গৌতম গণ: ঘোর আর্থিক মন্দার মধ্যে সরকারি ঘোষণায় ১০টি ব্যাঙ্ক মিলে মিশে নতুন কলেবরে ৪টি অপেক্ষাকৃত বড় ব্যাঙ্কে পরিণত হতে চলেছে। 
এই সংযুক্তিকরণের অন্তত বাইশটা ভাল দিক দেখিয়েছেন মাননীয়া অর্থমন্ত্রী। তার কিছু কিছু হল—
১) ম্যানেজিং ডিরেক্টরের মতো উঁচু পদের আধিকারিকের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের খোলা বাজার থেকেই নির্বাচন করা যাবে। ব্যাঙ্কের ভিতর থেকে কর্মীদের উন্নীত করার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
২) শাখা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে খরচ কমানো যাবে বিশালভাবে।
৩) কর্মী সঙ্কোচন অবধারিত। এখানেও ব্যয়ভার কমানো যাবে।
৪) জাতীয় ও আঞ্চলিক, দুই স্তরেই ব্যাপ্তি এবং উপস্থিতি ঘটবে। ব্যবসা প্রসারিত হবে।
৫) স্থায়ী আমানতের অনুপাতে কারেন্ট ও সেভিংসের সম্মিলিত অনুপাত বাড়বে আর তার ফলে ব্যাঙ্কের কাছে আমানতের মূল্য তুলনায় সুলভ হবে।
৬) অনুৎপাদক ঋণের পরিমাণ যাবে কমে।
এখন এই ৬টা এলাকা নিয়ে একটু ভেবে দেখা যাক। সম্ভব, বা কতটা সম্ভব, তার আলোচনায় আসি।
১) সরকারি ব্যাঙ্কের চৌহদ্দির বাইরে পা বাড়িয়ে বাজার থেকে পরিণত ও সফল মানব সম্পদ নিশ্চয়ই আনা যাবে ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের পদগুলো পূরণ করার জন্য। আর সেটাই হওয়া উচিত প্রথম পদক্ষেপ।
কিন্তু সেক্ষেত্রে কয়েকটা ব্যাপারে ব্যাঙ্কের বোর্ডকে নমনীয় হতে হবে। প্রথমত, সফল ও প্রথিতযশা ব্যক্তিদের বেসরকারি ব্যাঙ্ক থেকে আনতে হবে। শুধু তাদের আনলেই হবে না। তারা চাইবেন আরও কিছু পারদর্শী আধিকারিককে আনতে যাদের সঙ্গে তারা কাজ করতে অভ্যস্ত। বলাই বাহুল্য বেসরকারি ব্যাঙ্ক থেকে আসা একজন ম্যানেজিং ডাইরেক্টর সরকারি ব্যাঙ্কের আধিকারিকদের মানিয়ে নিতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন। দ্বিতীয়ত, এরা কেউই সরকারি বেতন কাঠামোয় কাজ করবেন না। বাজার থেকে নিয়ে আসা এই আধিকারিকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো রচনা করতে হবে।
২) শাখা পুনর্বিন্যাস অবধারিত। এর ফলে ব্যয়ভার কমবে। যদিও এই পুনর্বিন্যাস এক মহাযজ্ঞ। গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত এই দশটি ব্যাঙ্কের সমস্ত শাখা পুনর্গঠনে তিন বছর তো লাগবেই।
৩) এরপরে আছে কর্মী সঙ্কোচন। দশটি সংস্থার মোট তিন লক্ষের ওপর কর্মীর ওপরে নেমে আসবে অনিশ্চয়তার খাঁড়া। যদিও অর্থমন্ত্রী মহাশয়া আশ্বাস দিয়েছেন যে কেউই কর্মচ্যুত হবেন না। এটা কেমন করে সম্ভব হবে সে ব্যাপারে হয়তো তাঁর কোনও পরিকল্পনা আছে। তবে স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প ছাড়া যে কোনও উপায় নেই সেটা এই মন্দার বাজারে প্রত্যয় নিয়ে বলাই যায়। আর এই স্বেচ্ছাবসর বাবদ সরকারের ঘাড়ে অর্থনৈতিক চাপটাও সহজেই অনুমেয়। তাই এই কর্মী সঙ্কোচনের অর্থনৈতিক সুফল ভোগ করতে এই নতুন কলেবরে ব্যাঙ্কগুলোকে বহুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া কর্মীদের স্থানান্তর করাও এক বড় চ্যালেঞ্জ। উঁচুতলার বহু আধিকারিক সমস্যায় পড়বেন। আর সবাইকে একসঙ্গে সুখী করাও যাবে না।
৪) সংযুক্তিকরণের পরে আঞ্চলিক, জাতীয় বা 
আন্তর্জাতিক স্তরে এই ব্যাঙ্কগুলোর যে সদর্থক উপস্থিতি 
ঘটতে পারে সে ব্যাপারে আশাবাদী হওয়াই যায়। তবে সংযুক্তিকরণের আওতায় এই দশটি ব্যাঙ্কের প্রতিটিরই জাতীয় স্তরে উপস্থিতি আছে। আঞ্চলিক স্তরে উপস্থিতির প্রসার ঘটতেই পারে।
৫) স্থায়ী আমানতের অনুপাতে কারেন্ট ও সেভিংসের সম্মিলিত অনুপাত বাড়লে যে ব্যবসায়িক দিক দিয়ে লাভ হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই আনুপাতিক পরিবর্তন সাধন করা সরকারি ব্যাঙ্কগুলোর পক্ষে কঠিন। কারণটা ঐতিহাসিক ও কর্মসংস্কৃতি বিষয়ক। এর জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন। যেমন, স্থায়ী আমানতের পিছনে চিরাচরিত দৌড় বন্ধ করতে হবে, অঙ্ক কষে আমানতের খাতা বাড়াতে হবে আর উপভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী বাজারে প্রোডাক্ট ও পরিষেবা চালু করতে হবে যা কি না বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলো সফলভাবে করে। মোদ্দা কথা, পরিকল্পনায় ও মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।
৬) এবার সব থেকে কঠিন জমিতে আসা যাক। আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে অনুৎপাদক ঋণের অনুপাত নিম্নমুখী হবে। এখানে বড় প্রশ্ন হল, অনুৎপাদক ঋণের অনুপাত না পরিমাণ? যদি এটা অনুপাত হয় তাহলে চিন্তার কারণ থেকে যায়। ধরা যাক, একটি ব্যাঙ্কের খাতায় দেখা যাচ্ছে, ১০০ টাকা মোট ঋণের পরিমাণ। তার মধ্যে অনুৎপাদক ঋণ ৭ টাকা অর্থাৎ ৭%। যদি ব্যাঙ্কটি বাজারে আরও ১০০ টাকা ঋণ দেয় সেক্ষেত্রে অনুৎপাদক ঋণের অনুপাত কমে আসবে এক ঝটকায় সাড়ে তিন শতাংশে। তাতে কিন্তু অনুৎপাদক ঋণের পরিমাণ কমল না! বরং মানুষকে ভুল বোঝানো হল। তাই পরিমাণের দিকে চোখ রেখে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। ঋণের ব্যাপারে স্বচ্ছতা আনতে হবে। বেসরকারি ব্যাঙ্কের, বিশেষ করে এইচডিএফসি–‌র, ঋণ নীতি অনুসরণ করতে হবে।
যদিও সরকারের এই সংযুক্তিকরণ পদক্ষেপ বলিষ্ঠ ও প্রশংসনীয় তবু এর সফলতার ব্যাপারে বেশ কিছু ‘‌কিন্তু’‌ থেকেই যাচ্ছে। কর্মকাণ্ডের দ্রুততা, মানুষের সদিচ্ছা ও পারদর্শিতা ঠিক করে দেবে এর সফলতা বা ব্যর্থতা। সেটা সময়ই বলবে।

জনপ্রিয়

Back To Top