ঠিক এক বছর আগের কথা। যে শো-টি তাঁকে ভারতের ঘরে ঘরে একডাকে পরিচিতি দিয়েছিল, সেটির অস্তিত্ব রক্ষার্থেই আপ্রাণ লড়াই করতে হচ্ছিল কমেডিয়ান সময় রায়নাকে। অথচ আজ, ২০শে জুন, ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে সেই সময় রায়নাই ওঁর ডিজিটাল রিয়্যালিটি শো ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট সিজন ২’ নিয়ে এমন এক রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটালেন, যা এককথায় নজিরবিহীন। এবার আর শুধু ইউটিউব নয়, ওঁর এই শো একইসঙ্গে স্ট্রিম হচ্ছে নেটফ্লিক্স এবং ইউটিউবে! পুনের ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাসরুম থেকে শুরু করে বিতর্কের নরক গুলজার পার করে সময়ের ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ডিজিটাল ক্রিয়েটর হয়ে ওঠার এই গল্প কোনও সিনেমার চেয়ে কম নয়।

অনেকের কাছে সময় রায়নার যাত্রা ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’ দিয়ে শুরু হলেও, আসল লড়াইটা শুরু হয়েছিল অনেক আগে। জম্মুর এক কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে জন্ম নেওয়া সময় উচ্চশিক্ষার জন্য পুনেতে আসেন। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই ওঁর ঝোঁক বাড়ে স্ট্যান্ড-আপ কমেডির দিকে। ২০১৯ সালে আকাশ গুপ্তার সাথে যৌথভাবে ‘কমিকস্থান সিজন ২’ জেতার পর দেশজুড়ে পরিচিতি পান তিনি। কিন্তু তখনই থাবা বসায় কোভিড লকডাউন।

লাইভ শো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সময় ওঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় জুয়াটি খেলেন— তিনি ইউটিউবে লাইভ ‘চেস স্ট্রিমিং’ বা দাবার লাইভ সম্প্রচার শুরু করেন। সাগর শাহের সঙ্গে জুটি বেঁধে দাবার মতো গম্ভীর একটি খেলাকে ভারতের যুবসমাজের কাছে বিনোদনের অন্যতম সেরা মাধ্যম বানিয়ে তোলেন তিনি। ওঁর স্ট্রিমে বিশ্বনাথন আনন্দ, ম্যাগনাস কার্লসেন, গ্যারি কাসপারভ এবং ভ্লাদিমির ক্রামনিকের মতো বিশ্বসেরা গ্র্যান্ডমাস্টাররা এসে হাজির হতেন।

জুন ২০২৪-এ সময় লঞ্চ করেন ওঁর নিজস্ব মগজপ্রসূত শো ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’। ফরম্যাটটি ছিল অভিনব— প্রতিযোগীদের নিজের পারফরম্যান্সের রেটিং নিজেকেই করতে হতো, আর বিচারকদের প্যানেল সেই স্কোরটি আন্দাজ করার চেষ্টা করত। গান, নাচ, জাদু থেকে শুরু করে অদ্ভুত সব প্রতিভার অদ্ভুতুড়ে সব মানুষ এসে হাজির হতেন এখানে। বিচারকদের সঙ্গে তাঁদের স্ক্রিপ্টহীন মজাদার কথোপকথন ও রিলস সোশ্যালে মারাত্মক ভাইরাল হতে শুরু করে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে এটি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ডিজিটাল শো-তে পরিণত হয়।

শো-টির সাফল্যের রথ আচমকা থমকে যায় ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ। একটি পর্বে অতিথি হিসেবে হাজির ছিলেন রণবীর এলাহাবাদিয়া (বিয়ের বাইসেপস), আশিস চঞ্চলানি এবং জসপ্রীত সিং। সেখানে রণবীর এলাহাবাদিয়া এক প্রতিযোগীকে চরম এক কুরুচিকর ও বিতর্কিত প্রশ্ন করে বসেন। প্রশ্নটি ছিল— “তুমি কি বাকি জীবন প্রতিদিন তোমার বাবা-মাকে সঙ্গম করতে দেখতে পছন্দ করবে, না কি তা চিরতরে বন্ধ করতে নিজে একবার তাতে যোগ দেবে?”

এই ক্লিপটি বাইরে আসতেই দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ইন্টারনেট জুড়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেয় মানুষ। রণবীর প্রশ্নটি করলেও, শো-এর প্রধান সঞ্চালক ও ক্রিয়েটর হওয়ার দরুন ক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন সময় রায়না। জল গড়ায় থানা-পুলিশ পর্যন্ত। সময় ও রণবীরসহ ওঁর টিমের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় এফআইআর দায়ের হয়। আইনি জটিলতা এবং তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে সময় রায়না রাতারাতি ওঁর চ্যানেল থেকে ‘ইন্ডিয়াজ গট ল্যাটেন্ট’-এর সমস্ত পর্ব ডিলিট করে দিতে বাধ্য হন। শো-টি আক্ষরিক অর্থেই চুরমার হয়ে যায়।

সাধারণ কোনও ক্রিয়েটর হলে হয়তো এই বিতর্কের ধাক্কায় কেরিয়ার শেষ হয়ে যেত। কিন্তু সময় রায়না অন্য ধাতুতে গড়া। গত এপ্রিল ২০২৬-এ তিনি ওঁর স্ট্যান্ড-আপ স্পেশাল ‘স্টিল অ্যালাইভ’ ইউটিউবে রিলিজ করেন। সেখানে তিনি এই বিতর্কের পর ওঁর লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যাওয়া, মানসিক অবসাদ, আর্থিক অনটন এবং ভক্তদের সমর্থনের কথা তুলে ধরেন। এটি ইউটিউবের ইতিহাসে অন্যতম সফল স্ট্যান্ড-আপ স্পেশাল হয়ে ওঠে।

আর তার ঠিক দু-মাসের মাথায়, ২০শে জুন ২০২৬-এ ওঁর দ্বিতীয় সিজনের প্রথম এপিসোড দিয়ে সমস্ত নিন্দুকের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দিলেন সময়। সিজন ২-এর প্রিমিয়ারে অতিথি বিচারক হিসেবে হাজির হলেন খোদ  আলিয়া ভাট এবং শর্বরী ওয়াঘ!

যে শো-টিকে ‘সমাজবিরোধী’র তকমা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, আজ সেটি গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে রমরমিয়ে চলছে। সময় রায়না প্রমাণ করে দিলেন, বিতর্ক যতই তীব্র হোক না কেন, যদি দর্শকদের টানার ক্ষমতা আর নিজের প্রতিভার ওপর ভরসা থাকে, তবে ছাই থেকেও ফিনিক্স পাখির মতো বেঁচে ফেরা সম্ভব।