আজকাল ওয়েবডেস্ক: বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, মনের জোর এবং এক অদম্য লড়াইয়ের ফল মিলল অস্মিতা দে-র হাতে। কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ২৩ বছরের এই জুডোকা। শুধু নিজের পরিশ্রম নয়, তাঁর এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে এক গভীর আবেগের গল্প, যেখানে অনুপ্রেরণার জায়গা করে নিয়েছেন ফুটবল কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।

গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে কানাডার হেইডি কোয়াচকে হারিয়ে সোনা জেতেন অস্মিতা। এর মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় সোনা জয়ী প্রথম ভারতীয় খেলোয়াড়।

ঐতিহাসিক জয়ের পর সনি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অস্মিতা জানান, তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা রোনাল্ডোর জীবনসংগ্রাম। তিনি বলেন, “আমি যে মানুষটির সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি দেখি ও পড়ি, তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। তাঁর জীবনেও অনেক কঠিন সময় এসেছে। আমি তাঁর যাত্রা খুব কাছ থেকে অনুসরণ করেছি।”

অস্মিতা আরও বলেন, “রোনাল্ডো ১৯ বছর বয়সে তাঁর বাবাকে হারিয়েছিলেন। তারপরও তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়েছেন। আজ গোটা বিশ্ব তাঁকে চেনে। তাঁর জীবন থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। তিনিই আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।”

অস্মিতার নিজের জীবনেও রয়েছে একই রকম কঠিন অধ্যায়। গত বছর মস্তিষ্কে স্ট্রোক হয়ে তাঁর বাবা অর্জুন দে-র মৃত্যু হয়। ত্রিপুরার এই মানুষটি পেশায় ছিলেন সাইকেল মেকানিক। দিনে মাত্র ৩০০ টাকা আয় করেও তিনি মেয়ের খেলাধুলার স্বপ্ন পূরণে সবরকম চেষ্টা করেছিলেন।

বাবার মৃত্যুর পর অস্মিতা একসময়ে ভেবেছিলেন, আর হয়তো প্রতিযোগিতামূলক জগতে থাকা সম্ভব হবে না। কিন্তু তাঁর মা তাঁকে আবার প্রশিক্ষণে ফিরতে উৎসাহ দেন। বাবার দেখা স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই তিনি নতুন করে লড়াই শুরু করেন।

দক্ষিণ ত্রিপুরার বেলোনিয়ায় জন্ম অস্মিতার। ছোটবেলায় মাটির বাড়িতে বড় হওয়া এই ক্রীড়াবিদের জীবনে আর্থিক সমস্যাই ছিল নিত্যসঙ্গী। বাবার সামান্য আয়ের মধ্যেও মেয়ের খেলাধুলার জন্য তিনি সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন। পরে অস্মিতা ভোপালের স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ নেন এবং খেলার কোটায় উত্তরপ্রদেশ পুলিশে চাকরি পান।

কমনওয়েলথের মঞ্চে পৌঁছানোর পথও সহজ ছিল না। অস্মিতা জানিয়েছেন, প্রতিযোগিতার আগে তিনি উদ্বেগ, চাপ এবং ঘুমহীন রাতের সঙ্গে লড়াই করেছেন। বারবার মনে হয়েছে, এই সুযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর মানসিক দৃঢ়তাই জয় এনে দেয়। প্রতিযোগিতায় স্কটল্যান্ডের ইভা ইউইং এবং সারাহ অ্যাডলিংটনকে হারানোর পর ফাইনালে কানাডার হেইডি কোয়াচের মুখোমুখি হন তিনি। টানটান উত্তেজনার লড়াইয়ে গোল্ডেন স্কোরে ২-১ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নিয়ে ইতিহাস তৈরি করেন অস্মিতা। 

পদক মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই মুহূর্তে আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল একরাশ আবেগ। যাঁকে পাশে দেখতে সবচেয়ে বেশি চেয়েছিলেন, সেই বাবা  আর নেই। কিন্তু বাবার স্বপ্ন পূরণের তাগিদ এবং রোনাল্ডোর মতো হার না মানার মানসিকতা নিয়েই অস্মিতা ভারতীয় জুডোর ইতিহাসে নিজের নাম লিখে ফেললেন।