আজকাল ওয়েবডেস্ক: পরিষ্কার, নিরাপদ এবং কার্যত সীমাহীন শক্তির উৎসের সন্ধানে বিশ্বের বড় শক্তিগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের। সেই দৌড়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল চীন। বিশ্বের বৃহত্তম সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন ম্যাগনেট সফলভাবে তৈরি ও পরীক্ষার দাবি করেছে বেজিং। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশাল ম্যাগনেট ভবিষ্যতে ফিউশন রিঅ্যাক্টরের ভিতরে অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের দিকে চীন আরও এগিয়ে গেল।
৫৮২ টনের বিশাল ম্যাগনেট
নতুন এই ফিউশন ম্যাগনেটটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ মিটার, প্রস্থ ১২ মিটার এবং ওজন ৫৮২ টন। আকারে এটি ইংরেজি ‘D’ অক্ষরের মতো। ওজনের দিক থেকে এটি একটি সম্পূর্ণ বোঝাই বোয়িং ৭৪৭ বিমানের থেকেও বেশি বলে জানানো হয়েছে।
এই ম্যাগনেটের কাজ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা নয়, বরং ফিউশন রিঅ্যাক্টরের ভিতরে থাকা অত্যন্ত উত্তপ্ত প্লাজমাকে রিঅ্যাক্টরের দেওয়াল থেকে দূরে রাখা। বিজ্ঞানীরা একে অনেক সময় ‘অদৃশ্য চৌম্বকীয় খাঁচা’ বলে উল্লেখ করেন।
সূর্যের কেন্দ্রের থেকেও ১০ গুন বেশি তাপমাত্রা
ফিউশন বিক্রিয়ার জন্য হাইড্রোজেনকে এতটাই উত্তপ্ত করা হয় যে তা প্লাজমায় পরিণত হয়। চীনের লক্ষ্য এই প্লাজমার তাপমাত্রা প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে দেওয়া, যা সূর্যের কেন্দ্রের আনুমানিক ১৫ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রায় ১০ গুন।
সূর্যের মতো বিশাল মহাকর্ষ পৃথিবীতে না থাকায় বিজ্ঞানীদের অনেক বেশি তাপমাত্রা তৈরি করতে হয়, যাতে হাইড্রোজেনের পরমাণুগুলি একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে।
একই যন্ত্রে চরম গরম ও চরম ঠান্ডা
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হল, যেখানে প্লাজমার তাপমাত্রা থাকবে ১৫ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস, সেখানে সেটিকে ঘিরে থাকা সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেটকে রাখতে হবে মাত্র মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, অর্থাৎ পরম শূন্য তাপমাত্রার মাত্র কয়েক ডিগ্রি উপরে।
এত কম তাপমাত্রায় সুপারকন্ডাক্টর কোনও শক্তি অপচয় ছাড়াই বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক প্রবাহ বহন করতে পারে। এই ম্যাগনেটকে ১ লক্ষ অ্যাম্পিয়ারেরও বেশি বিদ্যুৎ প্রবাহ দীর্ঘ সময় ধরে বহন করতে হবে, যাতে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে প্লাজমাকে স্থির রাখা যায়।
৬০ বছর কাজ করার লক্ষ্য
চীনের দাবি, এই সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেটকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি প্রায় ৬০ বছর নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারে। এই দীর্ঘ সময়ে এটিকে তীব্র বিকিরণ, প্রবল চৌম্বকীয় চাপ এবং যান্ত্রিক চাপ সহ্য করেও কার্যক্ষম থাকতে হবে। এমন প্রযুক্তি তৈরি করাই বিজ্ঞানীদের কাছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ফিউশন শক্তি?
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় জীবাশ্ম জ্বালানি বা প্রচলিত পারমাণবিক বিভাজন প্রযুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু নিউক্লিয়ার ফিউশন-কে ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয় না, পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম এবং দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও অনেক কম তৈরি হয়। এছাড়া সমুদ্রের জলে থাকা হাইড্রোজেন থেকেই এই জ্বালানি পাওয়া সম্ভব।
চীন ২০৩০ সালের কাছাকাছি পরীক্ষামূলকভাবে ফিউশন শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্য স্থির করলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে বাণিজ্যিকভাবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হতে এখনও আরও কয়েক বছর, এমনকি কয়েক দশকও সময় লাগতে পারে। তবুও এই সাফল্যকে ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
















