আজকাল ওয়েবডেস্ক: ধীরে ধীরে বন্যার জল নামতে শুরু করলেও অসমে বিপর্যয়ের রেশ এখনও কাটেনি। চলতি বছরের বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮। বুধবার শিবসাগর ও গোলাঘাট জেলায় আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি। একইসঙ্গে সরকারি বুলেটিনে জানানো হয়েছে, এখনও ৩ লক্ষেরও বেশি মানুষ বন্যার প্রভাবে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শিবসাগর, চরাইদেও, গোলাঘাট, যোরহাট, নগাঁও, বিশ্বনাথ এবং কামরূপ মেট্রোপলিটন—এই সাতটি জেলায় মোট ৩ লক্ষ ৩১ জন মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। এখনও ২১টি রাজস্ব সার্কেল এবং ৫৫১টি গ্রাম জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২১,৫২৩ হেক্টর কৃষিজমি জলের নিচে থাকায় কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চরাইদেও জেলা, যেখানে প্রায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫৬১ জন মানুষ বন্যার কবলে। এরপর রয়েছে শিবসাগর ৮৪,৬০০ জন এবং যোরহাট ৪৯,৯১১ জন। মঙ্গলবারের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বন্যায় ঘরছাড়া হওয়া ১৬ হাজার ৫০০-রও বেশি মানুষ বর্তমানে ৭১টি ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া ৩০টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষকে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রশাসনের পাশাপাশি চিকিৎসক দল, পশুচিকিৎসক, জাতীয় ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নিরবচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বন্যার জেরে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে রাস্তা, বাঁধ, স্কুল, সরকারি পরিকাঠামো এবং বহু বাড়িঘরের। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১১ হাজারেরও বেশি গবাদি পশু ভেসে গেছে, আর প্রায় ১৭ হাজার পশু বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, নদীর বন্যার পাশাপাশি কামরূপ মেট্রোপলিটন জেলায় বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদুমবাড়ি, বরাগাঁও, লাচিত নগর, জু রোড, হাতিগাঁও, অনিল নগর, নবীন নগর-সহ একাধিক এলাকায় জল জমে রয়েছে। যদিও প্রশাসনের দাবি, শহরে এখনও পর্যন্ত কোনও মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সরকারি রিপোর্ট পাওয়া যায়নি।
বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ফোনে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে কথা বলে বন্যা পরিস্থিতি এবং ত্রাণকার্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। গত এক সপ্তাহের মধ্যে এটি তাঁদের দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠক। মুখ্যমন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় সরকার অসমের পাশে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ২১ জুলাইয়ের পর থেকে ভারী বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যার জল কিছুটা নেমেছে, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। বহু মানুষের বাড়ি কাদা ও পলিতে ভরে যাওয়ায় তাঁরা এখনও ফিরতে পারছেন না। নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে অনেক রাস্তা এখনও অবরুদ্ধ।
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের নির্দেশে বৃহস্পতিবার অসমে কর্মরত সমস্ত ব্যাঙ্কের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করা হবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ঋণ সংক্রান্ত বিশেষ সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সেখানে আলোচনা হবে।
এদিকে, ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত অসম, অরুণাচল প্রদেশ ও নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি এবং বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। তিনসুকিয়া জেলায় কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের আশঙ্কা, নতুন করে ভারী বৃষ্টি হলে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং যান চলাচলে বিঘ্নের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলার আবেদন জানিয়েছে।
















