আজকাল ওয়েবডেস্ক: গুজরাটের পবিত্র গিরনার পর্বতে পালকিতে চেপে এক দর্শনার্থীর যাত্রার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার খাড়া সিঁড়ি পেরিয়ে দত্তাত্রেয় চূড়ায় পৌঁছানোর এই পথটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, চারজন বাহক কাঁধে পালকি বয়ে পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, শ্রম এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পর্কিত নানা মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টিকে অনেকে ধনকুবের বা পর্যটকদের "সুবিধাভোগী মানসিকতা" এবং "পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব" হিসেবে সমালোচনা করেছেন। সমালোচকদের মতে, নিজের তীর্থযাত্রার শারীরিক কষ্ট এড়াতে অন্য মানুষকে কষ্ট দেওয়া অনুচিত। তবে অন্যদিকে, স্থানীয় বাস্তবতা তুলে ধরে অনেকেই বিষয়টিকে সমর্থন করেছেন। তাঁদের মতে, বহু বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অক্ষম মানুষের জন্য এই পালকি সেবাই একমাত্র সম্বল। পাশাপাশি, এই কাজের মাধ্যমেই বহু স্থানীয় পরিবার তাঁদের রুটিরুজি ও জীবিকা নির্বাহ করেন।
গুজরাটের জুনাগড়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান গিরনার পর্বত। জৈন এবং হিন্দু উভয় ধর্মাবলম্বীদের কাছেই এই পর্বতটি অত্যন্ত পবিত্র। পাহাড়ে অবস্থিত অম্বা মাতা মন্দির, মহাকালী মন্দির এবং সর্বোচ্চ চূড়া দত্তাত্রেয় পদুকায় পৌঁছাতে তীর্থযাত্রীদের প্রায় ১০,০০০ খাড়া পাথুরে সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়। শারীরিক পরীক্ষার মতো এই দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পার হওয়া সবার পক্ষে সহজ নয়।
সম্প্রতি সমাজমাধ্যম 'এক্স'-এ ড্যানিয়েল মায়াকোভস্কি নামের এক ব্যক্তির শেয়ার করা ভিডিও ঘিরে এই নতুন বিতর্ক দানা বেঁধেছে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, চারজন বাহক বাঁশের লাঠিতে ভারসাম্য রেখে ডোলি বা পালকি কাঁধে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন, আর তার ভেতরে বসে রয়েছেন এক ব্যক্তি। পোস্টটিতে দাবি করা হয়, অর্থবিত্তের জোরে পর্যটকেরা এভাবে স্থানীয় মানুষকে শারীরিক খাটুনিতে খাটাচ্ছেন। এর পরেই ইন্টারনেটে নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নে সাধারণ মানুষ দুটি স্পষ্ট ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
একটি অংশের মতে, ধর্মের নামে অন্য মানুষকে এভাবে কায়িক পরিশ্রমে নিয়োজিত করা অমানবিক। অনেকে মন্তব্য করেছেন যে, অর্থ থাকার অর্থ এই নয় যে অন্যের শারীরিক কষ্টকে কেনা সম্ভব।
তবে বিপরীত যুক্তিতে স্থানীয় বাসিন্দা ও সমর্থকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, এই পালকি ব্যবস্থা মূলত বয়স্ক, অসুস্থ ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য চালু রয়েছে। এছাড়া, এটি কোনও জোরজুলুমের বিষয় নয়, এটি বাহকদের নিজস্ব পেশা ও উপার্জনের মাধ্যম। অনেকের বক্তব্য, এই ধরনের কাজ বন্ধ হলে বহু পরিবারের রুটিরুজির পথ বন্ধ হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, উত্তরাঞ্চলের কেদারনাথের কথা উল্লেখ করে অনেকেই মনে করিয়ে দেন, সেখানে রোপওয়ে প্রকল্পের বিরুদ্ধে সেখানকার বাহকরা আন্দোলন করেছিলেন নিজেদের জীবিকা হারানোর ভয়ে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওটি তাই শুধু একটি সাধারণ যাত্রার দৃশ্য হয়ে থাকেনি, বরং এটি সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য, সুযোগ-সুবিধা এবং জীবিকার তাগিদে করা শ্রমের মানদণ্ড নিয়ে এক জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
















