ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল

সেই হালদার বাড়ির কথা মনে পড়ে? ‌
একান্নবর্তী পরিবার। বাড়িভর্তি লোকজন অথচ সংসারে কেউ কুটোটি সরায় না। এই নিয়ে ভাইয়ে–ভাইয়ে বউয়ে–বউয়ে নিত্য অশান্তি লেগেই থাকত। শুধুই দোষারোপ আর পাল্টা দোষারোপ। একে অন্যের ওপর হম্বিতম্বি। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারত না। এই যখন অবস্থা তখন হঠাৎ‌ একদিন এক কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে সেই বাড়িতে এক কর্মঠ গৃহভৃত্যের আবির্ভাব হল। অদ্ভুত তার চাল চলন, দূরদর্শিতা আর আন্তরিকতা। সে–‌ই শেষে সংসারের মধ্যমণি হয়ে উঠল। হেঁশেলের যাবতীয় কাজের ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে সকলকে স্বস্তি দিয়ে ক্রমে বাড়ির সবার মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে এনে, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটিয়ে আবারও এক কুয়াশা ঢাকা ভোরে সে বিদায় নিল।
আজ থেকে ৫০ বছর আগে ঠিক এরকমই একটি কাহিনিচিত্র উপহার দিয়ে তপন সিংহ আমাদের রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তাক লাগানোর মতোই ছবি। যে ছবিতে দেদার মজা আছে, কৌতুক আছে আর তার মধ্যেই আছে পরিচালকমশাইয়ের প্রয়োজনীয় পরামর্শ। মধ্যবিত্ত বাঙালিকে কর্তব্যমুখী হওয়ার পরামর্শ। মিলেমিশে একসঙ্গে থাকা, একটু অ্যাডজাস্টেবল হওয়ার অনুরোধ। সেই কারণেই ‘‌গল্প হলেও সত্যি’‌ নিছক বিনোদন নয়। বিনোদনের মোড়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি হয়ে উঠেছে। আর তাতেই বাজিমাত। হল হাউসফুল। কিন্তু একই সঙ্গে কারও কারও মনে এ প্রশ্নও জেগেছে, এত বিষয় থাকতে তিনি হঠাৎ ঘরোয়া সমস্যাকে প্রাধান্য দিলেন কেন?‌ বিশেষ করে ১৯৬৬ সালের ১৩ অক্টোবর রূপবাণীতে যখন সিনেমাটি মুক্তি পেল, তখন তো বাংলা অগ্নিগর্ভ। রেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে খাদ্য আন্দোলন। চারিদিকে ভুখা মানুষের মিছিল। পথে নেমেছে ছাত্ররাও। পুলিশের গুলিতে প্রাণ যাচ্ছে ছাত্রদের। তখন প্রফুল্ল সেনের জমানা। আরামবাগের কবি সাধন বারিক লিখলেন, ‘‌পান্তাভাতে নুনের ছিটে/‌ বড়ই মিঠে/‌ ওগো সই/‌ তাই বা কই’‌, আর এরকম সময় তিনি কিনা এই জ্বলন্ত সমস্যা ছেড়ে মধ্যবিত্ত বাঙালির অন্দরমহলে ঢুকে পড়লেন?‌
আসলে তপনবাবু অনেকদিন ধরেই একটি হাসির ছবি বানানোর কথা ভাবছিলেন। সেই কবে ১৯৫৬–তে ‘‌টনসিল’‌ করেছেন। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের হাসির নাটক। ‘‌বরযাত্রী’‌–‌র গণশা, ঘোতনাদের নিয়ে একেবারে জমে গিয়েছিল। তারপর কেটে গেছে দশটি বছর। হয়তো সেই বাসনা থেকেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত। কী করি কী করি করে মাত্র সপ্তাদুয়েকে একটা গল্প লিখে ফেললেন। সমস্যা জর্জরিত এক একান্নবর্তী পরিবারের কাহিনি। এটাই ছিল তাঁর লেখা প্রথম গল্প। এবং গল্পটা লিখতে গিয়ে তিনি ‘‌ব্রিফ এনকাউন্টার’‌–‌এ প্রভাবিত হয়েছিলেন। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এক বিদেশি রোমান্টিক ছবি। একজন মধ্যবিত্ত নারীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা নিয়ে পরিচালক ডেভিড লিনের করা। যাক সে কথা। এরপর গল্পটিকে সিনেমায় রূপান্তরিত করলেন তপনবাবু একেবারে নিজস্ব কায়দায়। ব্যস নিজেদের জীবনের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় ‘‌গল্প হলেও সত্যি’‌র প্রতি দর্শকদের কৌতূহল বেড়ে গেল। পরিচালক মশাই সবচেয়ে কামাল করলেন সংসারের সমস্যা সমাধানে এক কাল্পনিক আগন্তুক ভৃত্যের চরিত্রে রবি ঘোষকে নিয়ে এসে আর অন্যদিকে ছায়া দেবীকে রাখলেন সংসারের মূল গৃহিণী করে। এই দুই শিল্পীর প্রাণবন্ত অভিনয়ে ছবি জমে গেল। কাহিনিটি ছিল এই রকম—
সংসারে তিন ভাই তিন রকম। তারা সব বাড়িতে খোকা নামে পরিচিত। বড় খোকা (‌প্রসাদ মুখোপাধ্যায়)‌ পেশায় অফিসের বড়বাবু। রিটায়ার করার সময় হয়েছে কিন্তু তিনি তা ভাবতে পারেন না। নিজেকে ইয়ংম্যান মনে করেন। এই বয়েসেও ট্রামে বাসে ঝুলতে ঝুলতে অফিস যান। আর রোজ অফিসফেরতা বাজার করে বাড়ি ফেরেন। একেবারে টিপিক্যাল বাঙালি চরিত্র। বাড়ির মেজ ছেলে, মেজ বউ তাদের একমাত্র মেয়ে কৃষ্ণাকে (‌কৃষ্ণা বসু)‌ রেখে অনেকদিন মারা গেছেন। সেজ বউয়ের (‌ভারতী দেবী)‌ যত রাগ তাদের ওপর। তারা নাকি কৃষ্ণাকে পরিবারের বাকি লোকেদের ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্তে স্বর্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
সেজ খোকা (‌বঙ্কিম ঘোষ)‌ স্কুলমাস্টার। তাই উঠতে বসতে বাড়ির লোকেদের ওপর মাস্টারি করেন। ছোট খোকা (‌ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ শিল্পী মানুষ। বিয়ে–থা করেননি। সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে চেলো বাজান। এই নিয়েই তিনি ব্যস্ত। বড় খোকার একটি মাত্র ছেলে। সে বড় আধুনিক। চোঙা প্যান্ট, ছুঁচলো জুতোয় হিরো সেজে শুধু বড় বড় লেকচার। এ দেশের কিছু হল না আর হবেও না। তার আদর্শ ইওরোপ–আমেরিকা। অথচ সেই লক্ষ্যে না দৌড়ে অল্প বয়েসে বিয়েটা সেরে ফেলেছে। অন্যদিকে বাড়ির বড় ও সেজ বউ সারাটা দিন ঘর–‌সংসারের কাজে ব্যস্ত। আর কারণে–অকারণে বাপ–‌মা মরা কৃষ্ণাকে দাঁতে চেবান। তাকে খাটিয়ে মারেন। এছাড়া নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি তো লেগেই আছে। অবশ্য আর একজন আছেন। তিনি পরিবারের সিনিয়র মেম্বার। খোকাদের বাবা ৮০ বছরের বৃদ্ধ যোগেশ চট্টোপাধ্যায়। বাড়ির বাইরের ঘরে চুপচাপ বসে থাকেন। সকলের ‘‌গালমন্দ, নালিশ, হুমকি’‌ হজম করেন। তিনিও একরকম অবহেলার শিকার। তাঁর সম্বল প্রভিডেন্ট ফান্ডের তিরিশ হাজার টাকা ও মৃত স্ত্রী‌র গয়না, তাও প্রায় দশ–‌বারো হাজার টাকা হবে। এরই জোরে তিনিও মাঝে মধ্যে হুঙ্কার দেন। গোটা পরিবার সেটা জানে। তাই তাঁকে বেশি ঘাঁটায় না কেউ। যদি বুড়োর সম্পত্তির ভাগ না পায়। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই কোথা থেকে চাকর ধনঞ্জয়ের (‌রবি ঘোষ)‌ উদয় এবং সকলকে অব্যাহতি দিয়ে কাজে লেগে পড়া। বাজার করা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘরদোর পরিষ্কার, চা–‌জলখাবার রান্নাবান্না এমনকী গান গাওয়া, ধর্মোপদেশ দেওয়া ও ঘরের অবিবাহিতা তরুণীর প্রেমের পথকে সহজ করে তোলা পর্যন্ত। আর যখন যার যেটি প্রয়োজন সেটি মুখের কাছে জুগিয়ে দেওয়া। ব্যাপার স্যাপার দেখে সবাই তো স্তম্ভিত। এমন মানুষও দুনিয়ায় আছে।
‌এই ভাবেই কয়েক দিনের মধ্যে ধনঞ্জয় সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে গেল। এবার শুরু হল তার দোসরা খেলা। বড় খোকার সামনে বড় খোকার প্রশংসা। সেজ খোকার সামনে সেজ খোকার, ছোট খোকার সামনে ছোট খোকার প্রশংসা। প্রশংসায় খোদ খোদারও মন গলে আর এ তো সাধারণ মানুষ। কাজেই নানা উপায়ে ধনঞ্জয় সকলকে বুঝিয়ে দিল প্রত্যেকে প্রত্যেকের ভাই। আপনজন। তাই সকলেরই একটা কর্তব্য আছে। তা পালন করতে গেলে কারও যদি স্বার্থত্যাগ করার প্রয়োজন হয়, তা হলে প্রত্যেকেই তা করবে। এরপর ধনঞ্জয়ের এই স্বার্থত্যাগের ঢেউ পরিবারে এমন ভাবে আছড়ে পড়ল যে বৃদ্ধ দাদু যিনি গয়নার বাক্স আগলে বসেছিলেন তিনিও সে সব বড় খোকার হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বললেন, ‘‌অর্থম অনর্থম ভাবয় নিত্যম’‌।
কাহিনি এখানেই শেষ নয়। বাপ–‌মা মরা যে কৃষ্ণা পাশের বাড়ির কলেজপড়ুয়া অলোকের সঙ্গে ভাব–ভালবাসা করেছিল বলে একদিন মারধর খেয়েছিল আজ বাড়ির সবাই একবাক্যে তাদের বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেল। এবং সকলেই বৃদ্ধের গয়নার মোহ ত্যাগ করে সেই অলংকার কৃষ্ণার হাতে তুলে দিল। এর পরের দৃশ্য খুবই করুণ। একদিন সকালে উঠে দেখা গেল ধনঞ্জয় নেই!‌ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও বাড়ির ত্রিসীমানায় তাকে পাওয়া গেল না। তার খোঁজে কৃষ্ণা ছুটে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। দূর থেকে সে দেখল ধনঞ্জয় তার নিজের মনে এগিয়ে চলেছে। কৃষ্ণা ছুটে গিয়ে তার পথ আটকাল। বলল, ‘‌তুমি যে বড় চলে যাচ্ছ?‌’‌ ধনঞ্জয় উত্তর দিল, ‘‌আমার কাজ যে ফুরিয়েছে কৃষ্ণাদি‌।’‌ কৃষ্ণা জিজ্ঞেস করল, ‘‌তুমি কি আর কখনও আসবে না?‌’‌ ধনঞ্জয় বলল, ‘‌আমার আসার আর দরকার হবে না।’‌ এই বলে সে হাঁটতে হাঁটতে কুয়াশায় হারিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ আগে যে প্রেক্ষাগৃহ ধনঞ্জয় ওরফে রবি ঘোষের মজাদার অভিনয় দেখতে দেখতে হাসিতে ফেটে পড়ছিল এবার সেই স্থান নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। ছবির শেষ দৃশ্যটা তখন দর্শককে ভাবাচ্ছে। 
এই হলেন তপন সিংহ। চলচ্চিত্রকে কীভাবে সমাজের কাজে লাগাবেন তার নিরন্তর প্রয়াস চলতে থাকে তাঁর মনে। এখানে চাকর ধনঞ্জয় আসলে একটা ভাবমূর্তি। কোথা থেকে চরিত্রটা এল আর সকলের বিবেককে জাগিয়ে ফ্যানটাসির মতো মিলিয়ে গেল। তপন সিংহের এ এক অসাধারণ সৃষ্টি। বলতে গেলে তপনবাবু জীবনের চলার পথে ছোটখাটো এই ভুলত্রুটিকেও গুরুত্ব সহকারে দেখতেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারেও বলেছিলেন, ‘‌‌ভারতবর্ষের মানুষ বারবার অসংখ্য সমস্যা কণ্টকে বিপর্যস্ত হয়ে আসছে। আমার বর্তমান চিত্র ‘‌গল্প হলেও সত্যি’‌ রূপায়ণের আগে আমি ভেবেছিলাম আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার কথা, যা হেসে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। আমার এই সামান্য সাধনার পথে আমি বিশ্বাস করি কে কী মতামত দিলেন বা কে কী বললেন এটাই শেষ  কথা হয়ে উঠতে পারে না। আপনাদের কথায় যদি সমুদ্রের বিশালতা থাকে তবে আপনাকে ক্ষুদ্রতা সম্পর্কে সচেতন, বিনয়ী, শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠতে হবে।’‌ যা এই সিনেমাটির ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই আর তার সঠিক রূপায়ণে তিনি যাঁদের ওপর বেশি ভরসা করেছেন সেই রবি ঘোষ ও ছায়া দেবীর অভিনয় সত্যিই ভোলার নয়। রবি ঘোষ যেমন ভৃত্যের ভূমিকায় মাতিয়ে দিয়েছেন, তেমনই বড় বউয়ের চরিত্রে ছায়া দেবী। বিষয় খুবই কঠিন। কমেডির সঙ্গে ট্র‌্যাজেডির মেলবন্ধনে এক টিপিক্যাল বাঙালি চরিত্র কী দারুণ রসাত্মক ভঙ্গিতে ছায়া দেবী ধরে রাখলেন কাহিনির মূল সুরটাকে। তপনবাবু বলতেন, ‌ন্যাচারাল অ্যাকটিঙে ছায়াদির সেন্স অফ টাইমিং ছিল একেবারে নিখুঁত। আর রবির চোখ। তাঁর কমেডিয়ান অ্যাপ্রোচ। ‘‌গল্প হলেও সত্যি’‌–‌র মতো ছবিতে তাঁকে ছাড়া ভাবা যায় না। রবির সঙ্গে পরিচয় শোভা সেনের মাধ্যমে। প্রথম দেখি পঞ্চাশের দশকে উল্টোরথ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানের শেষে মঞ্চস্থ হয়েছিল একটি নাটক। তাতে তাঁর অভিনয় দেখে বেশ লেগেছিল। তাই ‘‌হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’‌য় ওঁকে ডেকে নিলাম।‌ এরপর তো আর থামা নেই। একের পর এক ছবিতে রবিকে কাজে লাগানো। এবং কাজ করতে করতেই দেখা চোখের ভাষায় অনেক কিছু বুঝিয়ে দিতে পারত সে। তবে বাকিদের অভিনয়কেও খাটো করা যাবে না। বড় জা ছায়া দেবীর পাশাপাশি সেজ জা ভারতী দেবীও অনবদ্য। তিন ছেলের ভূমিকায় প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিম ঘোষ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদের বাবা অশীতিপর যোগেশ চট্টোপাধ্যায় অবিবাহিতা নাতনি কৃষ্ণা ওরফে কৃষ্ণা বসু, পার্থ মুখোপাধ্যায়— সকলেই পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। সঙ্গে বিমল মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরা ও মিউজিকে কৌতুকের মেজাজ। সব মিলিয়েই ছবিটি উপভোগ্য হয়েছে। আসলে তপন সিংহ নিজে একজন অভিনেতা ছিলেন বলে তাঁর কাজের টেকনিকটাই ছিল আলাদা। প্রথমে স্ক্রিপ্ট পড়িয়ে গল্প ভাল করে বুঝিয়ে দিতেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেন। এ কথা তাঁর ছবিতে যাঁরাই কাজ করেছেন তাঁরাই বলেছেন। অত্যন্ত সহজ সরল মানুষ। কারও কিছু গুণ দেখলেই স্বীকার করতেন।
ভারতী দেবী তো তারকা শিল্পী। ১৯৪০ থেকে ২০০৫ সাল ৬৫ বছরের অভিনয় জীবনে প্রায় ৭৭টি ছবি করেছেন। তাঁর প্রতি তো তপন সিংহের শ্রদ্ধা থাকবেই। সেটা তাঁর কথায় বোঝা যেত। তিনি বলতেন, অন্যদের এক ধরনের চরিত্রের জন্য নেওয়া যায় কিন্তু ভারতী দেবীকে যে কোনও চরিত্রের জন্য নেওয়া যায়। যেমন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ‘‌সাড়ে চুয়াত্তর’‌–‌এ যার পরিচিতি। আর তখনকার দিনে শিল্পীদের সবার মধ্যে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে ছিল। ফলে কাজটা হত ঠিকঠাক আবার মজাও হত। একবার ‘‌গল্প হলেও সত্যি’‌–‌র ইনডোর শুটিং চলছে নিউ থিয়েটার্সের দু নম্বর স্টুডিও–‌য় রবি ঘোষ ও ছায়া দেবীকে নিয়ে। হঠাৎ ফাইনাল শট নেওয়ার সময় রবি ঘোষের কৌতুক–অভিনয় দেখে ছায়া দেবী কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারলেন না। হেসে ফেললেন। তখন সকলেই হাসছেন।‌ পরিচালকও। এই ভাবেই একটা শুটিং স্পট যেন একটা পিকনিক স্পটে পরিণত হত। অভিনেতা–অভিনেত্রী– কলাকুশলী সবাই যেন এক পরিবারভুক্ত। তপন সিংহদের মতো পরিচালকরা তো এমন পরিবেশই চাইতেন।  
তপন সিংহ মিউজিকটাও ভাল বুঝতেন। এক বৈঠকি আড্ডায় তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, যদি আবহসঙ্গীত শুধু ভারতীয় সঙ্গীতের ওপর করা হয় তবে আলি আকবর খাঁ ও রবিশঙ্করের কোনও জুড়ি নেই। তবে আবহসঙ্গীত করতে গেলে যে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত সম্পর্কে বিশাল জ্ঞান থাকতে হবে তারও কোনও মানে নেই। মোটামুটি থাকলেই চলবে। দেখতে হবে চরিত্রটা মিউজিক হবে নাকি ব্যাকড্রপের ওপর মিউজিক করব, না থিম বা বিষয়বস্তুর ওপর করব। তার ওপর সব কিছু নির্ভর করছে। ‘‌গল্প হলেও সত্যি’‌–র ক্ষেত্রে তাঁর এই মিউজিক–মস্তিষ্ককে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। বলতে গেলে তাঁর এই গুণগুলিই তাঁকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। প্রায়শই বলতেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন ফিল্ম তৈরি করতে চাই যাতে আমার দেশের মানুষের মন মেজাজ ও রুচির স্বাদ মিশে আছে। আমাদের এই বিচিত্র বিশাল উপমহাদেশের চিন্তাধারা ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্য যে কোনও দেশের থেকে ভিন্ন। ভারতবর্ষ ভিন্ন কিন্তু অনন্য এটা বুঝতে হবে।’ এই ধ্যানধারণা নিয়েই তিনি কাজ করে গেছেন আজীবন। আর ছিল আত্মবিশ্বাস। যার জোরে অনেক সময় স্রোতের বিপক্ষে গিয়েও তিনি কূলে ভিড়েছেন একেবারে নির্বিঘ্নে। নজরও কেড়েছেন দর্শকদের। এই তো গোটা বাংলা যখন উত্তম–সুচিত্রায় মজে আছে, তখন সেই জুটিকে পাশ কাটিয়ে মাত্র আঠাশ দিনে তিনি ‘‌গল্প হলেও সত্যি’‌–‌র কাজ শেষ করলেন এবং মনে মনে তিনি নিশ্চিত ছিলেন রবির অভিনয় দর্শক নেবেই। হলও তাই। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দারুণ বাজার পেল। মধ্যবিত্ত মানুষের মনের গভীরে পৌঁছে গেল পরিচালকের সেই শ্বাশ্বত বাণী ‘‌চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’‌। সাদা–কালো এই ছবিটি দীর্ঘদিন চলেছিল। ১৯৬৬ সালে আঞ্চলিক ভাষার শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে রাষ্ট্রপতির সম্মান লাভ করেছিল আবার ‘‌বাবুর্চি’‌ নামে হিন্দিতে রিমেকও হয়েছিল ছবিটি। করেছিলেন হৃষীকেশ মুখার্জি। ধনঞ্জয়ের ভূমিকায় সেখানে অভিনয় করেন রাজেশ খান্না। ■

জনপ্রিয়

Back To Top