কেন্দ্রের এনএমসি বিলের প্রভাব সম্পর্কে এই তাঁর পর্যবেক্ষণ। যে বিলের বিরুদ্ধে কাল, সোমবার দেশে চিকিৎসকদের ধর্মঘট। সামনে ছিলেন সাগরিকা দত্তচৌধুরি

‌‌ ‌ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন (‌এনএমসি)‌ বিল নিয়ে দেশজুড়ে হইচই। আপনি কী মনে করেন?
‌কুণাল সরকার: এনএমসি নিয়ে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা চলছে বহুদিন ধরে। কেন্দ্রের বর্তমান সরকার বিষয়টা নিয়ে নাড়াচড়া শুরু করেছে। চিকিৎসাশিক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষামন্ত্রক, নাকি স্বাস্থ্যমন্ত্রকের অধীন থাকবে, সেটা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বাগ্‌বিতন্ডা চলে আসছে। এনএমসি আসার পরেও সেই বিতর্ক চলবে। এখন এই বিল এলেও দুর্ভাগ্য যে, সমস্যা সমাধানের বদলে সমস্যাটা আরও জটিল হয়ে উঠল।
‌‌ ‌কেন্দ্র মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া ভাঙতে চায় কেন?
কুণাল: ডাক্তারি শিক্ষাব্যবস্থা বা ডাক্তার তৈরি করতে গেলে মেডিক্যাল কলেজের প্রয়োজন। ডাক্তারদের পঠনপাঠনের পাঠ্যক্রম, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে প্রয়োজনমতো তারা প্রশিক্ষণ পাচ্ছে কিনা— এই সমস্ত বিষয় তদারকির জন্য একটা সংস্থার প্রয়োজন। মেডিক্যাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (‌এমসিআই)‌ স্বাধীনতার আগে ১৯৩৩ সালে গঠিত হয়েছিল। অ্যাক্ট করে একটি স্ট্যাটুটরি বডি গঠিত হয়েছিল। মেডিক্যাল কলেজগুলির মান ঠিক আছে কিনা, তাতে পড়ানোর উপযুক্ত পরিকাঠামো আছে কিনা, ক্লাসরুম, শিক্ষক সব পর্যাপ্ত সংখ্যায় আছে কিনা, সেটা দেখাই তাদের কাজ। নির্বাচনের মাধ্যমে বাছাই প্রতিনিধিরা সেই তদারকির কাজটা করে আসছেন। সমস্যাটা হল, এমসিআই‌য়ের‌ মূল কাজ মেডিক্যাল কলেজের মান ঠিক আছে কিনা দেখা, পরিদর্শন, নতুন কলেজের প্রস্তাব এলে সঠিক যাচাই প্রভৃতি। কিন্তু পরে দেখা গেল এই কাজগুলো তারা ঠিকমতো করতে পারছে না। তার ওপর আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠল। কাজকর্মে ঘাটতির পাশাপাশি নির্বাচন নিয়ে জলঘোলা হল। সেই সূত্রেই অনেকে মনে করতে থাকেন, পুরো সিস্টেমে একটা পরিবর্তন হওয়া দরকার। সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যায় ২০০৯–’১০ সালে। অজস্র ঘটনার নিরিখে ২০১১ সাল নাগাদ অন্য কোনও কাঠামোর দাবি ওঠে। কারণ, দেখা গিয়েছিল, ওই পরিস্থিতিতে বর্তমান কাঠামোয় এমসিআই অপ্রাসঙ্গিক এবং অনৈতিক। 
‌‌ ‌অন্য কাঠামো বলতে এনএমসি। যেটা গড়ার দাবি তুলে সেই বিল পেশ হয় সংসদে। তারপরেও দেশজুড়ে আন্দোলন কেন? 
‌কুণাল: যেটা দরকার ছিল, তা হল চিকিৎসাশিক্ষা, প্রশিক্ষণের মান দেখা বা মেডিক্যাল এডুকেশনে দুর্নীতি যাতে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করা। তার বদলে ব্যাপারটা অতিরিক্ত অন্য ইস্যুতে জড়িয়ে পড়েছে। সেটা নিয়েই এখন গোটা দেশ তোলপাড়। আগে একরকমের প্রতিবাদ ছিল। এবার এনএমসি বিল নিয়ে অন্যরকমের প্রতিবাদ হচ্ছে। যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোকে বাদ দিয়ে তার বদলে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ডাক্তারদের খুঁচিয়ে ঘা করার চেষ্টা হচ্ছে। চিকিৎসাশিক্ষাকে সুষ্ঠু একটা জায়গায় না–নিয়ে গিয়ে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই প্রস্তাবিত এনএমসি বিলে। 
‌‌ ‌কোন কোন বিষয়গুলির জন্য আপনার এনএমসি বিলকে অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে? ‌‌
কুণাল: মূলত চারটি বিষয়ে এই বিলটি আসল দিকগুলিকে গুরুত্ব না দিয়ে অন্যান্য অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে ঝুঁকছে। প্রথমত, এই বিলে চিকিৎসকদের বদলে যাঁরা এমবিবিএস নয়, তাঁদের কথা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলা শুরু হয়েছে। অ্যালোপ্যাথির বদলে আয়ুষ স্বাস্থ্যকর্মী বা অল্টারনেটিভ মেডিসিন যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের একটা ব্রিজ কোর্স করিয়ে এমবিবিএস ডাক্তারদের সমকক্ষ করে তুলতে চাওয়া হচ্ছে। আমার মনে হয়, ডাক্তারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামার জন্য নয়, স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সামগ্রিক করে তুলতে স্বাস্থ্যকর্মী দরকার। তার জন্য অঙ্গনওয়াড়ি, আশা বা আয়ুষ কর্মীরা আছেন। তাঁরা তাঁদের মতো থাকবেন। সহযোগী হিসেবে পরিষেবা দেবেন। এনএমসি বিলে দেখলাম তাঁদেরই যেন তৎকাল ডাক্তার তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে একটা ‘‌ক্রিমিনাল টেনডেন্সি’‌ রয়েছে। এটাকে সমর্থন করা মুশকিল। ডাক্তাররা সবসময়েই চাইবেন স্বাস্থ্য পরিষেবা দিতে। কিন্তু যাঁরা আদৌ এমবিবিএস ডাক্তারি পড়েননি, তাঁদের তৎকাল কোর্স করানো আর এটিএম থেকে ডাক্তার বার করা একই কথা। এটা অবাস্তব এবং প্রচণ্ড হাস্যকর। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য একজন ডাক্তারি পড়ুয়াকে সাড়ে চার বছর ধরে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়। কেন্দ্রীয় সরকার নিজে যদি বলে মেডিক্যাল কলেজের মান নেই, তাহলে তারা মান নির্ধারণ করুক। পড়াশোনার মান যাচাই করুক। মান দেখার জন্য আরেকটা পরীক্ষা নেওয়া হবে— এটার কোনও মানে হয় না। অন্য দেশ থেকে কেউ এলে আলাদা পরীক্ষা হয়। একটা রাজ্যে একই পড়ুয়াকে দু’বার করে পরীক্ষায় বসতে হবে!  এমবিবিএস পাশ করার পর ডাক্তার হতে গেলে আবার ন্যাশনাল এক্সিট এগজামের মতো আরেকটি পরীক্ষার বোঝা চাপানো অর্থহীন। গুণগত মানের যে অভাব আছে, সেগুলি ঠিক করার জন্যই তো এমসিআইএর বদলে এনএমসি আনা। প্রতি বছর ২০ শতাংশ করে কম ছেলেমেয়ে ডাক্তারিতে আসছে। এ বছর সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ আসন খালি। এ রাজ্যেও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে প্রায় ৪০ শতাংশ আসন ফাঁকা। পাগল না–হলে আর দু’বছর পর কেউ ডাক্তারি পড়তে আসবে না। তৃতীয়ত, সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭ সালের নির্দেশ অনুযায়ী ‘নিট’ দিয়ে ডাক্তারি পড়তে হবে। কোন মেডিক্যাল কলেজের কতটা ফি হবে, তা–ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনামায় বলা আছে। কিন্তু এনএমসি কোন কলেজ কত ফি নেবে, তার উর্দ্ধসীমা তুলে দিতে চাইছে। কেউ চাইলে এক কোটিও নিতে পারে! কে কতটা ফি নেবে, তার কোনও নির্দিষ্ট সীমা নেই বিলে। ফলে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের রমরমা আরও বাড়বে। চতুর্থ, অনেকের প্রচুর আপত্তি বিল নিয়ে। এনএমসি বিলের যে প্রশাসনিক কাউন্সিল হবে, তাতে দেশের মোট ৩০টি রাজ্যের মধ্যে প্রত্যেক বছর মাত্র ৩টি রাজ্যের প্রতিনিধি থাকবেন। এ তো অদ্ভুত সিদ্ধান্ত! সকলের অংশীদারি থাকা দরকার। শুধু তিনটে রাজ্য কথা বলবে আর বাকিরা শ্রোতা হয়ে থাকবে, তা তো হতে পারে না! এমসিআই পরিবর্তনের আমূল প্রয়োজন ছিল। কিন্তু চোরের হাত থেকে মুক্তি পেতে দেখছি এঁরা দেখলাম ডাকাতের গুহায় ঢুকে পড়েছেন। ডাক্তারি নিয়ে আলোচনা করতে করতে প্যারামেডিক্‌সদের নিয়ে আলোচনার কোনও মানে হয় না। কিছু সম্মান সুপ্রিম কোর্ট ফিরিয়ে দিলেও আবার এখন বেসরকারি কলেজকে তোয়াজ করব বলে ফি–এর উর্ধ্বসীমা তুলে দিলাম! যুক্তরাষ্ঠীয় পরিকাঠামোর মধ্যে সব রাজ্যের অধিকারকে স্বীকার করতে হবে। এটা সিনেমা বা বিনোদন নয়। আমরা স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে কথা বলছি। যা সব রাজ্যের সকলের অধিকার। এনএমসি বিলে এখন যা আছে, তাতে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই হতাশ। 
‌‌ ‌ ‌কাল, সোমবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এনএমসি বিল নিয়ে চিকিৎসকরা আন্দোলন করবেন। সেটা কি যুক্তিসঙ্গত?
‌কুণাল: এখন অবধি ডাক্তাদের বিভিন্ন সংগঠন থেকে যে প্রতিবাদ, তার অধিকাংশই উপরোক্ত বিষয়গুলি নিয়ে। সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটি কিছু পরিবর্তন করেছে। সেগুলো কী, সেটা এখনও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। কারণ, যেখানে মেন ফোকাস করা দরকার, কেন্দ্রীয় সরকার সেখানে দৃষ্টি না–দিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে এনএমসি–তে অন্তর্ভুক্ত করছে। আন্দোলন করে সময় নষ্ট হচ্ছে চিকিৎসকদের। ডাক্তারেরা ডাক্তারি বাদ দিয়ে ধর্না দিচ্ছেন। যা কখনও কোথাওই কাঙ্খিত নয়। এনএমসি বিলের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ঠিকঠাক ভাবে সঠিক বিষয়গুলির অন্তর্ভুক্তি। তাহলেই পুরো বিষয়টা চিকিৎসক, রোগী, সাধারণ মানুষ— সকলের পক্ষেই মঙ্গলদায়ক হবে। 

 

জনপ্রিয়

Back To Top