দীক্ষা ভুঁইয়া: উচ্চ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছতে ২৮ থেকে ৪২ শতাংশ পড়ুয়ার হার কমেছে! ভারতের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG) র সাম্প্রতিক রিপোর্টে এই চিত্রই ধরা পড়েছে। 


সদ্য প্রকাশিত এই রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রের সমগ্র শিক্ষা (Samagra Shiksha) প্রকল্প বাস্তবায়নের একাধিক গুরুতর ত্রুটি ও ঘাটতির ধরা পড়েছে । ভারতের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG) র রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত প্রকল্পের উপর করা পারফরম্যান্স অডিটে উঠে এসেছে, শিক্ষক সংকট, উচ্চ হারে স্কুলছুট, দুর্বল পরিকাঠামো, তহবিলের অপর্যাপ্ত ব্যবহারের মতো বিষয়গুলি। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধার অভাব রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

ক্যাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, উচ্চ প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছতে ২৮ থেকে ৪২ শতাংশ পড়ুয়া কমেছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া স্কুলছুটের পিছনেও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য——
১)শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ আর্থিক দুরবস্থা 
২) ১৪ শতাংশ পড়াশোনায় অনীহা 
৩) ১৩ শতাংশ কাজের খোঁজে অন্যত্র চলে যাওয়া 
৪)১২ শতাংশের অল্পবয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া।

শিক্ষক সঙ্কটের চিত্রও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৫২০টি স্কুলে একজনও শিক্ষক নেই, ফলে ৮,৫৯৬ জন পড়ুয়া সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া ৫,১৫২টি স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে, যার প্রভাব পড়ছে ১ লক্ষ ৭৬ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রীর উপর। অন্যদিকে, ১৫০ জনের কম পড়ুয়া রয়েছে এমন স্কুলে ৪০,৫৩০ জন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে, যা শিক্ষার অধিকার আইন (RTE)-এর নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্তরের ২৯ শতাংশ এবং উচ্চ প্রাথমিক স্তরের ৩০ শতাংশ স্কুলে নির্ধারিত ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত বজায় রাখা যায়নি। এর জন্য যথাক্রমে ৩১,৬৮৪ এবং ২,০৫৮ জন শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৭৯ শতাংশ স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে।

শুধু শিক্ষকই নয়, পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতির কথা উল্লেখ করেছে ক্যাগ। ১২ শতাংশ প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্কুলে শ্রেণিকক্ষের তুলনায় ছাত্রসংখ্যা বেশি। ৩৩ শতাংশ মাধ্যমিক এবং ৬৬ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েছে।

রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে ২৮৪টি শিশু শিক্ষা কেন্দ্র (SSK) এবং ১০টি মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র (MSK) বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষক অবসর নেওয়া বা মৃত্যুর পর নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালেও বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরে আরও ৫২টি SSK ও MSK বন্ধ রয়েছে এবং সেগুলি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

শিক্ষার মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্যাগ। অডিট চলাকালীন সময়ে মাধ্যমিকে ১০-১৩ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ১২-১৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী বোর্ড পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে। পাশাপাশি অডিটে নেওয়া মূল্যায়ন পরীক্ষায় ৩৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী গণিত ও বিজ্ঞান-সহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতে ৪০ শতাংশের কম নম্বর পেয়েছে।

বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। নমুনা হিসেবে বেছে নেওয়া জেলাগুলির ৩৫ থেকে ৮৪ শতাংশ স্কুলে স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি (SMC) গঠন করা হয়নি। ফলে স্কুল উন্নয়ন পরিকল্পনা (SDP) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নও ব্যাহত হয়েছে।

তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তুলেছে ক্যাগ। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে সমগ্র শিক্ষা প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের মাত্র ৪৬ থেকে ৬৫ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছে। নির্মাণকাজে বিলম্বের কারণে ৩৯৫ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে ২,৪২৮ কোটি টাকা কম পাওয়ায় প্রকল্পের পরিধিও সীমিত হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের (CwSN) ক্ষেত্রেও একাধিক অসংগতি ধরা পড়েছে। ৩০ থেকে ৫৬ শতাংশ শিশু পরিবহণ ভাতা, ৩৫ থেকে ৪৯ শতাংশ এসকর্ট ভাতা এবং যোগ্য ২২ শতাংশ ছাত্রী নির্ধারিত স্টাইপেন্ড পায়নি। এছাড়া ১৫ শতাংশ স্কুলে র‌্যাম্প নেই, ৭২ শতাংশ স্কুলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের উপযোগী শৌচাগার নেই, এবং বিশেষ শিক্ষকের ৯৫ শতাংশ পদ (৩৩,৮৩৫টি) শূন্য রয়েছে। এমনকি কিছু স্কুলে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নির্ধারিত রিসোর্স রুম স্টোররুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও ক্যাগ উল্লেখ করেছে।

ক্যাগের এই রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গে সমগ্র শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক কাঠামোগত ও প্রশাসনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দিয়েছে। রিপোর্টে শিক্ষক নিয়োগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন, তহবিলের কার্যকর ব্যবহার এবং স্কুলছুট রোধে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।