সোমবার, ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন বাংলাদেশি অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি। জানালেন বর্তমানে তিনি বেকার। কোনও কাজ নেই তাঁর হাতে। মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। 

এদিন কাঁদতে কাঁদতে ফেসবুক লাইভে এসে তিনি তাঁর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। জ্যোতিকা জ্যোতি জানান তিনি এই যন্ত্রণা আর টানতে পারছেন না। বাংলাদেশ সরকারের কাছে তিনি অনুরোধ করেন যাতে এই অবস্থার তাঁরা ইতি টানেন। 'মুক্তি' চেয়ে তিনি ফেসবুক লাইভে বলেন, "কাজ নেই। কাউকে কিছু বললে বলে, 'দেশের এই অবস্থা, ধৈর্য ধরো। সব ঠিক হবে।' টাকা নেই বললে, টিটকিরি দেয়। কিন্তু আমি আর পারছি না। ২০২৪ সালের পর কাছের মানুষদের যে বিপরীত চেহারা দেখেছি, রাষ্ট্রের যে নির্যাতন দেখেছি সেটা আর নিতে পারছি না। আপনারা বলবেন আমি কান্নাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছি, কিন্তু আমি জানি এটাকে আমাকে আরও অনেকদিন সহ্য করতে হবে। কিন্তু আমি আর পারছি না।" 

লাইভের শুরুতেই জ্যোতিকা বলেন, "আমার কষ্ট শেয়ার করার মতো কেউ নেই। কিন্তু যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, এই ধরুন কেউ যদি আত্মহত্যা করে তখন আমরা বলি,  যে কেন করল? কিন্তু যে করে সে জানে তার সমস্যাগুলো। আমি খুব শক্ত একজন মানুষ, আমি আমার সমস্যাগুলো কাউকে কখনও বলি না, কিছু চাই না। কিন্তু গত দুই-তিনদিন ধরে হেল্পলেস লাগছে, ডিপ্রেসড লাগছে। গত দুই বছর ধরে আমি বেকার। অনলাইনে প্রতিদিন আমি নোংরা গালিগালাজ শুনি, আমার বাবা-মায়ের থেকে আর্থিক সাহায্য নিতে হয়, ওঁরা টেনশন করেন। আমি আর পারছি না।" 

কিন্তু কেন তাঁকে এভাবে হ্যারাস করা হচ্ছে? কীসের সমস্যা? এই বিষয়ে অভিনেত্রী নিজেই বলেন, "যেহেতু আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক, এই দেশকে আমি ভালবাসি, সে কারণে এক শ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত হুমকি, অনলাইন বুলি, নির্যাতন করে যাচ্ছে আমাকে। সহ্য করছি। 'ফ্যাসিস্ট' তকমা দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ভাবে অনেক মামলা দেওয়া হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে দেড় বছর বের হতে পারিনি। 
মেনে নিচ্ছিলাম সব, কিন্তু সম্প্রতি এমন একটা জিনিস ঘটেছে যা মেনে নিতে পারছি না। আওয়ামি লিগের একটা গ্রুপ আমাকে যে লেভেলের হ্যারাস করেছে সেটা নিতে পারছি না। তারা যা যা লিখেছে, যা করেছে মনে হচ্ছে আমি প্রস্টিটিউট ছাড়া আর কিছু না। আমার শিক্ষা, অবস্থান, সব মিথ্যে মনে হচ্ছে। বলা হচ্ছে আমি হাজার কোটি টাকা ইনকাম করেছি, অথচ আমার কাছে আমার চিকিৎসা করানোর টাকা নেই। ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারি না, বয়কট করা হয়েছে, শিল্পকলা একাডেমিতে মব করা হয়েছে, বাড়িতে লোক পাঠানো হয়েছে। হত্যা মামলার আসামি বানানো হয়েছে।"

আওয়ামী লীগের তরফে কী বলা হয়েছে জ্যোতিকাকে? "বলা হয়েছে, আমি খাট কাঁপাই, বিছানা গরম করি। স্লাট শেমিং করা হয়েছে। এগুলো নিতে পারছি না। যে দলকে নিজেদের লোক ভাবি, তাদের থেকে এই কথা নিতে পারছি না। ধৈর্য শেষ। তার মধ্যে সরকার পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। আমাকে নিয়ে কাজ করতে ভয় পায় লোক। নির্বাচিত সরকার আসার পরও কিছু ঠিক হয়নি। একজন শিল্পী কতটা অপরাধ করতে পারে সেটা বোধহয় যাচাই বাছাই করা উচিত ছিল", জানালেন ঋত্বিকের সহঅভিনেত্রী।

তিনি এদিন আরও বলেন, "বাংলদেশে মেয়ে হয়ে জন্মানো পাপ ছিল। মিডিয়ায় কাজ করা আরও বড় পাপ ছিল। আমাকে যা খুশি বলা যায়। আমি আমার থেকে অযোগ্য কাউকে গিয়ে অনুরোধ করতে পারব না কাজ দেওয়ার জন্য। আমি কম্প্রোমাইজ করতে পারি না। আমার জীবনটা নরক হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশে জন্মানোটা সবথেকে বড় ভুল।" 

জ্যোতিকা তাঁর লাইভে জানান তাঁর কোথাও আর যাওয়ার জায়গা নেই। তাঁকে নিয়ে আশেপাশের মানুষের ধারণা, তাঁকে ক্রমাগত বলে চলা কটূ কথা তিনি আর নিতে পারছেন না। তাঁর কথায়, "শিল্পী হলে বোবা, কালা হয়ে থাকতে হবে। কোনও মতপ্রকাশ করা যাবে না। আমি বুঝেছি, আমারই পাপ যে এই দেশে জন্মগ্রহণ করেছি, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই দেশকে ছেড়ে যেতে চাইনি।" 

তিনি তাঁর রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে এদিন স্পষ্টভাবে বলেন, "একসময় আপনারা সবাইকে আপনারা মেরে ফেলবেন। তারপর নিজেরা নিজেদের মারবেন। একসময় এই দেশ কবর হয়ে যাবে। আমি হেল্পলেস। আমি দুঃখিত যে আমার দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলেছি। কিন্তু আমার আর শক্তি নেই। আমি কিছু বলে বা লিখে কাউকে কিছুই বোঝাতে পারব না এই মুহূর্তে। গত ২ বছর কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলিনি। শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি। আমার মনে হচ্ছে আমি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।" 

প্রসঙ্গত, জ্যোতিকা জ্যোতি যে কেবল ঢালিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী সেটাই নয়, তিনি এপার বাংলাতেও কাজ করেছেন। 'রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত' ছবিতে ঋত্বিক চক্রবর্তীর বিপরীতে কাজ করেছিলেন। তাঁর এদিনের ফেসবুক লাইভ দেখে নেটিজেন, তাঁর অনুরাগীরা তাঁকে শান্ত হতে বলেন। ধৈর্য ধরতে বলেন। কিন্তু অঝোরে কেঁদে চলেন তিনি। 

লাইভ চলাকালীনও বারংবার তাঁর ফোন আসতে থাকে, কিন্তু তিনি একটি ফোনেরও উত্তর দেন না। নিজের ভিতর জমে থাকা ক্ষোভ, যন্ত্রণা উগরে দেন সমাজমাধ্যমেই। লাইভের শেষে তিনি এও স্পষ্ট করে দেন, তাঁর এই কান্না কোনও অভিনয় নয়। তিনি সত্যিই নিরুপায় বর্তমানে। এই বিষয়ে জ্যোতিকা বলেন, "এটা কোনও অস্ত্র বা অভিনয় নয়। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের এত নোংরামো আর নিতে পারছি না।"