কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর সঙ্গে দেখা, অল্প কথা হয়েছে দু’‌বার। ভদ্র, সংযত বলেই মনে হয়েছে। বিজেপি–‌র ঘরের লোক, সন্দেহ নেই। ছিলেন উত্তরপ্রদেশের অর্থমন্ত্রী, স্পিকার। আবার মুলায়ম সিং যাদবের আইনজীবী। কবিতা লেখেন, গর্ব তাঁর। সেই কবি বিদায়লগ্নে যা করে গেলেন, মানে, বলে গেলেন, ভদ্রতা ও সৌজন্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কয়েকবার বিব্রত করার চেষ্টা করেছেন রাজ্য সরকারকে। মমতা প্রকাশ্য সঙ্ঘাতে যাননি। তিনি জানেন, কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে, বিজেপি–‌যোগের সূত্রে, কিছু উল্টোপাল্টা মন্তব্য করবেনই।‌ কিন্তু, ঠিক যাওয়ার মুখে এটা কী করে গেলেন?‌ বিদায়ী রাজ্যপাল যাওয়ার সময় কটু কথা বলে যাচ্ছেন, রাজ্যকে সরাসরি অভিযুক্ত করছেন, নজির নেই। ‘‌মিঠা’‌ স্মৃতি নিয়ে ফিরে যাবেন, এটাই প্রত্যাশিত। সাংবাদিকরা কিছু জিজ্ঞেস করলেন, তিনি দুটো কথা বলে ফেললেন, তা নয়। ডেকে ইন্টারভিউ দিলেন টেলিভিশনে, সংবাদপত্রে। তাঁর বিতর্কিত বক্তব্যের একটা কথা নিয়ে আলোচনা করি।
বললেন, মমতা, তাঁর দল ও সরকার তোষণের রাজনীতি করছে। তাতে সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে। অমিত শাহ চল্লিশ মিনিট বক্তৃতা দিলে আঠারোবার ‘‌তুষ্টিকরণ’‌ শব্দটা উচ্চারণ করেন। সেই ঘৃণ্য রাজনীতিই উঠে এল বিদায়ী ‘‌কবি’‌ রাজ্যপালের কথায়। অমিত শাহ (‌নিশ্চয় কেশরীনাথ ত্রিপাঠীও)‌ গর্ব করে বলতে পারেন, তাঁরা ‘তোষণের রাজনীতি’‌ করেন না। একদম ঠিক। ‘‌তোষণ’‌ নয়, ওঁরা সরাসরি সাম্প্রদায়িকতার বিষ গেঁথে দেন। সংখ্যালঘু, দলিতদের নিগ্রহ ও হত্যায় মদত দেন। হিন্দুদের মধ্যে উগ্রতা ছড়িয়ে, সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বংস করেন। সেই চেষ্টা ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাতেও চলছে। ‘‌জয় শ্রীরাম’‌ রাজনীতি দিয়ে আমাদের বাংলাকে ছারখার করে দিতে চাইছেন।
‘‌তোষণের রাজনীতি’‌ করেন মমতা?‌ একটু খতিয়ে দেখা যাক। বড় অভিযোগ, ইমাম ভাতা দেওয়া হচ্ছে রাজ্যের কোষাগার থেকে। মিথ্যা। ইমাম ভাতা দেওয়া হয় ওয়াকফ বোর্ড থেকে, যাদের নিজস্ব আয় আছে। ফিরহাদ হাকিম সম্প্রতি বলেছেন, হিন্দুরা যদি এরকম কোনও সংস্থা করেন, পুরোহিত ভাতা দেওয়া সম্ভব। শ্মশানের পুরোহিতদের বিশেষ ভাতা দিতে শুরু করেছে পুরসভা।
অভিযোগ, মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যান মমতা ব্যানার্জি। হ্যাঁ, যান। সঙ্গে এই তথ্যটাও বলা যাক, শিখ–‌জৈন–‌বৌদ্ধ–‌খ্রিস্টানদের অনুষ্ঠানেও যান। বলেন, আমি হিন্দু। কিন্তু ধর্ম যার যার, ব্যক্তিগত, সম্প্রীতিই আসল কথা। বিজেপি–‌র কথা শুনে মনে হয়, মমতা মর্মে ‌মর্মে মুসলিমপ্রেমী। সত্যি?‌ ব্যক্তিগতভাবে হিন্দু, অসংখ্য পুজোর উদ্বোধনে যান। জনসভাতেও স্তোত্র পাঠ করে বলেন, যাঁরা নিজেদের হিন্দু–‌চ্যাম্পিয়ন বলেন, তাঁরা পারবেন?‌ দক্ষিণেশ্বরে স্কাইওয়াক কাদের জন্য করেন, মুসলিমদের?‌ কালীঘাট মন্দিরের আমূল সংস্কারের রূপরেখা কার নির্দেশে তৈরি হয়?‌ বাড়িতে কালীপুজো করেন। লুকিয়ে তো নয়। তিনি হিন্দু, এমন ‘‌হিন্দু’‌ যিনি সর্বধর্ম সমন্বয়ে বিশ্বাস করেন, চান যে, সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে থাকুন। ‘‌সংখ্যালঘু তোষণ’‌ কোথায় দেখছেন বিজেপি নেতারা?‌ দেখছেন না, বানাচ্ছেন। যাতে সাম্প্রদায়িক বিষ ঢুকিয়ে দেশটাকে, আমাদের রাজ্যটাকে তছনছ করে দেওয়া যায়। মমতা হতে দিচ্ছেন না, দেবেন না। তাই এত রাগ। উন্নয়নকে ঢেকে দিয়ে তোষণের মিথ্যা প্রচারের ঘৃণ্য রাজনীতি।
বহু ঘটনায় সংখ্যালঘু অভিযুক্তরা ধৃত। ধর্মীয় বাছবিচার নেই। এনআরএস–কাণ্ডে অভিযুক্তরা থাকেন সংখ্যালঘু–‌অধ্যুষিত পাড়ায়। গ্রেপ্তার করতে দ্বিধা করেননি। বাইক–‌সন্ত্রাসে জড়িত সব সম্প্রদায়ের মানুষ। যাঁরা সংখ্যালঘু, তাঁদের ছাড় দিচ্ছে না মমতা সরকার। একটা উদাহরণ দিতে পারেন, যেখানে অপরাধীরা মুসলিম বলে ক্ষমার চোখে দেখছে মমতার প্রশাসন?‌
প্রয়াত বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী তখন বিজেপি–‌র রাজ্য সভাপতি। হিন্দির কৃতী অধ্যাপক, ভদ্রলোক। তিনি একবার জ্যোতিবাবুকে বলেন, ‘‌আপনারা মুসলিমদের মাথায় তোলেন কেন?’‌‌ জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, ‘‌মাথায় তুলি না, আশ্বস্ত করি। নিরাপত্তা দিই। যে–‌কোনও দেশে প্রগতিশীলদের এটা দায়িত্ব।’‌ রাইটার্সে বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে বিষ্ণুকান্ত শাস্ত্রী কোনও কটু কথা বলেননি। ভদ্রলোক। আজকের বিজেপি নেতারা ‘‌ভদ্রলোক’‌ কথাটাকে নিন্দাবাচক মনে করেন। যিনি যত বিষাক্ত কথা বলবেন, তাঁর তত নম্বর।
এত বড় একটা ভোটপর্ব হয়ে গেল। শতাধিক জনসভা করলেন মমতা ব্যানার্জি। একটা, একটাও উদাহরণ দিতে পারেন, যেখানে মমতা সংখ্যালঘু–‌তোষণের পরিচয় দিয়েছেন?‌ নাকি, সব সভায়, হ্যাঁ, প্রত্যেক সভায় ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন?‌ সহ্য হচ্ছে না ওঁদের। ধাতে নেই। তার চেয়ে বড় কথা, বুঝলেও বলবেন না, তাহলে বিষ ছড়ানো যাবে না। 
সম্প্রীতি ও উন্নয়নকেই পাখির চোখ করেছেন মমতা ব্যানার্জি। ক্ষমতায় এসেই গোটা জঙ্গলমহলে উন্নয়নের জোয়ার এনেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে কি বেশি সংখ্যক মানুষ মুসলিম?‌ ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে অনেক কাজ করেছেন। পাহাড়বাসীর মধ্যে কতজন মুসলিম?‌ সব কিছুরই মূল সূত্র— উন্নয়ন। উত্তর দেবেন বিজেপি নেতারা?‌ যদি দেন, তা হবে মিথ্যার পাহাড়। ওঁরা তো  মিথ্যা ও বিষ দিয়েই ক্ষমতা দখলের মিনার বানাতে চাইছেন।
ওঁরা নিরুপায়। রাজ্যটাকে দখল করা চাই। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাকে উত্তরপ্রদেশ বানাতে চান। ধৈর্যও কম। ধৈর্য ধরলে হবে না। মোদি আছেন, অমিত শাহ আছেন, সব কেন্দ্রীয় সংস্থা বিজেপি–‌র প্রভাবে একপেশে, আছে সাইবার–‌সন্ত্রাস, এখন না ঝাঁপালে হয়! ঝাঁপান। অর্থ বিপুল, বিষ অফুরন্ত, কেন্দ্রীয় মদত, বাংলাকে বিচ্ছিরিভাবে উল্টে‌পাল্টে দিতে হবে। চেষ্টা করুন। কিন্তু পারবেন না। বিষাক্ত হাওয়া কেটে যাবে। বাংলা ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল থাকবে। সেই বাংলা, যে–‌বাংলার নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। ‌ 

জনপ্রিয়

Back To Top