অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: একইসঙ্গে উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নায়িকা হয়ে প্রথম দর্শকদের সামনে এসেছিলেন তিনি। সলিল দত্তের ‘‌স্ত্রী’‌ ছবিতে। তিনি, আরতি ভট্টাচার্য। প্রথম আবির্ভাবে এমন বিরল সুযোগ বাংলা ছবিতে আর কোনও অভিনেত্রী পাননি। উত্তমকুমারের সঙ্গেই সাতটি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। এখন মুম্বইতে থাকেন। উত্তমকুমার প্রতিষ্ঠিত শিল্পী সংসদ তাঁকে রবীন্দ্রসদনে সংবর্ধিত করল উত্তমকুমারের জন্মদিনে, সোমবার, ৩ সেপ্টেম্বর। এই কারণেই দুদিনের জন্যে কলকাতায় এলেন তিনি।
সংবর্ধিত উত্তম-‌নায়িকার সঙ্গে পরের দিন সন্ধ্যায় দেখা হল দক্ষিণ কলকাতায় সঙ্গীত পরিচালক অশোক ভদ্রের ‘‌মিউজিক-‌রুম’‌-‌এ। আজকালের বিনোদন-‌এর জন্যে একান্ত সাক্ষাৎকারে রাজি হয়েছিলেন তিনি। বহুদিন পরে কলকাতায় এলেন। অনেক অজানা কথা অকপটে আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন তিনি।
• কলকাতায় দুদিনের জন্যে এসে একটা সন্ধ্যে এই মিউজিক-‌রুমে গানের আবহে কাটালেন। আপনি কি গান করেন?‌
•• না, না, আমি গান গাইতে পারি না। অশোক (‌ভদ্র)‌ আমাদের প্রোডাকশনের হিন্দি বা ভোজপুরী ছবিতে সুর করেছে। অনেকদিনের পরিচয়। সেজন্যেই আসা।
• আপনি নাকি ‘‌অসাধারণ’‌ ছবিতে একটা গান গেয়েছিলেন?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ এটা বেশ কিছুদিন আগে একজন আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন। না, না, আমি গাইনি। তবে, সেই ৮০/‌৮১ সালে বন্যাত্রাণের জন্যে নেতাজি ইনডোরে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে পাকে-‌চক্রে আমাকে একটা গান গাইতে হয়েছিল।
• গান না জেনেই গান গাইলেন?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ প্রায় সেরকমই। মান্না দা (‌মান্না দে)‌ একদিন আমাকে বললেন, তোমরা নায়িকারা শুধু স্টেজে মুখ দেখিয়ে চলে আসো। এই অনুষ্ঠানে তুমি একটা গান করো। বললাম, আমি বাথরুম সিঙ্গার। তখন মান্না দা বললেন, আমার কোন গানটা তোমার সবচেয়ে ভাল লাগে বলো। বললাম, ‘‌এ রাত ভিগি ভিগি’‌। ব্যস, মান্না দা পুরো গানটা লিখিয়ে দিলেন, মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে বসিয়ে রিহার্সাল করালেন। অনুষ্ঠানের দিন মঞ্চে মান্না দা ঘোষণা করে দিলেন, আরতি গান গাইবে। সব শেষে গাইতে উঠলাম। সঙ্গে মান্না দা। গান শেষ হতেই প্রবল হাততালি। অনুরোধ আসতে লাগল, আর একটা। আমি হাত জোড় করে বললাম, ‘‌এই একটা গানই জানি।’‌ এই হল আমার গায়িকা জীবনের ইতিবৃত্ত।
• আপনি ‘‌স্ত্রী’‌ ছবিতে দুই বিরাট অভিনেতা এবং নায়কের সঙ্গে প্রথম দর্শকদের সামনে এলেন।
•• এটা ঠিকই, আমার প্রথম রিলিজ হওয়া ছবি ‘‌স্ত্রী’‌। কিন্তু আমি সিনেমায় প্রথম অভিনয় করি মৃণাল সেনের ‘‌এক আধুরি কাহানি’‌তে। দ্বিতীয় ছবি করি ‘‌পিকনিক’‌, সমিত ভঞ্জের সঙ্গে। কিন্তু ওই দুটো ছবিই ‘‌স্ত্রী’‌-‌র পরে রিলিজ করে।
• আপনি তো জামশেদপুরের মেয়ে। মৃণাল সেনের সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে? অভিনয়ে কি আগে থেকেই আগ্রহ ছিল?‌‌
•• জামশেদপুরে আমাদের বাড়ি ছিল ঠিকই, কিন্তু আমার মামার বাড়ি ছিল হুগলির চঁুচড়োয়। মামা বাড়িতে নাটকের অভিনয়ের রেওয়াজ ছিল। আমি জামশেদপুরে স্কুলে অনেক হিন্দি নাটকে অভিনয় করেছি। বাংলা কিন্তু তখন আমার তত সড়-‌গড় ছিল না। কিন্তু নাটকের অভিনয়ে আগ্রহ ছিল। আমার নাটকে অভিনয় দেখে সত্যদা (‌সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়)‌ তখন আমাকে কলকাতায় একটা নাটক করার কথা বলেন। সেই নাটকটা হল ‘‌নহবৎ’‌
• সেটা তো খুবই বিখ্যাত এবং জনপ্রিয় নাটক।
•• হ্যঁা, ওই ‘‌নহবৎ’‌-‌এ আমি শুরু থেকেই ‘‌কেয়া’‌র চরিত্রে অভিনয় করতাম। সত্যদা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সাবিত্রীদির (‌সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়)‌ কাছে ট্রেনিংয়ের জন্যে। বহুদিন আমি এই নাটকে অভিনয় করেছি। পরে, সিনেমার কাজের চাপে আর করতে পারিনি। তখন আমার চরিত্রটা রত্না (‌ঘোষাল)‌ করত।
• এই নাটক করতে করতেই কি সিনেমায় সুযোগ পেলেন?‌
•• হ্যঁা, মৃণালদার ইউনিটের একজন সত্যদাকে বলেছিলেন। সত্যদাই আমাকে মৃণাল সেনের কাছে পাঠান। হিন্দি ছবি। শুনেছিলাম, মৃণালদা একটা ডাকাবুকো মেয়ের খোঁজ করছিলেন, যে হিন্দিটা ঠিকঠাক বলতে পারে। অডিশনের জন্যে যেদিন গিয়েছিলাম, সেদিন অনেকেই এসেছিলেন। প্রোডিউসার অরুণ কাউলও ছিলেন। উনি আমার সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলছিলেন। আমিও হিন্দিতেই উত্তর দিচ্ছিলাম। মৃণালদা ছিলেন কাছেই। উনি হঠাৎ বলে উঠলেন, এই মেয়েটাকেই চাই। অন্যদের সবাইকে চলে যেতে বলো।
• কোথায় শুটিং হয়েছিল ‘‌এক আধুরি কাহানি’‌র?‌
•• বিহারে। প্রথমে শুনেছিলাম, এই ছবির প্রধান পুরুষ চরিত্র করবেন অমিতাভ বচ্চন। তখনও কিন্তু তিনি সুপারস্টার হননি। তবে, কেন জানি না, অমিতাভ বচ্চন করেননি। করেছিলেন সোমা দে-‌র হাজব্যান্ড বিবেক চ্যাটার্জি।
• তখনও আপনার কোনও ছবি রিলিজ হয়নি, অথচ দুই সেরা অভিনেতার সঙ্গে ‘‌স্ত্রী’‌ ছবির অফার পেলেন। উত্তমকুমার এবং সৌমিত্র। ভয় করেনি?‌ কীভাবে অফারটা পেলেন?‌
•• ‘‌এক আধুরি কাহানি’‌র ডাবিং দেখতে এসেছিলেন সলিল দত্ত। কিন্তু ‘‌স্ত্রী’‌র চরিত্রের সঙ্গে এই ছবির চরিত্রের একশ মাইলের মধ্যে কোনও মিল নেই। মৃণালদার ছবিতে আমি একবারে অজ পাড়া গাঁয়ের এক ঘুঁটে কুড়োনি মেয়ে। এটা দেখেই সলিল দত্ত মৃণালদাকে বলেন, এই মেয়েটাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বোলো।
• গিয়েই কি শুনলেন, এই ছবিতে উত্তমকুমার এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আছেন?‌
•• আমার মা সঙ্গে ছিলেন। গল্পটা শোনানোর পর সলিল দত্ত বললেন, তোমার অপোজিটে থাকবেন উত্তমকুমার ও সৌমিত্রবাবু।

এটা শুনে আমার মায়ের চোখ তো ছানাবড়া। আমি তো বলেই ফেললাম, আমার সঙ্গে এমন একটা ইয়ার্কি কেন করছেন?‌ আমার কথা শুনে সলিলদা তো খুব রেগে গেলেন। কিন্তু কী করব, এমন একটা অবিশ্বাস্য কথা শুনে আমার যা মনে হয়েছে, সেটাই বলে ফেলেছিলাম।
• প্রথম দিন যখন শুটিংয়ে উত্তমকুমারকে দেখলেন, অভিনয় করলেন, ভয় করেছিল?‌
•• আসলে, আমি তো তখন বেশ ছোট। পুরোপুরি নারী হয়ে উঠিনি। চুলও ছোট। তবে, ঢ্যাঙা মতন ছিলাম। খুব দুষ্টুমি করতাম বলে চোখগুলো বোধহয় ‘‌এক্সপ্রেসিভ’‌ ছিল। প্রথম দিনের শুটিংয়ে সেজে গুজে, বড় চুলের উইগ পরে, বউ সেজে আমি রেডি। সকাল থেকে স্ক্রিপ্ট পড়ে পড়ে সব ডায়লগ তখন মুখস্ত। তারপর উত্তমকুমার এলেন।
• তখনই কথা হল?‌
•• কথা হবে কী, উনি তো কোনও দিকে না তাকিয়ে, কেমন একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে চলে গেলেন মেক-‌আপ রুমে। আমার খুব দুঃখ হল। আমি হিরোইন। আমার দিকেও তাকালেন না!‌
• উত্তমকুমার কখন তাকালেন আপনার দিকে?‌
•• ফ্লোরে এসে শুটিংয়ের সময়। উনি স্ক্রিপ্টটা পড়ছিলেন। ওঁর প্রথম সংলাপ ছিল, ‘‌একি, তুমি গয়না পরোনি কেন?‌’‌ আমাদের দু’‌একটা কথার পর, আমার সংলাপ ছিল—‘‌আমার একটা ছবি তোলাতে চাই।’‌ উনি বলবেন, ‘‌ছবি কী করবে?‌’‌ আমার উত্তর—‘‌এই ঘরে বেড়াল, পাখি, আসবাবগুলো ছাড়াও যে আমি ছিলাম, তার একটা প্রমাণ তো থাকবে।’‌ এই সব সংলাপ দেখে উত্তমকুমার বললেন, ‘‌সলিল, এত ডায়ালগের কী দরকার?‌’‌ উনি তখন পরিচালককে বোঝাচ্ছিলেন, একটা সংলাপের পর কাট করে কীভাবে সীতাপতি মানে সৌমিত্রদার দৃশ্যে যাওয়া হবে, তারপর কাট করে দেখানো হবে ফটোবাবু এসেছে ছবি তুলতে। শুনে আমি তো খুব রেগে গেলাম। সকাল থেকে এত ডায়ালগ মুখস্ত করলাম, ডায়ালগগুলো ভালও লেগেছে, এখন কি না সব বাদ চলে যাবে?‌ আমি বলে উঠলাম, ‘‌আমি কোনও ডায়ালগ বাদ দেব না। সব বলব।’‌ আমার এই কথার পর এন টি ওয়ানের ফ্লোরে পিন-‌ড্রপ-‌সাইলেন্স। কেউ ভাবতেও পারেনি, এইটুকু একটা মেয়ে উত্তমকুমারের সঙ্গে প্রথম ছবি করতে এসে এমন কথা বলার সাহস দেখাতে পারে। উত্তমকুমারও গম্ভীর হয়ে গেলেন। যা যা ডায়ালগ ছিল, সব নিয়েই শুটিং হল। উনিও ওই ‘‌শট’‌ দিয়ে মেক-‌আপ রুমে চলে গেলেন। সবাই আমাকে এসে বলতে লাগল, ‘‌এই ছবিটা দাদা আর করবেন না। আর, আপনারও এটাই শেষ ছবি।’‌ কিন্তু সেদিন স্টুডিও থেকে চলে যাওয়ার আগে, দাদা এসে টোকা দিলেন আমার মেক-‌আপ রুমে। দরজা খুলে উত্তমকুমারকে দেখে আমি ভ্যঁা করে কেঁদে ফেললাম। উনি বললেন, ‘‌এই প্রথম একজন বাঘ পেলাম যে উত্তমকুমারের কথা মানল না। শোন, আমি যে সব সময় ঠিক বলেছি, তার তো কোনও মানে নেই। তুই তো তোর ভাবনাটা সামনা সামনি প্রকাশ করেছিস।’‌ তারপর আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘‌তুই অভিনয়টাও খুব ভাল করেছিস। আমি তোকে আশীর্বাদ করছি, তুই অনেক বড় হবি।’‌ তখন আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। আমি আবিষ্কার করলাম একজন মহৎ মানুষকে। উত্তমদার সঙ্গে অভিনয়ের ভয় সেদিনই উনি নিজেই কাটিয়ে দিলেন। আমি কোনও কথা বলতে পারিনি তখন। চোখে জল নিয়ে ওঁকে একটা প্রণা ম করেছিলাম শুধু।
• সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রথম অভিনয়ের অভিজ্ঞতা কেমন?‌
•• আসলে, বেশ কয়েকদিন উত্তমদার সঙ্গে শুটিং করার পর সৌমিত্রদার সঙ্গে ফ্লোরে যাই। ততদিনে উত্তমদাই আমাকে সাবলীল করে দিয়েছেন। ফলে, সৌমিত্রদার সঙ্গে যখন পার্ট করলাম, তখন আর অসুবিধে হয়নি। টেনশনও হয়নি। টেনশন হয়েছিল ছবি রিলিজের সময়। উত্তমকুমার, সৌমিত্রদা তো স্টার। ছবি যদি ফ্লপ হয়, সবাই আমাকেই দোষ দেবে। বলবে, এই মেয়েটার জন্যেই ফ্লপ হল। এই টেনশনটা ছিল। কিন্তু ৭৫ সপ্তাহ চলেছিল ছবিটা। দর্শকদের এত ভালবাসা পেয়েছি তখন, যা সারাজীবন ভুলব না।
• উত্তমকুমারের সঙ্গে কটা ছবি করেছেন?‌
•• সাতটা ছবি। ‘‌স্ত্রী’‌ ছাড়া ‘‌আনন্দমেলা’‌, ‘‌রাজবংশ’‌, ‘‌আমি সে ও সখা’‌, ‘‌জাল সন্ন্যাসী’‌, ‘‌নিশান’‌, ‘‌অসাধারণ’‌।
• সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে?‌
•• ‘‌‌স্ত্রী’ তো বটেই। এছাড়া ‘‌নন্দিতা’‌, ‘‌প্রেয়সী’‌, ‘‌জব চার্ণকের বিবি’‌ করেছি। আরও দু’‌একটা করেছি। এক্ষুনি মনে পড়ছে না।
• কোন নায়কের সঙ্গে কাজ করে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছেন?‌
•• সেটা তো এক এবং অদ্বিতীয় উত্তমকুমার। কিন্তু সৌমিত্রদাও অসাধারণ। এছাড়া বুবুদার (‌সমিত ভঞ্জ)‌ সঙ্গে বেশ কয়েকটা ছবি করেছি, রঞ্জিতবাবু (‌রঞ্জিত মল্লিক)‌, দীপঙ্করবাবুর (‌দীপঙ্কর দে)‌ সঙ্গে ছবি করেছি।
• আপনি ওঁদের ‘‌বাবু’ বলে ডাকতেন?‌
•• হ্যঁা। আমি শুধু সন্তুকে (‌মুখোপাধ্যায়)‌ সন্তু বলতাম। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল। একসঙ্গে থিয়েটারও করেছি।
• এত নায়কের সঙ্গে অভিনয় করলেন। প্রেম-‌ট্রেম কিছু হয়নি?‌
•• (‌হাসতে হরাসতে)‌ আসলে আমি পার্টি-‌টার্টিতে যেতে পছন্দ করতাম না। ‘‌স্নব’‌ এবং ‘‌অ্যারোগ্যান্ট’‌ বলে আমি কুখ্যাত‌‌ ছিলাম।। ফলে, প্রেম-‌ট্রেম করতে কেউ খুব একটা এগোয়নি।
• এই কুখ্যাতির কারণ?‌
•• একবার আউটডোরে শুটিংয়ের শেষ দিন রাতের পার্টিতে একজন হিরো ড্রিংক করে হাসিদিকে (‌সুমিত্রা মুখার্জি)‌ বাজে কথা বলছিল, অপমান করছিল।

হাসিদি কাঁদছিল, কিন্তু অন্য কেউ বারণও করছিল না। আমি থাকতে না পেরে বললাম, এভাবে আপনি হাসিদিকে আপমান করছেন কেন?‌ সেই হিরো তখন বললেন, ‘‌এর মধ্যে তুমি ঢুকছো কেন?‌ মেয়েদের আমার জানা আছে।’‌ তখন আমার হাতে একটা ছ’‌ব্যাটারির টর্চ ছিল। আমি রাগ সামলাতে না পেরে ওই হিরোকে টর্চ দিয়ে মারতে শুরু করি। তাঁর কপাল ফুলে উঁচু হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন সকালে উনি অবশ্য ক্ষমা চেয়েছিলেন।
• কোন ছবির শুটিং ছিল?‌
•• না, এটা বললে তো ধরে ফেলবেন। আমি সেটা চাই না। আমি তো এতদিন পরে সেই মানুষটাকে অসম্মান করতে পারি না। তিনি ক্ষমাও চেয়েছিলেন। নামটা গোপন থাক। আসলে, আমার এই খ্যাতি বা কুখ্যাতি খুব তাড়াতাড়ি রটে গিয়েছিল স্টুডিওপাড়ায়। একদিন তো একটা ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে শুটিংয়ের সময় উত্তমদা বললেন, ‘‌আমি কিন্তু এক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে পার্ট করব।’‌ তাই নিয়ে খুব হাসাহাসি হল সেদিন।
• কিন্তু ‘‌আমি সে ও সখা’‌ ছবিতে উত্তমকুমারের সঙ্গে আপনার একটা চুম্বন-‌দৃশ্য নিয়ে তো বেশ হইচই হয়েছিল তখন। আপনার অন্য একটা ইমেজও তৈরি হয়ে গেল।
•• হ্যঁা, ঠিকই, আমার একটা সেক্সি ইমেজ তৈরি হয়ে যায় ‘‌আমি সে ও সখা’‌ আর তপনদার (‌তপন সিংহ)‌ ‘‌রাজা’ ছবি করার পর। ‘‌আমি সে ও সখা’‌ তে উত্তমদার সঙ্গে চুম্বন-‌দৃশ্যটা তো চিট করে তোলা। তখন তো সরাসরি চুম্বন-‌দৃশ্য দে খানো হত না। কিন্তু তারপর দরজায় ঠেস দিয়ে গলার মালাটা ছিঁড়ে ফেলে আমি যে এক্সপ্রেশনটা দিয়েছিলাম, সেটা নাকি মারাত্মক হয়েছিল। ছবি দেখে অনিলদা (‌অনিল চট্টোপাধ্যায়)‌ বলেছিলেন, ‘‌আমি তো ভাল লোক বলেই লোকে চেনে। এই ছবিতে তোর অভিনয় দেখার পর চরিত্র ঠিক রাখা খুব মুস্কিল।’‌ বলে, খুব হেসেছিলেন অনিলদা। এই ছবিতে মৈত্রেয়ীর চরিত্রটা করে আমি বি এফ জে এ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি, রাজ্য সরকারের অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলাম।
• মৃণাল সেনের ছবিতে শুরু, তপন সিংহর ‘‌রাজা’‌, ‘‌হারমোনিয়াম’‌ করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘‌জন অরণ্য’‌ও করেছেন। কিন্তু তরুণ মজুমদারের ছবিতে আপনি নেই।
•• তখন তো সন্ধ্যাদি (‌সন্ধ্যা রায়)‌ চুটিয়ে কাজ করছেন তনুদার ছবিতে। তাই আমাকে আর দরকার পড়েনি। আর, ঋত্বিক ঘটকের ছবি করার সুযোগ-‌ই হয়নি।
• বাংলার কোনও হিরোকে পছন্দ হল না বলে ভোজপুরী ছবির নায়ক কুণাল সিংকেই বিয়ে করলেন?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ কুণালজির সঙ্গে আমার পরিচয় হিন্দি ছবি করতে গিয়ে। মৃণাল সেনের চিফ অ্যাসিসট্যান্ট গিরিশ রঞ্জন ‘‌কাল হামারা হ্যায়’‌ ছবিতে আমাকে আর কুণালজিকে নেন। কুণালের এটাই প্রথম ছবি। এই ছবি করার সময়েই একটা অনুভূতি তৈরি হয় আমাদের পরস্পরের সম্পর্কে। কেউ কিন্তু কাউকে প্রেম নিবেদন করিনি। কিন্তু প্রেমটা দুজনেই টের পেয়েছিলাম। সেখান থেকেই বিয়ে। আর, কুণাল পরে প্রোডাকশন হাউস করে। সেই ব্যানারে অনেক ভোজপুরী ছবি আমরা করেছি। আমি বেশ কয়েকটা ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছি, পরিচালনা করেছি। এখন আমার ছেলে আকাশ অভিনয় করছে—ভোজপুরী ছবিতে, হিন্দিতেও।
• স্ক্রিপ্ট লেখেন ছবির জন্যে। লেখালেখির অভ্যাস কি আগে থেকেই ছিল?‌
•• হ্যঁা, তা ছিল। একসময় আমি সন্তোষকুমার ঘোষের লেখা নাটক ‘‌অজাতক’‌-‌এ অভিনয় করি, নিমু ভৌমিকের পরিচালনায়। আকাদেমিতে নাটকটা দেখে মঞ্চে উঠে সন্তোষবাবু বলেছিলেন, ‘‌আরতি সত্যিই আমার অজাতকের বনানী হয়ে উঠেছে।’‌ তারপর একদিন সন্তোষবাবু বাড়িতে এসেছিলেন। আমি বলেছিলাম, আপনার সমস্ত গল্প আমি পড়েছি। উনি বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, তুমি লেখালেখি করো নাকি?‌ সেদিন আমার লেখা একটা গল্প শুনে সন্তোষবাবু বলেছিলেন, ‘‌কোনও দিন মনে করলে অভিনয় ছেড়ে দিতে পারো, লেখাটা কখনও ছেড়ো না।’‌
• মহাজনের কথা মেনেছিলেন?‌
•• (‌হাসতে হাসতে)‌ গল্প উপন্যাস লেখা হয়নি। কিন্তু ৫২ পর্বের ‘‌সিরাজদৌল্লা’‌র স্ক্রিপ্ট লিখেছিলাম দূরদর্শনের জন্যে।
• এখন যদি বাংলা ছবি থেকে ডাক পান, করবেন?‌
•• না। অভিনেত্রী হিসেবে যে সম্মান পেয়েছি, সেটা তো আমার অর্জন। সেটা অক্ষুন্ন থাকুক।
• ৭০ সাল নাগাদ ছবিতে কাজ শুরু। কতদিন কাজ করেছেন বাংলা ছবিতে?‌
•• ৮০ সালে বিয়ে। ৮২ সালে মুম্বই চলে যাই। ততদিনে অন্তত ৪০টা ছবি করেছি। মনে হল, এই কাজটা তো মন দিয়েই করলাম। এবার সংসার করি।
• তার মানে, কোনও আক্ষেপ নেই অভিনেত্রী হিসেবে?‌
•• আছে। প্রথম আক্ষেপ, সত্যজিৎ রায় ডেকেছিলেন ‘‌ঘরে বাইরে’‌ ছবিতে অভিনয়ের জন্যে। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। মানিকদা বললেন, এই চরিত্রের জন্যে মাথা কিন্তু মুড়োতে হবে। আমার তখন পাঁচটা ছবির কাজ চলছে। উত্তমদার সঙ্গেই দুটো। আমি বললাম, মানিকদা, উইগ তৈরি করা যাবে না?‌ মানিকদা বললেন, সেটা সম্ভব নয়। ফলে, মাথা মুড়োতে হবে বলে আমি ‘‌ঘরে বাইরে’ করতে পারিনি। তবে, আজ আক্ষেপ হয়, এমন একটা ভাল ছবিতে কাজ করতে পারিনি বলে।
• এটাই একমাত্র আক্ষেপ?‌
•• না, আরও বড় আক্ষেপ আমি বিমল মিত্র, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, সমরেশ বসুদের মতো লেখকদের গল্প নিয়ে তৈরি ছবিতে কাজ করেছি, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক লেখক, চিরস্মরণীয় লেখক রবীন্দ্রনাথ বা শরৎচন্দ্রের কোনও কাহিনী নিয়ে তৈরি ছবিতে আমি অভিনয় করিনি। এর জন্যে কেমন একটা শূন্যতা অনুভব করি অভিনেত্রী হিসেবে। ‘‌ঘরে বাইরে’‌ ছবিটা করলে রবীন্দ্রনাথকেও আমার মতো করে পেতাম। সেটাও হল না। এই আক্ষেপটা থেকেই যাবে।‌

ছবি :‌ বিপ্লব মৈত্র
 

জনপ্রিয়

Back To Top