শান্তিনিকেতনের প্রথম পৌষমেলার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১৬ শক (‌১৮৯৪     খ্রিস্টাব্দ)‌ ‘‌তত্ত্ববোধিনী’‌ পত্রিকার মাঘ সংখ্যায়। ‘‌দিবা দ্বিতীয় প্রহর। চতুর্দিকে দোকান পসার বসিয়াছে এবং স্থানীয় লোকে উৎসব ক্ষেত্র পরিপূর্ণ হইয়াছে। ঐ সময় সাধারণের হৃদয়ের সুশিক্ষার উদ্দেশে রাজা হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান গীত হইয়াছিল।
অনন্তর রক্ত সন্ধ্যায় আকাশ সুরঞ্জিত এবং রক্তাভ সূর্য প্রান্তরের পশ্চিম প্রান্তে অস্তমিত হইল, বিচিত্র বর্ণের কাচ নির্ম্মিত বিশাল ব্রহ্মমন্দির আলোকমালায় উদ্ভাসিত হইয়া অপূর্ব শ্রীধারণ করিল। সকলে পুনরায় ব্রহ্মোপাসনার জন্য মন্দিরে প্রবেশ করিলেন।.‌.‌.‌
শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা নিয়ে লিখলেন বিশ্বভারতীর প্রাক্তন অধ্যাপক, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ গৌতম ভট্টাচার্য

৭ পৌষ শান্তিনিকেতন আশ্রমের আদিপুরুষ মহর্ষির দীক্ষার দিন। ১২৫০ বঙ্গাব্দের ৭ পৌষ, বৃহস্পতিবার মহর্ষি রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। তঁার আত্মজীবনীতে মহর্ষি লিখেছেন, ‘‌১৭৬৫ শকের ৭ পৌষে আমরা ব্রাহ্মধর্ম–‌ব্রত গ্রহণ করিবার দিন স্থির করিলাম। একটি বেদী স্থাপিত হইল;‌ সেই বেদীতে বিদ্যাবাগীশ আসন গ্রহণ করিলেন। আমাদের মনে এক নূতন উৎসাহ জন্মিল, অদ্য আমাদের প্রতি–হৃদয়ে ব্রাহ্মবীজ রোপিত হইবে।’‌ এইভাবে সেদিন দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন শ্রীধর ভট্টাচার্য, শ্যামাচরণ ভট্টাচার্য, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো একুশ জন। তত্ত্ববোধিনী সভা যখন স্থাপিত হয়েছিল তখন ছিল এক স্মরণীয় দিন আর ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণের সেই ৭ পৌষ ছিল এক পুণ্যব্রতের দিন। ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে দু’‌বছরের মধ্যে প্রায় পঁাচশো জন দীক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। মহর্ষির তখন মনে হয়েছিল— ‘‌যখন ব্রাহ্মদের মধ্যে পরস্পর এমন সৌহৃর্দ্য দেখিলাম, তখন আমার মনে বড়ই আহ্লাদ হইল। আমি মনে করিলাম যে, নগরের বাহিরে প্রশস্ত ক্ষেত্রে ইঁহাদের প্রতি পৌষ মাসে একটা মেলা হইলে ভালো হয়।’‌ এই উদ্দেশ্যে মহর্ষি ১৭৬৭ শকের (‌১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ)‌ ৭ পৌষ পলতার গোরিটির বাগানে সকলকে নিমন্ত্রণ করেন। আট ন’‌টা নৌকো করে কলকাতা থেকে ব্রাহ্মদের ওই বাগানে নিয়ে আসা হয়। ‘‌প্রাতঃকালে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ব্রহ্মের জয়ধ্বনি আরম্ভ করিলাম, ফলফুলে শোভিত বৃক্ষছায়াতে বসিয়া মুক্ত হৃদয়ে ঈশ্বরের উপাসনা করিয়া পরিতৃপ্ত ও পবিত্র হইলাম’‌— এই হল আদিতম ৭ পৌষের মেলার কথা।
১৮৬২ সালের ৩০ মার্চ মহর্ষি বীরভূমের রায়পুরে সিংহ পরিবারে যাওয়ার পথে নির্জন স্থানে ছাতিমতলায় বসে ‘‌প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি’‌ লাভ করেন। ১৮৬৩ সালের ১ মার্চ শান্তিনিকেতনে জমি বন্দোবস্ত নেওয়ার কাজের সূচনার সঙ্গে সঙ্গেই এই আশ্রমেরও সূচনা। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ মার্চ মহর্ষি এক ন্যাসপত্র (‌ট্রাস্ট ডিড)‌ রচনা করেন। সেখানে নির্দেশ দেওয়া হল, ‘‌ধর্মভাব উদ্দীপনের জন্য ট্রাস্টীগণ বর্ষে বর্ষে একটি মেলা বসাইবার চেষ্টা ও উদ্যোগ করিবেন। এই মেলাতে সকল ধর্ম–‌সম্প্রদায়ের সাধুপুরুষেরা আসিয়া ধর্মাচার ও ধর্মালাপ করিতে পারিবেন। এই মেলার উৎসবে কোনো প্রকার পৌত্তলিক আরাধনা হইবে না ও কুৎসিত আমোদ উল্লাস হইতে পারিবে না;‌ মদ্যমাংস ব্যতীত এই মেলায় সর্বপ্রকার দ্রব্যাদি খরিদ–‌বিক্রয় করিতে পারিবে। যদি কালে এই মেলার দ্বারা কোনোরূপ আয় হয়, তবে ট্রাস্টীগণ ওই আয়ের টাকা মেলার কিংবা আশ্রমের উন্নতির জন্য ব্যয় করিবেন’‌.‌.‌.‌।
শান্তিনিকেতনে ৭ পৌষের উপাসনা শুরু হল ১৮৯১ সালে। আগের বছর মন্দিরের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল— পরের বছর সূচনা হল পৌষ উৎসবের উপাসনার। সেদিন দিবসব্যাপী অনুষ্ঠান হয়েছিল। ‘‌শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংগীতকার্যে যোগদান করিয়া উপাসকমণ্ডলীকে পরিতৃপ্ত করিয়াছিলেন। সন্ধ্যাবেলার উপাসনাতেও রবীন্দ্রনাথ সংগীতে অংশগ্রহণ করেন। ১৮১৩ (‌১৮৯১ খ্রিস্টাব্দ)‌ শকের মাঘ মাসের ‘‌তত্ত্ববোধিনী’‌ পত্রিকায় সেদিনের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল।
শান্তিনিকেতন পৌষমেলা শুরু হয় ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে। সেদিন মন্দিরের সোপানে দঁাড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ এই বলে ভোজোৎসর্গ দান করেছিলেন, ‘‌অদ্য পৌষ মাসের সপ্তম দিবসে ব্রহ্মপ্রীতি কামনায় এই সমস্ত সবস্ত্র ভোজ্য অনাথ দীনদুঃখী ও আতুরদিগের উদ্দেশ্যে উৎসৃষ্ট হইল’‌।
শান্তিনিকেতনের প্রথম পৌষমেলার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১৬ শক (‌১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দ)‌ ‘‌তত্ত্ববোধিনী’‌ পত্রিকার মাঘ সংখ্যায়। ‘‌দিবা দ্বিতীয় প্রহর। চতুর্দিকে দোকান পসার বসিয়াছে এবং স্থানীয় লোকে উৎসব ক্ষেত্র পরিপূর্ণ হইয়াছে। ঐ সময় সাধারণের হৃদয়ের সুশিক্ষার উদ্দেশে রাজা হরিশ্চন্দ্রের উপাখ্যান গীত হইয়াছিল।
অনন্তর রক্ত সন্ধ্যায় আকাশ সুরঞ্জিত এবং রক্তাভ সূর্য প্রান্তরের পশ্চিম প্রান্তে অস্তমিত হইল, বিচিত্র বর্ণের কাচ নির্ম্মিত বিশাল ব্রহ্মমন্দির আলোকমালায় উদ্ভাসিত হইয়া অপূর্ব শ্রীধারণ করিল। সকলে পুনরায় ব্রহ্মোপাসনার জন্য মন্দিরে প্রবেশ করিলেন।.‌.‌.‌
অনন্তর সুমধুর সঙ্গীত হইয়া সভাভঙ্গ হইল। পরে সমস্ত নিঃস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া চটাচট শব্দে বহ্নুৎসব পর্ব্ব আরম্ভ হইল। লোকতরঙ্গ মহাকোলাহলে ক্ষুভিত হইয়া উঠিল। তৎকালে খধূপোদগত গোলকের বিচিত্র নির্ম্মল আলোকে সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে কেবলই মস্তকরাজি দৃষ্ট হইতে লাগিল। কি ভীষণ জনতা। কি বিষম কলরব।’‌
শান্তিনিকেতন পৌষমেলার নিজস্ব চরিত্র ক্রমান্বয়ে গড়ে উঠছে। এর এক বছর বাদেই (‌১৮৯৬)‌ মেলার বর্ণনায় আমরা পাই বাউল দলের কথা— গোপীযন্ত্র বাজিয়ে তালে তালে নৃত্য করে গান গাইছে— তাদের ঘিরে মোহিত হয়ে শুনছে মেলাযাত্রীরা। কোথাও বহুসংখ্যক ক্ষুধার্ত দীনদরিদ্র মানুষ ‘‌অতি উপাদেয় খেচরান্ন’‌ উদরপূর্তি করে গ্রহণ করছে। কোথাও দোকান পসার সাজিয়ে নানারূপ দ্রব্যাদি বিক্রয় হচ্ছে। ‘‌কোথাও সরলতার প্রতিমূর্তি সঁাওতাল গৃহিণীরা নূতন জলধরকান্তি গুঞ্জাবতংসশোভিত শিশুগুলিকে ক্রোড়ে লইয়া তাহাদের নিমিত্ত নানারূপ ক্রীড়নক কিনিতেছে। কোথাও সুশিক্ষিত মধুরকণ্ঠ কলাবৎ তানলয়স্বরসংযোগে হিন্দি ভজন ধরিয়ছেন। .‌.‌.‌চতুর্দিকেই আনন্দের মহাকল্লোল।’‌.‌.‌.‌
এর পরের বছরের বর্ণনায় আছে এক ভিখারিনী বেহালার সুরে কোমল কণ্ঠে গাইছে—
‘‌ভেবে মরি কি সম্পর্ক তোমার সনে
তত্ত্ব তার তত্ত্বাতীত হে, না পাই বেদ পুরাণে।’‌
ঠিক আজ থেকে একশো বছর আগের মেলাটি কেমন ছিল সে কৌতূহল আমাদের স্বাভাবিক। সেই ১৯১৯–এর মেলার বর্ণনায় দেখা যায় এক দিকে কীর্তনের আখড়া বসেছে আর অন্য দিকে দুই দল বাউল একতারা বাজিয়ে নৃত্য করতে করতে চলেছে। কোথাও মন্দিরের গায়ক শ্যাম ভট্টাচার্য ও আশ্রম বালকেরা বৃক্ষতলে বসে বাউলের সুরে গান গাইছে। আর মেলার এক প্রান্তে কৃষিবিদ সন্তোষচন্দ্র মজুমদার একটি গো–প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন সর্বসাধারণের জন্য।
ইলামবাজার থেকে এসেছে কারিকরের দল। তারা গালা দিয়ে উৎকৃষ্ট দ্রব্য প্রস্তুত করে, আর মেলার এক ধারে গালার দ্রব্য প্রস্তুত করবার প্রণালীও সাধারণকে দেখানো হচ্ছে।
আশ্রমের ছাত্ররা ‘‌সমবায়’‌ খাদ্যভাণ্ডার খুলে সাধারণের জন্য বিশুদ্ধ খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করছে। ছাত্ররা নিজেরা মূলধন তুলে নিজেরাই দোকান নির্মাণ করে, ক্রয় বিক্রয়ের হিসাব রাখে। এমনই ছিল ঠিক শতবর্ষ আগের মেলাটি।
‌‌প্রায় একশো বছর আগে ছোট্ট রাণুকে (‌‌লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়)‌‌ রবীন্দ্রনাথ ৭ পৌষের মেলা দিয়ে এক কৌতুকভরা বিবরণ দিয়েছিলেন। ছোট্ট রাণু তার বিদ্যালয়ে পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিয়ে কবিকে জানিয়েছিল সেখানে কত মজা আর কত লোক হয়েছিল। কবি লিখলেন–‌ ‘‌তোমাদের প্রাইজে কত লোক জমেছিল?‌ পঞ্চাশ জন?‌ কিন্তু আমাদের এখানে মেলায় অন্ততঃ‌ দশ হাজার লোক তো হয়েইছিল। তুমি লিখেছ, একটি ছোটো মেয়ে তার দিদির কাছে গিয়ে খুব চীৎকার করে তোমাদের সভা খুব জমিয়ে তুলেছিল–‌ আমাদের এখানকার মাঠে যা চীৎকার হয়েছিল তাতে কত রকমেরই আওয়াজ মিলেছিল, তার কি সংখ্যা ছিল। ছোটো ছেলের কান্না, বড়োদের হাঁকডাক, ডুগডুগির বাদ্য, গোরুর গাড়ির ক্যাঁচকোচ, যাত্রার দলের চীৎকার, তুবড়িবাজির সোঁ সোঁ, পটকার ফুটফাট, পুলিশ–‌চৌকিদারের হৈ হৈ— হাসি, কান্না, গান, চেঁচামেচি, ঝগড়া ইত্যাদি ইত্যাদি।
৭ই পৌষে মাঠে খুব বড়ো হাট বসেছিল— তাতে গালার খেলনা, ফলের মোরব্বা, মাটির পুতুল, তেলে–‌ভাজা, ফুলুরি, চিনেবাদাম ভাজা প্রভৃতি আশ্চর্য আশ্চর্য জিনিস বিক্রি হল। এক এক পয়সা দিয়ে ছেলেমেয়েরা সব নাগরদোলায় দুলল;‌ চাঁদোয়ার নীচে নীলকণ্ঠ মুখুজ্যের কংসবধ যাত্রার পালা গান হচ্ছিল–‌সেইখানে একেবারে ঠেলাঠেলি ভিড়।’‌
সেই সময় মেলার অন্নতম আকর্ষণ ছিল বাজি পোড়ানো। মেলা শুরু হওয়ার আগেও ১৮৯২ সালে তত্ত্ববোধিনীর বর্ণনায় ‘‌আতসবাজী’‌ প্রদর্শনের কথা আছে। আর প্রথম মেলার বর্ণনায় আছে— ‘‌সমস্ত নিঃস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া চটাপট শব্দে বহ্ন্যুৎসব পর্ব্ব আরম্ভ হইল।’‌ প্রাচীনকালের ছাত্র প্রথমনাথ বিশীর বর্ণনায় আছে, ‘‌সব শেষে বাজিতে আগুন দেওয়া হইত। তুবড়িগুলা মুহূর্ত মধ্যে অগ্নিময় তরুতে অঙ্কুরিত পল্লবিত পুষ্পিত হইয়া নিঃশেষ হইয়া যাইত। উল্কামুখী হাউইগুলা আকাশের তারার প্রতি বিদ্যুদ্‌ বেগে সঙিন চার্জ করিয়া অবশেষে এক সময়ে বিচিত্র স্ফুলিঙ্গে ঝরিয়া পড়িত। সব শেষে জাহাজ ও কেল্লায় অগ্নিসংযোগ হইত। ততক্ষণে রাত্রি গভীর হইয়াছে, শীতের শিশির রৌদ্রদগ্ধ শুষ্ক তৃণের উপর পড়িয়া একপ্রকার সিক্ত গন্ধ জাগাইয়া দিয়াছে;‌ সেই সময়ে উৎসবের পালা সাঙ্গ করিয়া আমরা ঘরে ফিরিয়া আসিতাম।’‌
পিতার দীক্ষাদিনটিকে রবীন্দ্রনাথ বার বার বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। দীক্ষা উৎসবের উপাসনার ভাষণে বলেছেন, ‘‌শান্তিনিকেতনের সাম্বৎসরিক উৎসবের সফলতার মর্মস্থান যদি উদ্ঘাটন করে দেখি, তবে দেখতে পাব, এর মধ্যে সেই বীজ অমর হয়ে আছে, যে বীজ থেকে এই আশ্রম–‌বনস্পতি জন্মলাভ করেছে, সে হচ্ছে সেই দীক্ষা গ্রহণের বীজ। মহর্ষির সেই জীবনের দীক্ষা এই আশ্রম–‌বনস্পতিতে আজ আমাদের জন্য ফলেচে, এবং আমাদের আগামীকালের উত্তরবংশীয়দের জন্য ফলতেই চলবে’‌।
৭ পৌষ ১৩২৯–‌এর উপাসনার ভাষণে কবি মহর্ষির জীবনে এই দীক্ষার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে একটা প্রিয়জনের মৃত্যু ঘটনায় মহর্ষির মনে দীক্ষার প্রথম উদ্বোধন জাগে। প্রেম মৃত্যুকে স্বীকার করতে চায় না, সে নিজের মধ্যেই অমৃতলোকের সাক্ষ্য পায়। এই জন্য প্রেম যখন মৃত্যুর দ্বারে দাঁড়ায় তখন তার সন্মুখে মৃত্যুই অমৃতলোকের বার্তা বহন করে। এই কথাই ঋষির বাণী অবলম্বন করে দীক্ষামন্ত্র রূপে তাঁর কাছে এসেছিল— ‘‌ঈশাবাস্যমিদং সর্ব্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।’‌ এই দীক্ষাবাণী নিয়ে বিশ্বজগৎকে ঈশ্বরের দ্বারা পরিপূর্ণ দেখতে পাওয়াই অমৃতলোককে উপলব্ধি করা।
কবির জীবনের শেষ ৭ পৌষ–‌ ১৩৪৭। কবি মন্দিরে উপস্থিত হতে পারেননি। ৭ পৌষের ভাষণে কবি পূর্বেই মুখে মুখে বলেছিলেন, তার অনুলেখন করেছিলেন অমিয় চক্রবর্তী। ভাষণটির নাম ‘‌আরোগ্য’‌। সেখানে জানালেন –‌ আমি আশ্রমে উপস্থিত আছি অথচ ৭ই পৌষের উৎসবের আসন গ্রহণ করতে পারিনি, এরকম ঘটনা আজ এই প্রথম ঘটল। আমার বার্ধক্য এবং আমার রোগের দুর্বলতা আমাকে সমস্ত বহির্বিষয় থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে’‌। এই উৎসবের অন্তর্গত খ্রিস্ট–জন্মদিনে কবির মনে চারিদিকের নৃশংসতা যে দারুণ বিক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল তার প্রকাশ হয় ‘‌‌প্রচ্ছন্ন পশু’‌‌ (‌‌২৪ ডিসেম্বর ১৯৪০)‌‌ কবিতায় সংগ্রাম–‌মদিরা–‌পানে আপনা–‌বিস্মৃত
দিকে দিকে হত্যা যারা প্রসারিত করে
মরণলোকের তারা যন্ত্রমাত্র শুধু,
তারা তো দয়ার পাত্র মনুষ্যত্বহারা।
কবি ৭ পৌষের উপাসনায় জীবনের শেষ ভাষণে এ কথা জানালেন—
‘‌যুগ প্রতিকূল, বর্বরতা বলিষ্ঠতার মর্যাদা গ্রহণ করে আপন পতাকা আন্দোলন করে বেড়াচ্ছে রক্ত পঙ্কিল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। কিন্তু বিকারগ্রস্ত রোগীর সাংঘাতিক আক্ষেপকে যেন আমরা শক্তির পরিচয় বলে ভুল না করি। লোভ যে সম্পদ আহরণ করে আনে তাকে মানুষ অনেকদিন ঐশ্বর্য বলে জ্ঞান করে এসেছে এবং অহংকৃত হয়েছে সঞ্চয়ের মরীচিকায়। লোভের ভাণ্ডারকে রক্ষা করবার জন্য জগৎজুড়ে অস্ত্র–‌সজ্জা, যুদ্ধের আয়োজন চলল। সেই ঐশ্বর্য আজ ভেঙেচুরে তার ভগ্নাবশেষের তলায় মনুষ্যত্বকে নিষ্পিষ্ট করে দিচ্ছে।’‌
১৯০৫ সালে মহর্ষির মৃত্যু হয়। যদিও এ মেলার পরিকল্পনা ও প্রতিষ্ঠা তাঁরই ইচ্ছায়, কিন্তু শান্তিনিকেতন মন্দির, মেলা তিনি কখনও দেখেননি। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় স্থাপনের পর রবীন্দ্রনাথই এই আশ্রমের রূপকার। আশ্রমে উপস্থিত থাকলে প্রায় প্রতি ৭ পৌষে তিনি মন্দিরে ভাষণ দিয়েছেন। শান্তিনিকেতন আশ্রমে ক্রমান্বয়ে পুনর্জন্ম ঘটেছে শিল্পসংস্কৃতির। এরই সঙ্গে ঘটেছে মেলারও রূপরূপান্তর। উপাসনায় তিনি আশ্রমবাসীদের স্মরণ করে দিয়েছেন যে, প্রতিদিন যে আশ্রম দেবতা আমাদের কাজের আড়ালেই গোপন থেকে যান, তিনি আজ এই পুণ্যদিনের প্রথম ভোরের আলোতে উৎসব দেবতার উজ্জ্বল বেশ পরে আমাদের সকলের কাছে এসে দাঁড়িয়ে যেন বলেন, ‘‌জাগো, আজ আশ্রমবাসী সকলে জাগো’‌। মহর্ষিকে স্মরণ করে বলেছেন— ‘‌সেই সাধু সাধক, তাঁর জীবনের সকলের চেয়ে বড়ো দিনটিকে, তাঁর দীক্ষার দিনটিকে, এই নির্জন প্রান্তরের মুক্ত আকাশ ও নির্মল আলোকের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তাঁর এই মহাদিনটির চারিদিকে এই মন্দির, এই আশ্রম, এই বিদ্যালয় প্রতিদিন আকার ধারণ করে উঠছে;‌ আমাদের জীবন, আমাদের হৃদয়, আমাদের চেতনা একে বেষ্টন করে দাঁড়িয়েছে’‌।
 তবুও অন্তত আটবার তিনি মেলায় থাকতে পারেননি। ১৯০৭–‌এর অগ্রহায়ণে কনিষ্ঠপুত্র শমীন্দ্রের মৃত্যু ঘটেছে। সে বছর মেলায় অনুপস্থিত থেকেছেন তিনি। এ ছাড়া ১৯১১, ১২ সালেও তিনি অনুপস্থিত। ১৯১২–‌তে তিনি আমেরিকায়। ১৯১৬–‌তেও আমেরিকার আরবানা শহরে, ১৯২০–‌তে ছিলেন নিউ ইয়র্কে, ১৯২৪–এ ছিলেন আর্জেন্টিনায়। সেখান থেকে অ্যান্ড্রুজকে লিখেছেন, ‘‌Tomorrow i shall join your festival from a distance and try to feel my heart with my yearly provision of shanti‌‌’‌। ১৯৩০ ও ১৯৩৩–‌এও তিনি পৌষ উৎসবে যোগদান করতে পারেননি।
আশ্রম বিদ্যালয় ক্রমে বিশ্বভারতীতে পরিণত হল। আশ্রম বিদ্যালয়ের ছাত্রদের বাৎসরিক পুনর্মিলনের অনুষ্ঠান হয়ে উঠল এই মেলা। মেলায় যে গ্রামের মানুষজনের বিনোদনের জন্য নানা আয়োজন, তেমনি তাদের জীবনযাত্রার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসেরও সমাবেশ সেখানে। বীরভূম অঞ্চলের গ্রামীণ শিল্পীদের অজস্র জিনিস মেলায় এসে গৌরবের স্থান করে নিল। গ্রামাঞ্চলের কারুশিল্প ও লোকসংস্কৃতিকে পৌষমেলার মাধ্যমে শিক্ষিতজনের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সূচনাপর্ব থেকেই। পৌষের উৎসব ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দিবস হল। পৌষ উৎসবে আগত মানুষজনের সামনে পৌষমেলা বছরের পর বছর আশ্রমের স্বীকৃত সরল জীবনযাত্রার উপযোগী গ্রামীণ শিল্পীদের হাতে তৈরি নান্দনিক রুচিসম্পন্ন নানা উপকরণের সমাবেশ ঘটিয়েছে। আশপাশের জনগোষ্ঠীর বিনোদনের জন্য আদিকালে একটি সহজ সরল গ্রামীণ পরিবেশ ছিল মেলাটিকে ঘিরে। পৌষমেলা যতদিন মন্দিরের পাশের মাঠে ছিল ততদিন গ্রামীণ সমাজের প্রয়োজন মেটাবার সামগ্রী এর অন্যতম আয়োজন ছিল।
পৌষমেলায় প্রথম পরিবর্তন এল ১৯৫০–‌এ। বিশ্বভারতী নিউজে এই পরিবর্তনের খবর দেওয়া আছে— The divine service was held at Chhatimtalla this year, and not at the Mandir where it is usually held... Chhatimtalla afforded easy accomodation for the huge congregation of members, guardians, ex-students and other categories of visitors that assembled on the occasion. The instalation of mike was another innovation that proved definitly advantageous.‌’‌ ‌অর্থাৎ প্রচুর জনসমাবেশের জন্য উপাসনা মন্দির থেকে ছাতিমতলায় এল, এবং মাইক ব্যবহারের রীতি শুরু হল।
দ্বিতীয় পরিবর্তন এল ২৩ ডিসেম্বর ১৯৬১ সালে। 
সে বছর ম‌‌‌হর্ষির দীক্ষার ১১৮ বছর, শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠার ৯৮ বছর, শান্তিনিকেতন মন্দির প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর, ব্রহ্মবিদ্যালয়ের ৬০ বছর আর বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর। আর কবিগুরুর জন্মের শতবর্ষ। সেবার বিশ্বভারতী নিউজ–‌এ সংবাদ ছিল— To mark the great occassion, this year's Mela was held for five days, instead of usual three days,... To meet the requirements of Mela on a much larger scale, the venue was shifted to Purva-Palli.‌
মেলার মাঠের ‌স্থান পরিবর্তন হল পূর্বপল্লীতে। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত মেলা ধারাবাহিকভাবে হতে পারেনি। ১৯৪৩ সালে মহর্ষির দীক্ষার শতবর্ষের অনুষ্ঠান হলেও মেলা বসেনি। ‘‌In view of the wide spread distress in the country‌’‌ মেলা হয়নি। ১৯৪৬ সালেও দেশের বিশৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিতে মেলা বসেনি। তবে মেলা না বসলেও পৌষ উৎসব হয়েছে। উপাসনা, প্রাক্তনদের উৎসব, স্মরণসভা, বার্ষিক পরিষদ যথারীতি হয়েছে।
মেলার রূপ–‌রূপান্তর ঘটেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। তবু এ মেলার বিনোদন মঞ্চের অনুষ্ঠান সত্যিই অভিনব। লোকসংস্কৃতিকে সর্বসাধারণের সামনে উপস্থিত করা আদিকাল থেকে এ মেলার কৃত্যসূচি। বাউলগান, মনসামঙ্গল, কবিগান, ফকিরদের গান, আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রা, পাঁচালিগান, রায়বেঁশে, আলকাপ, রামায়ণ গান, সাপুড়েদের গান, ছৌনৃত্য, কীর্তন, রনপানৃত্য, নাকাড়াবাদ্য, ঝুমুর, সত্যপীরের পাঁচালি— এ সবই বৈচিত্র‌ময় ও বিশিষ্ট করে তুলেছে এ মেলাকে।
অনেকের স্মৃতিতেই এই মেলার পুরনো স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে। সেই প্রাচীন গ্রামীণ রূপটি কখন নতুন দিনের পরিবর্তনের ছোঁয়ায় অস্পষ্টতর হয়েছে। আজকের মেলার এই রূপান্তরে অনেকেই বিপন্ন বোধ করেন। তাঁদের বিষণ্ণতার উত্তরে জানাই, শতাব্দীপ্রাচীন এই মেলা যেন কোনও চিহ্নকেই হারিয়ে যেতে দেয়নি। মেলায় ঘুরলে হঠাৎ হঠাৎ পুরনো স্মৃতির ছবি কোথাও না কোথাও ধরা পড়বেই। উজ্জ্বল নিয়নের অটোমোবাইলের পাশে গালা আর মৃৎশিল্পের আয়োজন স্বল্পালোকে বড় মায়াময় হয়ে ওঠে। বাউলের সুরে, ফকিরের গানে, অথবা অবহেলিত কোনও নিষ্ঠ কারিকরের নিমগ্ন কাজে হঠাৎ করে ধরা পড়ে পুরনো দিনের কথকথা। আর সেখানেই পৌষমেলা স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। ■

ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top