অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: নেতাজি‌ সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে আমাদের বিস্ময় কোনওদিন কাটবে না। বাঙালির বীরত্ব নিয়ে যাবতীয় কটাক্ষকে খান-‌খান করে দেওয়ার জন্যে একজন নেতাজি-‌ই যথেষ্ট। তাই তাঁকে নিয়ে ‘‌মিথ’‌ও প্রবল। এবং তিনি, যত দিন যাবে, লোককথার নায়কের মত আরও উঁচু হয়ে উঠবেন। আমরা আরও মুগ্ধ, আরও বিস্মিত হয়ে তাকাব তাঁর দিকে।
কিন্তু যাঁকে নিয়ে আমাদের এত মুগ্ধতা, এত বিস্ময়, তাঁর মৃত্যুরহস্য কেন আজও ধোঁয়াশায় ঢাকা থাকবে, কেন সত্য-‌টা সামনে আসবে না সবার, এ এক বিরাট প্রশ্ন। প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। বারবার এই প্রশ্ন উঠেছে এবং আবার ঢাকা পড়ে গেছে। সেই আবরণ উন্মোচনের এক বড়সড় ডাক দিলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়, তাঁর ‘‌গুমনামী’‌ ছবিতে।
সত্যিই তিনটে তত্ত্ব আছে এই ছবিতে, নেতাজির মৃত্যু রহস্য নিয়ে। এক, তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু। দুই, রাশিয়ায় অত্যাচার। তিন, সন্ন্যাসী গুমনামী বাবা হয়ে ফিরে আসা।
এই ছবিতে রাশিয়ার অংশটি খুবই সংক্ষিপ্ত। তিন তত্ত্বের খাতিরে রাশিয়া-‌পর্বটি প্রায় ছুঁয়ে গেছেন সৃজিত।
নেতাজির নেতৃত্ব, তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে তাইহোকু-‌পর্বে। এবং বিমান দুর্ঘটনাটিও বিশদেই দেখিয়েছেন সৃজিত। নেতাজির মৃত্যুও। কিন্তু এই পর্বটিকে পুরোপুরি খণ্ডন করে ‘‌গুমনামী’‌র তৃতীয় এবং সবচেয়ে বৃহৎ পর্ব গুমনামীবাবার আবির্ভাব এবং মুখার্জি কমিশনের সওয়াল।
নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে ৫৬ সালে শাহনওয়াজ কমিশন এবং ৭০ সালে খোসলা কমিশন কাজ করেছিল। তার প্রায় তিন দশক পরে মুখার্জি কমিশন বিস্তারিতভাবে রহস্য সমাধানের চেষ্টা করে। প্রচুর সাক্ষীর বয়ান নথিভুক্ত করে। কিন্তু সেই কমিশনের রিপোর্টও জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। কেন?‌ এই প্রশ্ন তুলেছে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি।
তৃতীয় পর্বটি আসলে এক সাংবাদিকের অনুসন্ধান পর্ব এবং মুখার্জি কমিশনের মুখোমুখি হয়ে একটার পর একটা তথ্য পেশ করা। এবং এখানে স্পষ্টভাবে তথ্য দিয়ে প্রমাণ করা হয়, ১৮৪৫ সালের ১৮ আগস্ট বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি। হতে পারে না। কারণ, সেদিন বা তার কাছাকাছি সময়ে তাইহোকুতে কোনও বিমান দুর্ঘটনা হয়নি।
এবং, অজস্র তথ্য দিয়ে এই সাংবাদিক প্রমাণ করে দেন, সন্ন্যাসী গুমনামী বাবাই আসলে নেতাজি। অনেক চিঠি, অনেক ছবি, অনেক তথ্য। নেতাজির ঘনিষ্ঠ বহু মানুষের বয়ান। সব কিছু থেকে ওই সাংবাদিক প্রমাণ করে দেন তাঁর ‘‌সত্য’‌।
মুখার্জি কমিশনের সামনে অনেক তর্কাতর্কি, অনেক যুক্তি, অনেক প্রতিরোধ পেরিয়ে মিশন নেতাজি-‌র সাংবাদিক স্পষ্ট করে দেন গুমনামী বাবাই নেতাজি।
এই সব সাক্ষ্যপ্রমাণ সূত্রেই উঠে আসে গুমনামী বাবার এপিসোড।
যদিও গুমনামীবাবা কথা বলতেন না বলে জানা যায়, কিন্তু এই ছবিতে প্রচুর কথা বলেছেন গুমনামী বাবা। প্রথমে পর্দার আড়াল থেকে, পরে মুখোমুখি।
এছবিতে নেতাজির চরিত্রে অভিনয় করাটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রসেনজিতের কাছে, তাঁর এতাবৎকালের কেরিয়ারে। সন্দেহ নেই, সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেছেন প্রসেনজিৎ তাঁর ব্যক্তিত্বপূর্ণ ও দক্ষ অভিনয়ে। এবং সোমনাথ কুণ্ডুর মেকআপ সাহায্য করেছে তাঁকে। আর, গুমনামী বাবার চরিত্রে প্রসেনজিৎ তো সত্যিই অনবদ্য। নেতাজি এবং গুমনামী বাবার চরিত্রায়ণ অবশ্যই প্রসেনজিতের মুকুটে  এক বর্ণময় পালক। সাংবাদিকের চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্য দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। তনুশ্রীর অভিনয়ও খুব ভাল। সাংবাদিকের দাম্পত্য-‌জীবন একটু বেশি সময় নিয়েছে ছবিতে। মুখার্জি কমিশনের সওয়াল-‌জবাব মনোযোগ কেড়ে রাখে। বিচারপতি মুখার্জির চরিত্রে শ্যামল চক্রবর্তী ও ‘‌মিস্টার পাল’ বিপ্লব দাশগুপ্ত, ‘‌হবিবুর রহমান’‌ সত্যম ভট্টাচার্য ও সুনীল গুপ্তর চরিত্রে প্রান্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখযোগ্য অভিনয় করেছেন। সংবাদপত্রের সম্পাদক হিসেবে ছোট্ট চরিত্রে সৃজিতেরও প্রশংসা প্রাপ্য। এছবির সঙ্গীত ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত ও ক্যামেরা সৌমিক হালদারের। দুজনেই এ ছবির অপরিহার্য সঙ্গী হয়ে উঠেছেন।
ছবির শেষে তিনটি তত্ত্বের কথা লিখে দিলেও পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় নেতাজি মিশনের সাংবাদিক চন্দ্রচূড়কেই যে গুরুত্ব দিয়েছেন, এনিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এবং এনিয়েও কোনও সন্দেহ নেই যে, নেতাজির প্রতি শ্রদ্ধায় কোনও খামতি নেই পরিচালকের। এছবি ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়েছে ‘‌গুমনামী’‌ মুক্তির আগে থেকেই। এই বিতর্ক যদি নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য সমাধানের উদ্যোগে কিছুটা ভূমিকাও পালন করে, সেটা খুব কম কথা নয়। এই ছবিরই সংলাপ ধার করে বলা যায়, আসলে, আমরা সবাই তো বসু-‌পরিবারের সদস্য। আমরা চাই, এই পরিবারের এক শ্রেষ্ঠ সন্তানের অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান হোক। ‘‌গুমনামী’‌ সেই চাওয়াটাকে আর একবার জীবন্ত করে তুলল।‌

জনপ্রিয়

Back To Top