চন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
কেতুগ্রাম, ১৫ নভেম্বর

রাই জাগো রাই জাগো, শুক–‌সারী বলে...‌। কার্তিক মাস জুড়ে গ্রামে গ্রামে ভোরাই গান গেয়ে বেড়ান কীর্তন শিল্পীরা। তবে সেই রেওয়াজ এখন আর তেমন নেই বললেই চলে। ভোরাই গানের এই লুপ্তপ্রায় ধারাটিকে টানা ৫০ বছরেরও বেশি টিকিয়ে রেখেছেন ক্ষুদিরাম হাজরা। কেতুগ্রামের রসুই গ্রামের ক্ষুদিরাম এই বাষট্টি বছর বয়সেও হারমোনিয়াম ঘাড়ে গোটা কার্তিক মাস জুড়ে ভোরবেলায় গান গেয়ে বেড়ান। এই অবদানকে স্বীকৃতি দিল গ্রামের আমজনতা। সংবর্ধিত করলেন ক্ষুদিরামকে। 
উদ্যোক্তাদের তরফে সমাজকর্মী তপন রায় বলেন, ‘গোটা কার্তিক মাস জুড়ে গান গেয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষকে জাগানোর এই প্রভাতী গানকে ‘টহল’ দেওয়া বলে। এই এলাকায় আজ থেকে ১০০ বছর আগে বিশিষ্ট বৈষ্ণবভক্ত মধুসূদন হাজরা টহল গানের সূচনা করেন। সেই ধারার উত্তরাধিকার বইছেন ক্ষুদিরামদা। তাই ওঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছে। আসলে আমরা এই ধারাটিকেই সম্মান জানালাম।’ রাঢ়বঙ্গের এই লোকগীতির উৎস সম্পর্কে প্রাচীন ইতিহাস গবেষক রণদেব মুখার্জির আলোকপাত, ‘বাংলা মাসের হিসেবে কার্তিক মাসে সূর্যের দক্ষিণায়নের শুরু। এটা সূর্যদেবের ঘুমের সময়। তাঁকে জাগাতেই প্রভাতী কীর্তন গানের রীতি চালু হয়।’ মনে করা হয় এই গায়নরীতির সূচনা হয়েছিল বল্লাল সেনের সময়ে। অন্য মতে, মধ্য যুগে রাঢ়বঙ্গ জুড়ে ডাকাতি বেড়ে গিয়েছিল। দরকার হয়ে পড়ে গণ প্রতিরোধের। গ্রামে গ্রামে কীর্তনের দল তৈরি হয়। বাসিন্দারা কীর্তনীয়াদের নিয়ে রাত জেগে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে টহল দিতেন। জমিদার ও সম্পন্ন গৃহস্থরা তাঁদের জন্য মাসোহারার বন্দোবস্ত করতেন। বর্ধমানের সড়কি গ্রামের জমিদার অর্জুন রায়চৌধুরি, বীরভূমের রায়পুরের জমিদার সুভাষিণী দাসীরা ছিলেন এই টহল গানের পৃষ্ঠপোষক। তবে এখন আর সব গ্রামে ভোরাই গানের চল নেই। কেতুগ্রামের রসুই, কাটোয়ার নারায়ণপুরের মতো হাতে গোনা কয়েকটি গ্রামে টিকে রয়েছে লোকগানের এই মিঠে ধারাটি।

জনপ্রিয়

Back To Top