বয়স ২৮। কিন্তু তাঁর কথায় মুগ্ধ রানি এলিজাবেথ থেকে মাদকাসক্ত তরুণ। জন্মসূত্রে বাংলাদেশি, কর্মসূত্রে ব্রিটিশ নাগরিকের কথা শুনলেন তপশ্রী গুপ্ত
‌‌ ‌আপনার ক্যাম্পেনের নাম ‘‌ইনস্পায়ার ওয়ান মিলিয়ন’‌। 
১০ লক্ষেই থেমে যাবেন?‌
সাবিরুল:‌ না–না। ওটা জাস্ট একটা নাম্বার। ক্যাচি শুনতে লাগে। নিজেকে কোনও সংখ্যায় বাঁধতে চাই না। সেই ২০১১ সাল থেকে সারা পৃথিবী দৌড়ে বেড়াচ্ছি। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮০০ ইভেন্টে বক্তৃতা দিয়েছি। হিসেব করিনি কত লক্ষ লোক শুনল। বরং আমি জানতে আগ্রহী, কত লোক সত্যিই আমার কথায় অনুপ্রাণিত হল।
‌‌ ‌এত কম বয়সে মোটিভেশনাল স্পিকার হলেন কীভাবে?‌
সাবিরুল:‌ একটু আগে থেকে বলি? অনেক ঝামেলার পর ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম বই ‘‌দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট ইওর ফিট’‌। তার পরেই মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে আমার যাত্রা শুরু। তখন আমার বয়স ১৭। পরের ন’‌‌মাসে ব্রিটেন জুড়ে ৩৭৯টা স্কুল–‌কলেজ–‌বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেছিলাম। ১৮ বছর বয়সে পৌঁছে বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়েছি মনে হল। ভাবছিলাম, কীভাবে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনো যায়‌। একটা ম্যাগাজিনের সঙ্গে যোগাযোগ হল, যেটা ব্রিটেনের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। ভাবলাম বলে দেখি। কিন্তু তারা আমার মতো বাচ্চা ছেলের সম্পর্কে লেখা ছাপাবে কেন?‌ বিশ্বাস করুন, ৬০০ পাউন্ড খরচ করতে হয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়েছিল। ছ’‌মাস পর নাইজেরিয়ার ফার্স্ট লেডির কাছ থেকে ডাক পেলাম। গিয়ে আমি অবাক। নানা বয়সের প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোক আমার কথা শুনলেন মন দিয়ে। চোখে জল এসে গিয়েছিল যখন একজন মাদকাসক্ত এসে দেখা করে ধন্যবাদ দিল।
‌‌ ‌মাত্র আঠাশ বছর বয়সে পৃথিবী জুড়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করছেন। নিজে প্রেরণা পেয়েছিলেন কোথা থেকে?‌
সাবিরুল:‌‌ বলতে পারেন নিজের থেকেই। ছোটবেলা থেকেই কিছু একটা হতে চেয়েছিলাম। ভাবতাম, লোকে আমাকে কী জন্য মনে রাখতে পারে। আমাদের আদি বাড়ি বাংলাদেশের সিলেটে। বাবা–‌মা আমার জন্মের আগে চলে যান লন্ডন। ওঁরা তেমন কেউকেটা ছিলেন না। রুটিরুজির খোঁজে পাড়ি দিয়েছিলেন বিদেশে। তেমন কিছু করতে পারেননি অবশ্য। খুব কষ্ট করে থাকতেন ইস্ট লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে। যে সমাজে আমার জন্ম আর বেড়ে ওঠা, তার নেগেটিভ অ্যাপ্রোচটা ভাল লাগত না। মনে হত, যে শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে বাংলাদেশিদের এত অহঙ্কার, আমরা তাঁর মতো লড়াকু হতে পারি না কেন?‌ ব্যর্থতা তো আসবেই। সেটা নিয়ে বসে থাকলে চলবে?‌ আমার প্রথম বই, যেটা এখন বিশ্বে বেস্ট সেলার, সেটা ৪০টা প্রকাশক বাতিল করেছিল!‌ ১৭ বছরের একটা ছেলের জন্য কতটা শকিং। আমি কিন্তু দমে না গিয়ে নিজেই এডিট করে, ডিজাইন করে নিজের পয়সায় ছেপে ফেললাম। নিজেই মার্কেটিং করলাম। ন’‌মাসে বিক্রি হল ৪২,৫০০ কপি। তখন দরজায় প্রকাশকদের লাইন। পরের বছর পেশাদারভাবে বেরোল। বাংলা–‌সহ বেশ কয়েকটা ভাষায় বইটার অনুবাদও হল। 
‌‌ ‌মোটিভেশনাল বক্তা হিসেবে আপনার ইউএসপি কী?‌
সাবিরুল:‌‌ আমি নির্দিষ্ট পরামর্শ দিই। আমার টার্গেট নতুন প্রজন্ম। হাতেকলমে কী করলে জীবনে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, কীভাবে মাইন্ডসেট বদলাবে, সেই উপায় বাতলানো আমার লক্ষ্য। যাকে ব্যবসার ভাষায় বলে স্টার্ট আপ। ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া ব্যক্তিগত কনসালটেন্সি আমি করি না। মনে আছে, বতসোয়ানায় আমার বক্তৃতা শুনে একজন হোটেলে এসে দেখা করেন। উনি অনেকটা জমি পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে। জানতে চান, কীভাবে সেটা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা শুরু করবেন। যতটা সম্ভব পরামর্শ দিলাম। তিনি এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ফান্ড তৈরি করবে আর সেটা কাজে লাগানো নিয়ে দুটো টিভি সিরিজও করেছি।
‌‌ ‌আপনার তৈরি বিজনেস বোর্ড গেম টিন–‌ট্রেপ্রেনার অনেক দেশেই দারুণ জনপ্রিয়। কী শেখা যায় এই গেমে?‌
সাবিরুল:‌‌ গেমটা ১১ থেকে ১৫ বছরের বাচ্চাদের কথা ভেবে তৈরি। ১০ মাস সময় লেগেছিল তৈরি করতে। ব্যবসার মূল বিষয়গুলো, যেমন বিনিয়োগ, বিক্রি, ব্যয়, ঋণ, এমনকী স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকাণ্ডও শেখা যায়। এক কথায় ছোটদের আর্থিক সাক্ষরতার প্রথম পাঠ। বহু স্কুলে এখন এটা চালু করা হয়েছে। 
‌‌ ‌বাংলাদেশের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ কেমন?‌
সাবিরুল:‌‌ আমার কাজের বেশির ভাগটাই আফ্রিকা, দক্ষিণ–‌পূর্ব এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে। শিকড় বাংলাদেশে বলে এখানকার যুব সম্প্রদায় আমার কথা বেশি ভাল বুঝতে পারে। যদিও একেবারে ছোটবেলায় একবার সিলেট আসার পর লম্বা সময় আর আসিনি। ২০১৩ সালে এসে দু’‌সপ্তাহ ধরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিলাম। সিলেটে গিয়ে আশ্চর্য লাগল। পূর্বপুরুষের জায়গা তো। আর নাবিলার সঙ্গে আলাপ হল। খুলনার মেয়ে। আমাকে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানানোর ভার পড়েছিল ওর ওপর। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বলতে পারেন। পরে আমরা বিয়ে করি।
‌‌ ‌ঢাকায় সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটির কর্মকাণ্ডের সূচনা হল। কলকাতার এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে কী প্রত্যাশা?‌
সাবিরুল:‌‌ কলকাতা কখনও যাওয়া হয়নি। আশা করছি শিগগিরই যাব এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে। অ্যান্ড আই উড লাভ ইট।‌
‌‌ ‌ভারতের যুব সম্প্রদায় সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?‌
সাবিরুল:‌‌ ভারতের মুম্বই, চেন্নাই, কোদাইকানালে বক্তৃতা করেছি। কিন্তু তাতে অত বড় দেশের কতটুকুই বা বোঝা সম্ভব?‌ ছোটবেলাটা খুব আর্থিক কষ্টে কাটায় কথা বলার সময় আমার পা মাটিতে থাকে। দেখে ভাল লেগেছে, অন্য অনেক দেশের মতো স্টার্ট আপ কালচার ভারতেও ভালভাবে তৈরি হয়েছে। ভারতে শিক্ষার মানও খুব ভাল। স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে রোজগারের সুযোগ আছে। বাবা–‌মায়েদের বলেছি, কেরিয়ার নিয়ে বাচ্চাদের চাপ দেবেন না। বরং জানতে চান ওর কী হতে ইচ্ছে করে।‌ কাগজে–‌কলমে ডিগ্রিটাটাই শেষ কথা নয়। আমি জাস্ট টেন পাশ! ক্যান ইউ বিলিভ ইট? 
 

জনপ্রিয়

Back To Top