আলোর রোশনাই আর ঢাকের বোলে যখন চারদিক মুখরিত, তখন উৎসবের আনন্দের আড়ালেই ঘাপটি মেরে বসে রয়েছে এক মারাত্মক বিপদ। পুজো ও বর্ষার মরশুমে সাপের কামড়ে প্রাণহানি রুখতে সম্প্রতি এক জরুরি সতর্কতা জারি করেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক ও বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা।
2
15
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সাম্প্রতিকতম তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্পদংশনের ঘটনায় এই মুহূর্তে শীর্ষস্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। মাত্র এক বছরেই রাজ্যে রেকর্ড ২৭ হাজার ৪৭১টি সাপের কামড়ের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
3
15
উৎসবের এই ভরা মরশুমেই কেন হঠাৎ বেড়ে ওঠে সাপের দাপট? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এর পেছনে প্রধান কারণ হল তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থানে ব্যাঘাত ঘটা। দুর্গাপূজার বিশাল মণ্ডপ তৈরি, ভারী কাঠামো নাড়াচাড়া ও তীব্র আলোর ব্যবহারের ফলে মাটির তলায় বা নির্জন কোণে লুকিয়ে থাকা সরীসৃপদের ডেরা নষ্ট হয়ে যায়।
4
15
ফলে তারা বাধ্য হয়ে মানুষের চলাচলের রাস্তায় বেরিয়ে আসে। এর সঙ্গে দোসর হয়েছে খামখেয়ালি আবহাওয়া—শরতের মুখেও একটানা বর্ষা ও ভ্যাপসা গরমের কারণে সাপের স্বাভাবিক জীবনচক্র ও গতিবিধি ওলটপালট হয়ে গেছে।
5
15
তার ওপর গভীর রাত পর্যন্ত মণ্ডপে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়, অন্ধকার গলিঘুঁজি বা ঝোপঝাড়ের ধার ঘেঁষে হাঁটার প্রবণতা এই মুখোমুখি সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
6
15
চিকিৎসকদের মতে, সাপে কামড়ানোর পর প্রথম এক ঘণ্টা বা তথাকথিত ‘গোল্ডেন আওয়ার’ রোগীর প্রাণ বাঁচানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, এ রাজ্যে সর্পদংশনে মৃতদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ পথেই অথবা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারান।
7
15
এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হাসপাতালে যেতে দেরি করা এবং ওঝা-গুণিন বা ঝাড়ফুঁকের মতো কুসংস্কারে মূল্যবান সময় নষ্ট করা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার জোর দিয়ে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কবিরাজি বা তুকতাকে বিষ নামে না।
8
15
আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় একমাত্র অ্যান্টি স্নেক ভেনম (এএসভি) ইঞ্জেকশনই জীবন বাঁচাতে পারে, যা রাজ্যের প্রতিটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও মহকুমা হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত রয়েছে।
9
15
শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হলে তীব্র যন্ত্রণা, বমি, আক্রান্ত স্থান ফুলে যাওয়া কিংবা শ্বাসকষ্ট ও পক্ষাঘাতের মতো লক্ষণ দেখা দেয়, যা সামান্য অবহেলাতেই মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
10
15
তাই এই সময়ে দর্শনার্থী এবং সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রাতে ঠাকুর দেখতে বেরোলে অন্ধকার রাস্তা বা ঝোপের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় সঙ্গে টর্চলাইট রাখা জরুরি।
11
15
বাড়িতে অতিথি এলে মেঝেতে ঢালাও বিছানা না করে কিছুটা উঁচু খাটে মশারি গুঁজে শোয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে বাড়ির আশপাশের আবর্জনা, শুকনো পাতার স্তূপ বা জমা কাঠ-বাঁশ দ্রুত পরিষ্কার করা দরকার।
12
15
দেবীপক্ষ বা পুজোর সময় বা বর্ষায় সাপে কাটলে অন্যান্য সময়ের মতোই শরীরে বিষক্রিয়া, তীব্র যন্ত্রণা, বমি, ফোলা ভাব বা পক্ষাঘাতের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে এবং সময়মতো চিকিৎসা না করালে তা মারাত্মক হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর সাপে কামড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়, তাই একে অবহেলা করা একদম উচিত নয়।
13
15
আর কোনওভাবে বিপদ ঘটলে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক প্রাথমিক শুশ্রূষা জরুরি। আক্রান্ত ব্যক্তিকে একেবারেই নড়াচড়া করতে না দিয়ে শান্ত রাখতে হবে, যাতে রক্তে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে। যেখানে কামড়েছে, তার আশপাশের আংটি, বালা বা আঁটসাঁট পোশাক দ্রুত খুলে ফেলতে হবে।
14
15
কোনও অবস্থাতেই ক্ষতস্থানে ব্লেড দিয়ে চেরা, মুখ দিয়ে বিষ টেনে বের করার চেষ্টা করা কিংবা শক্ত করে দড়ি বা কাপড় দিয়ে বাঁধন দেওয়া চলবে না—এতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে মাংসপেশির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।
15
15
কোনও কবিরাজ বা ওঝার কাছে না গিয়ে সরাসরি রোগীকে নিকটবর্তী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই জীবন রক্ষার একমাত্র উপায়।