অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছাটা ছিল কিন্তু অভিনেতা হওয়ার জন্য যে একাগ্রতা প্রয়োজন তা কি আছে? আত্মজিজ্ঞাসা থেকেই থিয়েটারে আসা৷ দু'বছর চা জল দেওয়াতেও আপত্তি ছিল না তাঁর৷ কেবল ক্যামেরার সামন্দ নত, ক্যামেরার পিছনেও যিনি সমান আগ্রহী তিনি অভিনেতা আরিয়ুন ঘোষ৷ প্রথম ছবিতেই একাধিক পুরস্কার৷ বার্লিনে ১৪ তম ইন্দো জার্মান ফিল্ম উইকে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন আরিয়ুন ঘোষ৷ ২৬তম নিউ ইয়র্ক ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (NYIFF) ২০২৬ এ সেরা পরিচালক হিসাবে রঞ্জন ঘোষ এবং সেরা অভিনেতা হিসাবে মনোনীত হয়েছেন আরিয়ুন ঘোষ৷ 'অদম্য' ছবিতে পলাশ চরিত্রে অভিনয় করে যিনি ইতিমধ্যেই দর্শক থেকে সমালোচক সকলের মন জয় করেছেন৷ মেরিন ড্রাইভে বসে একটি বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় কথা বললেন আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে। শুনলেন সায়নী মুখার্জি
‘অদম্য’-এর জন্য এই সাফল্য, পুরস্কার, স্বীকৃতি কেমন লাগছে?
আরিয়ুন: ভাল তো লাগছেই। যেকোনো অভিনেতার কাছে এই স্বীকৃতি অনেকটা সাহস দেয়৷ যেকোনও রেকগনিশন আমার মনে হয় মানসিকভাবে এগিয়ে যেতে বিশাল সাহস দেয়৷ মনে হচ্ছে অনেকটা দায়িত্ব বেড়ে গেল।
এটা কি আরিয়ুনের টার্নিং পয়েন্ট বলা যেতে পারে?
আরিয়ুন: টার্নিং পয়েন্ট কিনা বলতে পারব না, তবে অনেকটা সাহস জুগিয়েছে এই তিনটে অ্যাওয়ার্ড। আশা রাখি, ভবিষ্যতে আরও ভাল ভাল কাজ করতে পারব৷

পলাশ চরিত্রটি যখন আপনার কাছে এল, প্রথমেই কোন ভাবনা এসেছিল?
আরিয়ুন: রঞ্জনদার সঙ্গে পন্ডিচেরিতে স্ক্রিপ্টটা লিখেছিলাম। সেই সময় ছবিটি আমার করবার কথা ছিল না। আমি রঞ্জনদাকে সাজেস্টও করতাম যে, এই চরিত্রটি করবার জন্য, এ পারফেক্ট, ওর ফেস বেটার এবং ওর অভিনয় ভাল। হঠাৎ একদিন এসে বলে যে, আমি চাই তুমি এটা করো, তখন আমি একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল এত বড় একটা গুরু দায়িত্ব, পলাশের মতন চরিত্রকে আমি কি পারব যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে? আমি ভাবার জন্য এক সপ্তাহ সময় নিয়েছিলাম৷ তারপর মনে হল, রঞ্জনদা যখন ভরসা করতে পারছে আমি তাহলে পারব৷
যেকোনো অভিনেতারই তো একটা স্বপ্ন থাকে যে আমি একটা ভাল চরিত্র করতে চাই, সেখানে আপনি অন্য অভিনেতাদের সুপারিশ করছিলেন কেন?
আরিয়ুন: ছবিটা অন্য অভিনেতাদের নিয়েই করবার কথা হয়েছিল শুরুর দিকে। কিন্তু রঞ্জনদা কখনও অভিনেতার বিষয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি৷ রঞ্জনদা চেয়েছিলেন নতুন অভিনেতা নিয়ে কাজ করতে৷ সেই সুবাদেই আমার পলাশ পাওয়া। আমার মনে হয়, খুব কম অভিনেতাই এই ধরনের চরিত্র পায় যেটা আমি পেয়েছি।
এই চরিত্রটির জন্য আপনি ডিরেক্টরের প্রথম পছন্দ হয়ে উঠলেন কেন?
আরিয়ুন: সেইটা তো রঞ্জনদা বলতে পারবে ভাল।
আমাদের সকলের নিজের সম্পর্কে একটা বিশ্লেষণ থাকে...
আরিয়ুন: আট-নয় বছর হয়ে গেল আমি রঞ্জনদার সহকারী হিসাবে কাজ করছি৷ হয়তো আমার ডেডিকেশন দেখেই রঞ্জনদার মনে হয়েছিল একে চরিত্রটা দিলে ও নিজের বেস্টটা দেবে৷
সুন্দরবনে শুটিং, কেমন অভিজ্ঞতা?
আরিয়ুন: আমরা সুন্দরবনে প্রায় এক বছরের উপর রেইকি করতে গিয়েছিলাম। কারণ সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় শুটিং। এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে ২০২১-২২ এর দিকে বিদ্যুৎ এসেছে৷ এমনও জায়গা আছে যেখানে বাঘ আসে, কুমিরের বাস৷ সন্ধ্যেবেলা হলেই ইলেকট্রিক থাকে না৷ এরকম একটা জায়গায় শুটিং করা চ্যালেঞ্জিং কিন্তু আমরা 'অদম্য' বানিয়ে ফেলেছি৷
এই চরিত্রের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
আরিয়ুন: আমি যুক্ত ছিলাম একেবারে প্রথম দিন থেকে, চরিত্র সম্বন্ধে জানতাম। পলাশের মনন, ওর পলিটিক্যাল আইডিয়লজি, ওর এজেন্ডা সবই জানতাম৷ প্রায় ১২ কেজি ওজন কমাতে হয়েছিল। আর অবশ্যই ভগৎ সিংকে নিয়ে প্রচুর বইপত্র পড়েছিলাম৷

অভিনেতা হতে চান, কখন ভাবলেন?
আরিয়ুন: আমি এখন মেরিন ড্রাইভের পাশে বসে ইন্টারভিউ দিচ্ছি৷ ভীষণ ভাল লাগছে আমার। অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছে তো ছোটবেলা থেকেই ছিল, টিভির পর্দায় কী হচ্ছে সেটা জানার আগ্রহ ছিল৷ স্কুল শেষে ঠিক করলাম থিয়েটার করব৷ আমি আদৌ এই পেশায় উপযুক্ত কি না সেটা বুঝতে চেয়েছিলাম৷ শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, আমার ফিল্ম মিডিয়ামটার পেছনে কাজ করবার ভীষণ ইচ্ছে ছিল। এডিটিং, সিনেমাটোগ্রাফি বা কালার গ্রেডিং সবকিছুই আমার বেশ ভাললাগে৷
থিয়েটারের জার্নিটা কেমন?
আরিয়ুন: থিয়েটারে জয়েন করাবার পর প্রতিদিন ঝাঁট দেওয়া, ফ্যানের সুইচ অন অফ করা, সেট নিয়ে যাওয়া এসব করেছি দু'বছর৷ প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০ কাপ চা বানাতে হতো যখন রিহার্সাল হতো। এটা আমি দু'বছর করেছি৷ তারপর প্রথম চরিত্র পাওয়া থিয়েটারে, শো করা। সংগ্রামজিৎ সেনগুপ্তর '১০০ দিনের কাজ' করেছি৷ আমি খুব বেশিদিন থিয়েটার করিনি৷ কিন্তু থিয়েটারের জার্নি আমাকে ডিসিপ্লিনড হতে সাহায্য করেছে৷ সেই কারণেই হয়তো অদম্যতে আমি শুধুই অভিনেতা হিসেবে কাজ করিনি। ওখানে আমি আর্ট দেখেছি, কস্টিউম দেখেছি, একটা র্যাপ সং, দেশলাই কাঠি যে টাইটেল ট্র্যাকটা আছে সেটা আমি নিজে গেয়েছি, তার সঙ্গে এডিটিংয়েও খানিকটা সঙ্গে ছিলাম রঞ্জন দার। প্রত্যেকটার সঙ্গেই আমি যুক্ত ছিলাম।
গান শিখতেন?
আরিয়ুন: দেশলাই কাঠি র্যাপ সংটা গাওয়ানোর জন্য অভিজিৎ কুণ্ডু বহুদিন ধরে র্যাপার খুঁজছিল। আমি একদিন এমনিই গানটা রেকর্ড করে রঞ্জনদাকে পাঠাই৷ রঞ্জনদা আমাকে না জানিয়ে অভিজিৎদাকে পাঠিয়ে দেয়৷ তারপর ওয়ার্কশপ হয়৷ এবং ফাইনালি গানটা হয়৷ আমি সিঙ্গার নই৷ প্রথমবার গান গাইলাম৷ র্যাপ আমার ভীষণ ভাললাগে এবং এই 'দেশলাই কাঠি'র সুবাদে আমি আরও অনেক দেশ-বিদেশি র্যাপ শুনেছি।
অভিনেতা না হলে কী হতে চাইতেন?
আরিয়ুন: হয়তো ফিল্ম মিডিয়ামের সঙ্গেই কোনও একটা কাজে যুক্ত হতাম।
ছোটবেলাটা কিরকম ছিল?
আরিয়ুন: আমার বাংলা মিডিয়াম স্কুল। স্কুলের নাম রাজপুর বিদ্যানিধি হাই স্কুল। আমি সোনারপুরের ছেলে৷ খেলাধুলো করতে পছন্দ করি। কোচিং বাঙ্ক করে আমি খেলতে চলে গিয়েছি, সেইসময় সবুজ মাঠ বিকেল হলেই খেলা এই সময়টাই আমি জন্মেছি আমার নিজেকে খুব লাকি মনে হয়৷
অভিনেতা হিসেবে কোন ধরনের চরিত্র পেলে ভাললাগে?
আরিয়ুন: যে চরিত্রগুলো আমাকে ফিজিক্যালি এবং মেন্টালি চ্যালেঞ্জ করতে পারবে সেগুলোর প্রতি আমার বেশি আগ্রহ। আমি বলিউড এবং টলিউডের একেবারে মাসালা ফিল্ম দেখে বড় হয়েছি। তাই হিরো হতেও অসুবিধা নেই।
বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন অভিনেতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ কি বলে মনে হয়?
আরিয়ুন: আমাদের বয়সি অভিনেতাদেরকে নিয়ে কাজের সংখ্যাটা একটু কম এই মুহূর্তে।

অভিনয়ের বাইরে কী করা হয়?
আরিয়ুন: লেখালেখি করি, ফুটবল খেলি, ক্রিকেট খেলি, ছবি আঁকি, যোগব্যায়াম জিম সবই মিলিয়েমিশিয়ে চলে৷
কোন পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করা আপনার স্বপ্ন?
আরিয়ুন: এই মুহূর্তে ভীষণ ইচ্ছে করে ইমতিয়াজ আলির সঙ্গে কাজ করবার। আমি জানিনা এই জন্মে হয়ে উঠবে কিনা। মণিরত্নম স্যার ,কমল হাসান যদি কখনো ছবি করেন, অনুরাগ কাশ্যপ, অফকোর্স রঞ্জন দা। রঞ্জন দা যে ধরনের চরিত্র আমাকে দিয়ে এসেছে এখনো পর্যন্ত সেটা আমার কাছে মনে হয় যে এটা আমি ভীষণ লাকি।
ব্যর্থতাকে কীভাবে দেখেন?
আরিয়ুন: আমি মনে করি তো ব্যর্থতা জীবনের অংশ, হাজারখানা বাধা আসবে, কিন্তু ফাইনালি গিয়ে যদি নিষ্ঠার সঙ্গে লেগে থাকা যায়, সফলতা আসবে।
অদম্য করার পরে জীবন কতটা বদলেছে?
আরিয়ুন: কয়েকটা কাজের অফার এসেছে, সেগুলো নিয়ে কথাবার্তা চলছে। মেনস্ট্রিম, মশালা ছবি বলতে আমরা যা বুঝি সেরকম একটা ছবিও হয়তো সামনের বছর আসবে৷
এখন নাকি সোশ্যাল মিডিয়ার ফলোয়ার্স দেখে কাজ পাওয়া যায়৷ কিন্তু আপনার তো তেমন ফলোয়ার্স নেই৷ কী বলবেন?
আরিয়ুন: আমি খুব একটা সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাক্টিভ নই, যদিও এখন থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার মনে হয় না পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর কোনো আর্টিস্টের কেরিয়ার ডিপেন্ড করতে পারে। অদম্য হওয়ার পর সকলেই আমাকে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে বলছেন কিন্তু আমি সবসময় আমার কাজে ফোকাস করতে চাই৷
সিনেমা আর রাজনীতি, দুটোর মধ্যে একটা পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। ব্যক্তি আরিয়ুন কতটা রাজনীতি সচেতন?
আরিয়ুন: অভিনেতা আরিয়ুনের কাজটা শুধু চুপচাপ অভিনয় করে যাওয়া। ব্যক্তি আরিয়ুন রাজনৈতিকভাবে সচেতন। রাজনীতি ছাড়া আমার মনে হয় না মানুষ তৈরি হয়। আমি একটা কবিতা লিখছি অলরেডি রাজনীতি নিয়েই। প্রত্যেকটা বিষয়ে প্রত্যেকটা ঘটনায় প্রত্যেকটা প্রাণীতে প্রাণীতে রাজনীতি হয়। রাজনীতি ছাড়া পৃথিবী অচল।
রাজনীতিতে আসার ইচ্ছে আছে?
আরিয়ুন: ইটস আ ডিফিকাল্ট কোশ্চেন। এই মুহূর্তে আমি ফিল্ম মিডিয়ামটাকে এক্সপ্লোর করছি। অভিনয় করতে করতে বা ফিল্ম মিডিয়ামের সঙ্গে থাকতে থাকতে পলিটিক্সটা হ্যান্ডেল করা আমার পক্ষে খুব কঠিন।
ফিল্ম না ওটিটি কোনটা বেশি প্রেফার করেন?
আরিয়ুন: এখন তো প্রচুর কাজ ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও হচ্ছে, খুব ভাল ভাল সিরিজও তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সিনেমা আমার প্রথম প্রেম।
কেন মানুষ অদম্য দেখবেন?
আরিয়ুন: বাংলা রাজনৈতিক ছবি হল৷ শাবানা আজমি, অপর্ণা সেন, জাভেদ আখতার সকলে প্রশংসা করেছেন৷ এটা প্রাপ্তি৷ সুন্দরবনে চার মাস ছ'জন মিলে একটা সিনেমা বানানো হয়েছে৷ আমার মনে হয় যাঁরা দেখেননি দেখতেই পারেন একবার৷
শাবানা আজমি বা জাভেদ আখতার আপনার প্রশংসা করলেন, কোন প্রশংসাটা আপনার মনে থেকে যাবে?
আরিয়ুন: প্রত্যেকটাই আমার কাছে ভীষণ ইম্পর্টেন্ট। কিন্তু রঞ্জনদা যেদিন ছবিটির ফার্স্ট ড্রাফট দেখবার পর আমার পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন যে, আরিয়ুন, আজকে আমি তোমায় খাওয়াতে চাই। তো সেইটা আমার কাছে বিশাল বড় একটা পাওনা ছিল। বাবা মায়ের সাপোর্ট তো ছিলই৷ এবং এই যে মেরিন ড্রাইভে বসে ইন্টারভিউ দিলাম, আপনার সঙ্গে কথা হল এটাও আমার মনে থেকে যাবে৷
















