অগ্নি পাণ্ডে: খোলামেলা কথাই বলতে ভালবাসেন। সুন্দর ইংরেজি বলেন। মাথায় নেই ঝাঁকড়া সোনালি চুল। এখন ছোট ছোট করে কাটা। চুলের রং সাদা। মুখের হাসি কিন্তু সেই একইরকম রয়েছে। ক্লাব এবং দেশ মিলিয়ে নিজের ফুটবল জীবনে ৩০০–‌র বেশি গোল করা হার্নান ক্রেসপোর সঙ্গে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ছিল ঠিক দুপুর ১২টা। শুক্রবার মধ্য কলকাতার এক পাঁচতারা হোটেলে। এলেন ঠিক সাড়ে ১২টায়। আধঘণ্টা দেরি হওয়ার জন্য নিজেই ‘ক্ষমা’ চেয়ে নিলেন। শুক্রবার সকালে কলকাতায় এসেছেন। রবিবার টাটা স্টিল ২৫ কিলোমিটার দৌড়ের আন্তর্জাতিক দূত হিসেবে।
গোল টেবিলে ‘আজকাল’–এর সঙ্গে সাক্ষাৎকার বদলে গেল আড্ডায়। প্রাণখোলা হাসিতে প্রায় আধঘণ্টা জমিয়ে রাখলেন নিজেই। কোনওরকম রাখঢাক না করে প্রশ্নের উত্তরে বলেই দিলেন নিজে যা বিশ্বাস করেন সেই কথা। ‘মেসির শ্রেষ্ঠত্বের জন্য বিশ্বকাপ জেতার প্রয়োজন হয় না। আমার মতে ফুটবল বিশ্বে পাঁচ জন রাজা রয়েছেন। নামগুলো বলি? পেলে, ডি স্টিফানো, ক্রুয়েফ, দিয়েগো (মারাদোনা) এবং মেসি। এর বাইরে আর কেউ নেই। হবেও না। বাকিটা বুঝে নিন।’ কোথায় বসালেন মেসিকে! আর্জেন্টিনার হয়ে তিন–তিনটি বিশ্বকাপ খেলা স্ট্রাইকার হার্নান ক্রেসপোর দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে সপাট জবাব, ‘কেন বসাব না? মেসির মতো আর একজন ফুটবলার দেখিয়ে দিল। হ্যাঁ, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কথা বলতে হয়। আমি মেসিকেই এগিয়ে রাখব। কোপা, বিশ্বকাপ না পেলেও। সত্যি কথা কী জানেন, মেসি আর রোনাল্ডোর মতো ফুটবলার ভবিষ্যতে পেতে হলে ফুটবল–বিশ্বকে আরও বহু বছর অপেক্ষা করতে হবে। ঝট করে পাওয়া যাবে না।’
দেশের তিনটি বিশ্বকাপ খেলা ক্রেসপো এখনও ‘স্বপ্ন’ দেখেন ২০২২ বিশ্বকাপ লিওনেল মেসির হাতেই উঠবে। ক্রেসপোর মতে, ‘বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা খুব কঠিন কাজ। তবে মেসি নিজেই স্বপ্ন েদখে বিশ্বকাপ জেতার। যে স্বপ্ন আমরা সব আর্জেন্টাইন দেখে থাকি। বিশ্বকাপের আগেও আমাদের লক্ষ্য কোপা আমেরিকা। এবার কোপা আমেরিকা হবে আর্জেন্টিনা এবং কলম্বিয়া মিলিয়ে। কোপা যেভাবেই হোক জিততেই হবে।’
দীর্ঘ সময়ে ক্রেসপো খেলেছেন ইতালির সিরি–আ লিগে। কঠিন লিগ ছিল একটা সময়ে বিশ্বে। সেই সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্রেসপো বলেন, ‘ছোটবেলায় আর্জেন্টিনায় স্বপ্ন দেখতাম ইতালির লিগে খেলব। স্বপ্ন দেখতাম আমার মতে বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারোসির বিরুদ্ধে খেলব। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আমি ইতালি লিগে জয়েন করার পর বারোসির বিরুদ্ধে খেলেছিলাম একটা ম্যাচ। আমার জীবনের অন্যতম সেরা ম্যাচ বলতে পারেন। এখন লিগের চরিত্র বদলে গেছে। বলতে পারি এখন পৃথিবীর কঠিনতম লিগ হল ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ। সবচেয়ে বেশি টাকা তাই বিশ্বের বেশিরভাগ দামি ফুটবলার খেলে সেখানে। আমার মতে তার পরের কঠিন লিগ হল এখন লা লিগা তারপরে হল ইতালির সিরি–আ লিগ।’
অন্য প্রসঙ্গে আড্ডা মোড় নিল। নিন্দুকেরা বলে থাকেন আপনার সঙ্গে আপনার সতীর্থ বাতিস্তুতার নাকি সদ্ভাব নেই সেই ফুটবল জীবন থেকেই? হো হো করে হেসে উঠলেন ক্রেসপো। ‘এখানেও সেরকমই বলে নাকি লোকজন? আমি মনে করি আমাদের দেশে মারিও কেম্পেসের পর সেরা স্ট্রাইকার হল বাতিগোল। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। হ্যাঁ, বাতিগোলের সঙ্গে আমার ফ্রেন্ডলি কম্পিটেটিভ সম্পর্ক রয়েছে। এই তো দিনকয়েক আগে ওর গোড়ালিতে অপারেশন হল। দেখতে গিয়েছিলাম হাসপাতালে।’ আর মারাদোনা? ক্রেসপোর উত্তর, ‘দিয়েগো এদের সবার থেেক আলাদা। অন্য গ্রহের ফুটবলার।’
এই যে ব্যালন ডি‘ওর আর মেসি সমার্থক হয়ে যাচ্ছে কী মনে হয় ক্রেসপোর? চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। চোখ দুটো বড় বড় করে বলে উঠলেন, ‘একদম আমার মনের কথা বলব? শুনুন ব্যালন ডি‘ওর আমাকে সেভাবে আকর্ষিত করে না। ফুটবল হল টিম গেম। ব্যালন ডি’ওর হল ব্যক্তিগত পুরস্কার। আমি যখন খেলতাম তখন লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের এই পুরস্কার দেওয়া হত না। আমার কাছে দলগত পুরস্কারই শেষ কথা। মানছি ব্যালন ডি’ওর বড় ব্যাপার। কিন্তু ওই যে আমাকে সেভাবে আকর্ষণ করে না।’
ফুটবলেও অন্য খেলার মতোই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। যেমন ভার। কী মনে করেন? ক্রেসপো বলে উঠলেন, ‘এটা ফুটবলের জন্য ভাল। যদিও তার পরেও ভুলভ্রান্তি হচ্ছে। তবে ভার সমর্থন করি।’ আড্ডা শেষ। তার মধ্যেই কলকাতার প্রসঙ্গ, ভারতীয় ফুটবলের প্রসঙ্গ উঠে এল। জানেন কলকাতার ফুটবল ঐতিহ্য। ভারতের দুটো লিগ আইএসএল এবং আই লিগের কথা জানেন ক্রেসপো। এর আগে মুম্বই এবং গোয়ায় ফুটসল খেলে গেছেন। কলকাতায় অবশ্য এবারই প্রথম।

হার্নান ক্রেসপোকে স্বাগত জানাচ্ছেন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। ছবি: রনি রায়

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});
জনপ্রিয়

Back To Top