ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিষ্ণুপুর ঘরানার কিংবদন্তি পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় সদ্যপ্রয়াত৷ একাধারে শতবর্ষব্যাপী সুরসাধকের সাঙ্গীতিক দক্ষতা অন্যদিকে অসংখ্য শিল্পী তৈরির গুরুদায়িত্ব পালন, পান্ডিত্য এবং প্রজ্ঞার আধারে আলোকিত এমন এক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানার হয়তো শেষ নেই৷ আজকাল ডট ইন যোগাযোগ করেছিল তবলাবাদক পণ্ডিত শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।
শুভেন চট্টোপাধ্যায় বলেন, " আমাদের গানবাজনার শুরু থেকে আমরা মঞ্চে দেখেছি পণ্ডিত অমিয়রঞ্জনকে৷ এবং ওঁর সুরসাধনা ছিল স্থিতধী, ধৈর্য এবং শিক্ষার অপূর্ব মেলবন্ধন যা দেখে আমাদের গর্ববোধ হত৷ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই শিক্ষা, শান্তি, স্নিগ্ধতা একান্ত প্রয়োজন। সঙ্গীতের মূল ভাব সেইসঙ্গে যথাযথ শিক্ষা আর বোধ বজায় রেখেও যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে বিনোদন সম্ভব তা খুব কম শিল্পীই তাঁর পরিবেশনার মাধ্যমে শ্রোতাদের উপলদ্ধি করাতে পারতেন, এই বিষয় অমিয়রঞ্জন অগ্রগণ্য৷ এই মুন্সিয়ানা ছিল মাস্টারমশাইয়ের। আমি ওঁর কাছে প্রথাগতভাবে গান শিখিনি কিন্তু উনি আমাদের সকলের কাছে নিজগুণে আর ব্যক্তিত্বে মাস্টারমশাই৷"
কথাবার্তা আদবকায়দা সামগ্রিক জীবনযাপনের মধ্যে অসম্ভব পাণ্ডিত্য প্রতিফলিত হত। শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের মতে, "একজন আদর্শ গুরুর প্রতিভু পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। বিষয়টা তিনি জানতেন৷ কিন্তু সেই জ্ঞানের কারণে কখনও কোনও অহং ছিল না৷"
কেবল সঙ্গীত নয়, জীবনেও তিনি ছিলেন আদর্শ৷ শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের সংযোজন, "অমিয়রঞ্জনের পুত্র শান্তনু আমার প্রতিবেশী, বিশেষ বন্ধু৷ ওঁর কাছেও শুনেছি মাস্টারমশাইয়ের নিয়মনিষ্ঠ জীবনযাপনের কথা৷ এই জীবনযাপনও আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়৷ এই নিয়মানুবর্তিতার কারণে সুস্থ দেহে এতগুলো বছর সুরসাধনায় নিজেকে নিমগ্ন রেখেছিলেন এবং সেইসঙ্গে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী তৈরি করেছেন৷ প্রয়াণের কিছু মাস আগেও অনুষ্ঠান করেছেন৷"
বিষ্ণুপুর ঘরানার ঐতিহ্যময় শিল্পধারা পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিভার গুণে দেশে বিদেশে বিস্তার লাভ করেছিল৷ শুভেন চট্টোপাধ্যায় বলেন, "বিষ্ণুপুর ঘরানার কথা বললে যে দু’-তিনজনের নাম আসে তাঁদের মধ্যে আচার্য গোকুল নাগ, পন্ডিত মণিলাল নাগ ( যাঁর সঙ্গে আমি প্রায় ৩০-৪০ বছর দেশে বিদেশে অনুষ্ঠান করেছি৷ সেইসূত্রে বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গে আমারও হৃদ্যতা, এখন ওঁর মেয়ে বিদূষী মিতা নাগের সঙ্গে বাজাচ্ছি বিশ্বজুড়ে।) এবং পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁরা বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রতিনিধি বলা যেতে পারে৷ এবং আরও গর্বের বিষয় এই ঘরানা যদু ভট্টের ঘরানা৷ ছোটবেলায় বহু বড় বড় উস্তাদদের অনুষ্ঠান দেখেছি কলকাতায়৷ তাঁর মধ্যে যখন পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় মঞ্চে উঠতেন, তখন মনে হত বাহ!"
পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুষ্টান দেখার সুবাদে শুভেন চট্টোপাধ্যায় জানালেন শ্রোতা হিসাবে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা৷ শুভেন চট্টোপাধ্যায় বলেন, "ওঁর গায়কী অপূর্ব সে তো বলা বাহুল্য, কিন্তু খেয়ালিয়াতে যে তীক্ষ্ণতা, একটা খেয়ালিয়ার মাহাত্ম্য অনুভব করা যায় রাগবিস্তার, ঠেহরাহ, এবং তারপরে বিলম্বিত তালটাকে নিয়ে চলা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে কণ্ঠশিল্পী আর সহযোগী শিল্পী একসঙ্গে সুরবিস্তার করেন৷ এই ধরনের আর্টিস্ট তবলাটাকেও এত বুঝতেন, যে শিল্পের পূর্ণ বিকাশ হত৷"
এই প্রসঙ্গে শুভেন চট্টোপাধ্যায় 'রাগদারী'র কথা বলেন৷ যে রাগটা গাওয়া হচ্ছে সেই রাগটাকে কত সুন্দর ভাবে তার বঢ়ত করআ হচ্ছে। "রাগ তান এসবের ঊর্ধ্বে ওঁর বন্দিশ৷ অমিয়বাবুর গান শুনতে যাওয়া মানেই অসাধারণ সব বন্দিশ শুনতে পাওয়া৷" শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের সংযোজন৷
শুভেন চট্টোপাধ্যায়ের কাছে সুরসাধক অমিয়রঞ্জন চিরকালীন৷ শুভেন চট্টোপাধ্যায় বলেন, "অমিয়বাবু এমন একজন মানুষ যাঁর গান কেবল নয়, ওঁর বসা, মাথায় টুপি পরা এই সবকিছুতে ছিল পান্ডিত্য আর বনেদিয়ানা৷ উনি যেভাবে ছাত্রছাত্রীদের তৈরি করেছেন শিখিয়েছেন, ওঁর মতো শিক্ষক সমগ্র বাংলায় আর কেউ নেই বলেই আমার মনে হয়। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীও ওঁকে মাস্টারমশাই বলতেন। সাধনার পথে যখন কোনও শিল্পীর দিশেহারা অবস্থা হয় তখন এই ধরনের মানুষরাই দিশা দেখান৷ সেই কারণেই পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন একজন মহীরুহের মতো, যে আশ্রয় চলে গেলে বড় শূন্য মনে হয়৷ তবে কিংবদন্তীরা চিরঅমর, তাই যতদিন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থাকবে পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ও বেঁচে থাকবেন।"
















