সত্যজিতের ছবির গান বিনামূল্যে অথচ বাবাকে গান শোনালে নিতেন টাকা! কর্কশ কিশোর গাইলে সকলে কান চাপা দিতেন, কোন জাদুতে কিংবদন্তি?
নিজস্ব সংবাদদাতা
৪ আগস্ট ২০২৬ ১৮ : ১৮
শেয়ার করুন
1
21
ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে কিশোর কুমার শুধু একজন গায়ক নন, তিনি এক বিস্ময়। তাঁর কণ্ঠে যেমন ছিল প্রেম, তেমনই ছিল দুষ্টুমি, হাসি, বেদনা আর জীবনের উচ্ছ্বাস।
2
21
কিন্তু যে কণ্ঠ একদিন কোটি মানুষের হৃদয় জিতেছিল, সেই কণ্ঠের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না।
3
21
ছোটবেলায় কিশোর কুমারের গলা ছিল বেশ তীক্ষ্ণ ও কর্কশ। তিনি গান ধরলেই বাড়ির লোক নাকি কান চেপে ধরতেন।
4
21
কেউ ভাবতেই পারেননি, এই ছেলেটিই একদিন ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্লেব্যাক সিঙ্গার হয়ে উঠবেন। ভাগ্যের অদ্ভুত মোড় আসে যখন তাঁর বয়স মাত্র দশ। রান্নাঘরে দৌড়ে গিয়ে পায়ে গুরুতর চোট পান। যন্ত্রণায় টানা প্রায় এক মাস দিনরাত কেঁদেছিলেন। পরিবারের বিশ্বাস, সেই দীর্ঘ কান্নাই যেন তাঁর কণ্ঠস্বর বদলে দেয়। ধীরে ধীরে কর্কশ গলা হয়ে ওঠে মধুর, সুরেলা।
5
21
বড় ভাই অশোক কুমার তখন বলিউডের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা। ভাইয়ের হাত ধরেই ১৯৪৬ সালে 'শিকারি' ছবিতে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন কিশোর। ১৯৪৮ সালে 'জিদ্দি' ছবিতে প্রথম প্লেব্যাকের সুযোগও পান।
6
21
কিন্তু অভিনয়ে ভাগ্য তাঁর সঙ্গে ছিল না। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে ২২টি ছবিতে অভিনয় করলেও ১৬টিই বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়। অথচ কিশোরের মন পড়ে থাকত গানের জগতেই।
7
21
কোনও প্রথাগত তালিম ছিল না। তিনি অন্যদের নকল করতে চাননি। আর. ডি. বর্মনের উৎসাহে পাশ্চাত্যের ইয়োডেলিং শিখলেও শেষ পর্যন্ত তৈরি করেন সম্পূর্ণ নিজের স্বতন্ত্র গায়কি। সেই স্টাইলই তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে দেয়।
8
21
কলেজ জীবনেও কিশোর ছিলেন ভীষণ দুষ্টু। ক্লাসরুমের বেঞ্চ বাজিয়ে গান গাইতেন, শিক্ষকদের বকুনি খেতেন।
9
21
এই কলেজ জীবনেই জন্ম নেয় তাঁর এক বিখ্যাত গানের গল্প। ক্যান্টিনে খেয়ে ৫ টাকা ১২ আনা ধার হয়েছিল। সেই টাকা শোধ না করেই মুম্বই চলে যান। বহু বছর পরে সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাই রূপ নেয় 'চলতি কা নাম গাড়ি' ছবির কালজয়ী গান 'পাঁচ রুপাইয়া বারো আনা'-তে।
10
21
কিশোর কুমারের খামখেয়ালি স্বভাব নিয়ে আজও অসংখ্য গল্প শোনা যায়। বাড়ির বাইরে লিখে রেখেছিলেন— 'Beware of Kishore'। একবার এক প্রযোজক তাঁর পাওনা টাকা দিতে এলে টাকা নিয়ে করমর্দনের বদলে তাঁর হাত মুখে ঢুকিয়ে দেন। হতভম্ব প্রযোজককে হেসে বলেন, "বোর্ডটা দেখেননি?"
11
21
তবে এই খামখেয়ালিপনার আড়ালেই ছিল এক সংবেদনশীল মানুষ। সত্যজিৎ রায়ের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। 'চারুলতা' ছবির জন্য গান গেয়ে তিনি কোনও পারিশ্রমিক নেননি। শুধু তাই নয়, আর্থিক সমস্যায় পড়া সত্যজিৎ রায়কে সাহায্যও করেছিলেন।
12
21
কিশোর কুমারকে নিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল—পারিশ্রমিকের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কড়া। প্রাপ্য টাকা না পেলে শুটিং পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে দ্বিধা করতেন না। কিন্তু সেই মানুষটিই সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রে যেন সম্পূর্ণ অন্য এক কিশোর।
13
21
'চারুলতা' ছবির জন্য 'আমি চিনি গো চিনি তোমারে' রেকর্ডিং শেষ হওয়ার পর সত্যজিৎ রায় তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তোমার পারিশ্রমিক কত?" উত্তরে কোনও অঙ্ক বলেননি কিশোর।
14
21
তিনি নীরবে উঠে দাঁড়িয়ে সত্যজিৎ রায়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন এবং জানান, এই গানের জন্য তিনি এক টাকাও নেবেন না। তাঁর কাছে এ ছিল একজন শিল্পীর প্রতি আরেক শিল্পীর শ্রদ্ধার্ঘ্য।
15
21
শুধু তাই নয়, শোনা যায়, 'পথের পাঁচালী' নির্মাণের সময় আর্থিক সংকটে পড়ে ছবির কাজ থমকে যাওয়ার উপক্রম হলে কিশোর কুমার নাকি সত্যজিৎ রায়কে ৫,০০০ টাকা ধার দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
16
21
অথচ অন্য প্রযোজকদের কাছে নিজের প্রাপ্য পারিশ্রমিকের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। তাঁর বিখ্যাত সংলাপ ছিল— "আধা পয়সা তো আধা মেকআপ।"
17
21
এমনকি ছোটবেলায় বাবা গান শোনাতে বললেও বাবাকে ছোট্ট কিশোর বলেছিলেন, কে এস সায়গলের মতো গান শোনানোর জন্য লাগবে পুরো এক টাকা৷
18
21
অমিতাভ বচ্চনের 'খাইকে পান বানারসওয়ালা' গান গাওয়ার আগে কিশোর কুমার সত্যিই বানারসি পান চিবিয়েছিলেন, যাতে গলায় সেই স্বাদ আর অনুভূতি ফুটে ওঠে।
19
21
দেব আনন্দ, জিতেন্দ্র, অমিতাভ বচ্চন— অনেক নায়কের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তবে সবচেয়ে বেশি গান গেয়েছেন রাজেশ খান্নার জন্য। তাঁদের জুটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে রাজেশ খান্না একবার বলেছিলেন, "আমরা দু'জন মানুষ ছিলাম, কিন্তু আমাদের কণ্ঠ ছিল একটাই।"
20
21
কিশোর কুমারের জীবন ছিল ঠিক তাঁর গানের মতোই— কখনও হাসিতে ভরা, কখনও গভীর বিষাদে ডুবে থাকা, কখনও আবার অদ্ভুত খেয়ালে ভরা। তাই মৃত্যুর বহু বছর পরেও তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি গায়ক নন, তিনি এক অনন্ত অনুভূতির নাম।
21
21
তাঁর গান যেমন আজও নতুন প্রজন্মকে ছুঁয়ে যায়, তেমনই তাঁর জীবনের গল্পও বারবার মনে করিয়ে দেয়— সত্যিকারের শিল্পীরা কখনও হারিয়ে যান না, তাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁদের সৃষ্টির মধ্যেই।