সম্পর্কের অলিগলিতে উষ্ণতার পরশ। কতটা মন কাড়ল ‘মুসাফির ক্যাফে’? সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
এক শহর থেকে অন্য শহর, এক দেশ থেকে অন্য দেশ। মুসাফির আসলে থিতু হতে চায় না কোথাও। পথ চলতে থাকে সর্বক্ষণ। এক পলকের থামা, বুক ভরে নেওয়া সদ্য পা রাখা ঠিকানার ঘ্রাণ। ব্যস, আবার ছুট শুরু। নতুন নতুন সব অভিজ্ঞতার খোঁজে। কিন্তু মুসাফির কি শুধু নতুন জায়গার খোঁজে ছুটে বেড়ায়? তার এ পথচলা বোধহয় নিজেকে প্রতিবার নতুন করে খুঁজতেও।
আর জীবন-পথের মুসাফিররা? তারাও কি আসলে একই রকম ছুটছে না? এক সম্পর্ক থেকে অন্য সম্পর্কে, এক অনুভূতি থেকে অন্য অনুভূতিতে, তারাও তো রোজ এগোচ্ছে নতুন নতুন পথ ধরে। সেই পথচলাও কি শুধু স্বপ্ন আর ভালবাসার খোঁজে? আবেগের পথ ধরে আসলে কি নিজেকেও নতুন করে চেনা হয়ে যায় না?
এ প্রশ্নটাই ভাবাচ্ছিল নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ওয়েব সিরিজ ‘মুসাফির ক্যাফে’ দেখতে দেখতে। অতীত হোক বা বর্তমান, এ প্রজন্ম হোক বা ও প্রজন্ম, ভালবাসায় ঘিরে বাঁচতে চাওয়ার ইচ্ছেটা তো চিরন্তন। কিন্তু প্রেম মানে আসলে কি মনের মানুষের হাত ধরে পথ চলতে পারার অনুভূতি নাকি তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা, ভাল থাকা নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সুখ? প্রিয় সেই মানুষ যদি হাত ছেড়ে যায় কখনও, তা হলে কি নিজেকেও তবে হারিয়ে ফেলতে হয় পুরোপুরি? নাকি অন্য কাউকে ঘিরে স্বপ্ন দেখে নিজেকে খুঁজে নেওয়া যায় নতুন করে? সেই উত্তরগুলোই মেলে ধরে দিব্যপ্রকাশ দুবের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি আট পর্বের এই সিরিজ। তার তিন মূল চরিত্র, তিন মুসাফির— চন্দর, সুধা এবং প্রীতির হাত ধরে।
এ গল্পে চন্দর (বিক্রান্ত মাসে) এক সাধাসিধে যুবক। ভোপালে লজিস্টিকসের চাকরি করতে করতে যে বুকের ভিতর বাঁচিয়ে রাখে পাহাড়ের কোলে এক ছোট্ট ক্যাফে গড়ে তোলার স্বপ্ন। পর্যটকেরা সেখানে এসে দু’দণ্ড জিরোবে, ভাগ করে নেবে তাদের সুখ-দুঃখ, স্বপ্ন আর অভিজ্ঞতার কাহিনি— এইটুকুই তার চাওয়া। বহু বছরের এক প্রেম ভেঙে একলা হয়ে পড়া চন্দরকে জীবনে থিতু করতে চেয়ে তার মা একের পর এক পাত্রীর সঙ্গে তার দেখা করান। তাদেরই একজন ছিল ডিভোর্স আইনজীবী সুধা (বেদিকা পিন্টো)। প্রাণোচ্ছ্বল, জীবনের সবকিছুকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে চাওয়া সুধাও বড্ড একলা। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে, যৌথ পরিবারে মায়ের কষ্ট দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা মেয়ের স্বপ্ন একটাই। নিজের পায়ের তলার জমিটাকে ভীষণ রকম শক্ত করে মাকে সব রকম সুখ দিতে পারা। মা তাকে বিয়ে দিতে চাইলেও তাই ঘোরতর অরাজি সুধা। একের পর এক পাত্রকে সে নাকচ করে চলে। কিন্তু গোলমাল হয়ে যায় চন্দরের সঙ্গে মিশে। দু’জনেই তারপর ধরা দিয়েছিল উথালপাথাল প্রেমে।
সিরিজের শুরু এর আট বছর পরে। অনেকটা বদলে যাওয়া চন্দর এখন সত্যি সত্যি মুসৌরিতে থাকে। পাহাড়ে ঘেরা ছবির মতো ‘মুসাফির ক্যাফে’ চালায় প্রীতির (মহিমা মকওয়ানা) সঙ্গে। প্রীতি তার ভালবাসা দিয়ে, যত্ন দিয়ে শুধু ক্যাফে নয়, চন্দরের জীবনটাকেও ভরিয়ে রাখে। সুধার কথা সে জানে। জানে আজও চন্দরের মনের গহীনে কোথাও সেই কন্যেরই বাস। তবু ভালবাসার টানেই সে চন্দরকে ছেড়ে যেতে পারেনা। চন্দর, প্রীতি দু’জনেরই জানা, একদিন সুধা ফিরে আসতেও পারে। কিন্তু সত্যিই যদি সুধা ফিরে আসে কখনও? সেদিন কি চন্দর প্রীতির ভালবাসাকে উপেক্ষা করে ফের তার হাতটাই ধরবে? নাকি থেকে যাবে তার এলোমেলো জীবনটাকে গুছিয়ে দেওয়া প্রীতির সঙ্গেই? অতীত-বর্তমানে ঘুরেফিরে তা নিয়েই এগিয়েছে সিরিজের গল্প।
যুগের হাত ধরে পাল্টেছে প্রেমের ধরন, বদলেছে তার ভাবনা। একালের প্রজন্ম বিশ্বাস করে সম্পর্ক আসলে ভাল থাকার, ভাল রাখার আর এক নাম। কারও হাত সারা জীবনের জন্য ধরা না-ই বা থাকল, তবু একসঙ্গে কাটানো ভাল সময়ের উষ্ণতা বা স্মৃতিগুলো ঠিক থেকে যায় মনের ভিতর। তা বলে আরও একটা সম্পর্কে যেতে, ভাল থাকতেও তো মানা নেই। জীবনের দুটো পর্বে দুটো আলাদা মানুষকে ভালবাসতেও বাধা নেই। এক সময়ে দেখা স্বপ্ন সময়ের হাত ধরে একটু পাল্টে গেলেই বা ক্ষতি কী! একালের ভালবাসার এই সহজ চলনপথটাকেই ছুঁয়ে গিয়েছে ‘মুসাফির ক্যাফে’। নিজের মতো করে, সহজ সরল এক কাহিনিতে একেবারে পাশের বাড়ির চেনা মুখগুলোর মতোই তিনটে চরিত্রকে বুনে দিয়ে। দর্শক তাই অনায়াসে বুঝে ফেলতে পারেন সুধার প্রেম আর স্বপ্নের টানাপোড়েন, ছুঁয়ে দেখতে পারেন আচমকা বিচ্ছেদে বিধ্বস্ত চন্দরকে। বুকের ভিতর কষ্ট জমাট বাঁধে প্রীতির না-পাওয়াগুলোয়। এখানেই পরিচালক রুচির অরুণের মুন্সিয়ানা। কোনও রকম জটিলতার ধারপাশ দিয়ে না গিয়ে স্রেফ ভাঙাচোরা মন আর তার অনুভূতিগুলোকেই হাটখোলা করে রেখেছেন তিনি। আর তাই মন ছুঁয়ে গিয়েছে একের পর এক ছোট্ট ছোট্ট অনাবিল মুহূর্ত। ধাক্কা দিয়ে গিয়েছে অমোঘ সত্যির মতো এক একটা সহজ সংলাপ।
বিক্রান্ত অনবদ্য। সুধার প্রেমে হাবুডুবু চন্দর, ক্যাফের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পথ খুলতে দেখে তার বাঁধনছাড়া আনন্দ, হঠাৎ বিচ্ছেদে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া কিংবা প্রীতিকে নিয়ে নতুন করে বাঁচতে শেখা পরিণত এক মুসাফির—প্রত্যেকটা মুহূর্তে তিনি সমান জীবন্ত। অন্যদিকে সুধার প্রাণশক্তি, তার ভালবাসা, খামখেয়াল কিংবা স্বপ্নের সঙ্গে আপস করতে না চাওয়া দৃঢ়তা, সবেতেই নিজের দিক থেকে এক মুহূর্ত চোখ ফেরাতে দেন না বেদিকা। মহিমাও ঠিক ততটাই যত্নে গড়েন প্রীতিকে। তার ভালবাসা, তার চাপা কষ্ট, হাল-না ছাড়া পাশে থাকা, সবটাই যেন বড্ড সত্যি মনে হয়। ছোট্ট ছোট্ট চরিত্রে মন ছুঁয়ে গিয়েছেন আদিল হুসেন, সাদিয়া সিদ্দিকী, লাভলিন মিশ্র, অনুভা ফতেপুরিয়ারাও।
জটিল খাতে বয়ে চলা কাহিনি, টানটান নাটকীয়তা, রোমাঞ্চ-উত্তেজনায় ভরা সিরিজের ভিড়ে ‘মুসাফির ক্যাফে’ আসলে খানিক থিতু হতে বলে। তার উষ্ণতা, নাটুকে মোড়বিহীন সহজ চলনে থমকে দিতে চায় মুসাফির দর্শকের ছুট। সেটাই কারও ভীষণরকম মনে ধরতে পারে। কারও হয়তো বা মনে হতে পারে একটু যেন ঢিমেতালে চলছে গল্প। তবে হ্যাঁ, সুধা-চন্দরের প্রেমের সবটুকু যেখানে মেলে ধরা, সেখানে প্রীতির সঙ্গে কেমন করে জড়িয়ে পড়ল চন্দর, কীভাবে ধরা দিল তার ভালবাসায়, সে গল্প আরও খানিকটা জানা গেলে ভাল হত। এ-ও হতে পারে দ্বিতীয় সিজনে সে দিকটায় গড়াবে সিরিজের কাহিনি।
যদিও এ সিরিজের এমন একটা ক্লাইম্যাক্স না হলেও চলত বোধহয়। পরবর্তী সিজনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া না হলেও এ কাহিনির স্বাদ এতটুকু কমে যেত না। চন্দর-সুধার সম্পর্ক যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে দাঁড়ি পড়লেও এতটুকু রেশ ফেলত না তার উষ্ণতায়। যে উষ্ণতা ‘মুসাফির ক্যাফে’কে এক পলকে সেঁধিয়ে দিয়েছে বুকের ভিতর। যে স্বাদ লেগে থাকে মনের অলিতে গলিতে। সিরিজ শেষ হয়ে যাওয়ার বহু বহুক্ষণ পরেও।
















