বোধহয় এটা এভাবে ভাবাটা ঠিক হচ্ছে না। তুমি সম্ভবত এভাবেও ভাবতে পারো'।" তাঁর এদিন আরও সংযোজন, "আমার আর ওর জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু একদম আলাদা। এটা কখনও আমাদের বন্ধুত্বে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। আমরা দু'জনেই ভীষণ স্পষ্টবাদী। আর এটা কেবল অনুত্তমার সঙ্গেই যে আমার এরকম সম্পর্ক, সেটা নয়, ও ছাড়াও আমার যে আরও দু'-চারজন বন্ধু রয়েছেন, তাঁদের সঙ্গেও আমার অত্যন্ত ট্রান্সপারেন্ট একটা সম্পর্ক। যেখানে আমরা ওই ইকো চেম্বারের মধ্যে ঘুরঘুর করি না। যেখানে ভুল হচ্ছে সেই ভুল ধরিয়ে দেওয়াটা আসলে একটা সামাজিক বাস্তবতা বলে আমি মনে করি। বন্ধুত্ব কিন্তু একটা ভীষণ আশ্চর্য শব্দ, এটা অত্যন্ত গভীর এক অর্থে, আবার বহুমাত্রিক আর এক অর্থে।" 

অনুত্তমার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বে যেমন অধিকারবোধ আছে, তেমনই তাঁরা একটা সীমারেখা মেনে চলেন বলেই জানালেন রত্নাবলী রায়। এই বিষয়ে তিনি বলেন, "আমার আর অনুত্তমার বন্ধুত্বে যতটা অধিকারবোধ আছে, ততটাই কিন্তু বাউন্ডারি আছে। অধিকারবোধ শুধু থাকল, আর কোনও বাউন্ডারি থাকল না তাহলে কিন্তু হবে না।" 

বন্ধুত্ব নিয়ে সমাজের যে স্টিরিওটাইপিং, সেটার সাক্ষী রত্নাবলী নিজেই! সেই অভিজ্ঞতার স্মৃতি হাতড়ে তিনি এদিন বলেন, "আমাদের তো নানা স্টিরিওটাইপ থাকে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে। এই যেমন অসম বন্ধুত্ব হয় না। 'সবসময় তুই এত বড়দের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিস কেন রে?' 'তোর নিজের বয়সী কোনও বন্ধু নেই?', ইত্যাদি বলা হয়। এই যে বন্ধুত্বের কোনও বয়স, লিঙ্গ, শ্রেণি হয় না, এগুলো অনেক পরে বুঝেছি আমরা। কারণ আমাদের জনমানসে, পরিবার থেকে এই ভাবনাগুলো ভীষণ ভাবে গাঢ় করে দেওয়া হয়। আমার পাড়ার প্রিয় বন্ধু ছিল যে, তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব নিয়ে কথা উঠত, 'ও তো চামার। তুই একজন চামারের সঙ্গে মিশবি?'" 

বন্ধুত্বের উপরেই কি ভাল বা খারাপ থাকা নির্ভর করে? রত্নাবলী রায়ের মতে, "বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ভাল থাকা, খারাপ থাকা নির্ভর করে প্রত্যাশার উপর। আমি কী প্রত্যাশা করি সেটার উপর সবটা নির্ভর করে। বন্ধু মানেই সেফ স্পেস আর কমফোর্ট জোন নয় শুধু। সেফ স্পেসের মধ্যেও স্পষ্টতা রাখতে হয়। বন্ধুত্বে বায়াসনেস থাকতেই পারে, কিন্তু তারপরও কোথাও না কোথাও ননজাজমেন্টাল হতেই হবে। বন্ধুর পাশে থাকতে হবে। এই ৩ এএম বন্ধু, ইত্যাদি তো অনেক পরে এসেছে। বন্ধু যে বন্ধুর পাশে থাকবে এটাই তো কাম্য। কিন্তু বাউন্ডারি মেনে চলতে হবে। আমাদের দেশে সেটার একদম চর্চা নেই। কোথায় যে সীমা লঙ্ঘন হল, সেই বোধ অনেক সময় থাকে না।" ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতির পাতা হাতড়ে তাঁর আরও সংযোজন, "কখনও কখনও আমার কিছু প্রাণের বন্ধুত্ব ভেঙে গিয়েছে, রোম্যান্স নয় কিন্তু। বন্ধুত্ব। সেখানে কিন্তু আমার ভীষণ সেলফ ডাউট হয়েছে। আর সেটা অনেকদিন পর্যন্ত চলেছে। মনে হতো, 'আমি কি ভুল বুঝলাম', 'আমি কি ঠিক এটা করতে পারলাম না ওর জন্য', 'কোথায় ভুল হল', এই নিয়ে আমার নিজের মধ্যে বহুদিন একটা দ্বন্দ্ব চলেছে। বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ কিন্তু মানুষকে ভীষণ একা করে তোলে। বন্ধুত্বের মধ্যে একটা একাকীত্ব আছে যেটা ওভারকাম না করতে পারলে, মানসিক স্বাস্থ্যের উপর অভিঘাত পড়ে।" 

রত্নাবলী রায় এদিন বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ এবং বন্ধুত্ব ও রোম্যান্সকে গুলিয়ে ফেলার প্রসঙ্গে বলেন, "কিছু কিছু বন্ধুত্বে এরকমও দেখেছি, বিচ্ছেদ বা আঘাত হতে না হতেই, অতি তৎপরতার সঙ্গে অপর মানুষটিকে বিশ্বাসঘাতক দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিচ্ছেদ তো অনেক সময় বিবর্তনের জন্য, প্রত্যাশা না মেলার জন্য হয়। তাহলে কি আমরা বন্ধুদের বদল হওয়াতে স্বাধীনতা দেব না? একই রকম থাকতে হবে? এটা কোনও দিন হতে পারে? তবে হ্যাঁ, বন্ধুত্ব আর রোম্যান্স এক নয়। যেটার যা নাম, সেটাকে সেই নাম ধরে ডাকতে হবে। দু'টোকে গুলিয়ে ফেললে হবে না, তাতে সমস্যা হবে।"