দেবেশ রায় নেই। এ কেমন সত্য যে সত্যকে স্বীকার করতে ভয় হয়। দেবেশদা নেই, তাহলে স্নেহের হাতটি কে পিঠে রাখবেন? কে ফোন করে বলবেন, অমুক লেখককে চেনো, আমি তার একটা গল্প পড়লাম, কে বলো দেখি?  সম্বিতের গল্প পড়েছ? আশ্বিন কার্তিক মাস তিনি পড়েই যান শারদীয়, তাঁর অনুজপ্রতিম, সন্তানপ্রতিম লেখকদের লেখা পড়েই যাচ্ছেন রাত জেগে। ইদানীং রাতজাগা বারণ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সারাটা দিন তো রয়েছে। পড়েন তারপর নিজের প্রতিক্রিয়া পাঠাবেন দীর্ঘ এক মোবাইল মেসেজে। আগে ঘুম থেকে উঠে সেই ভোরে এক নবীন লেখক দেখতেন দেবেশবাবুর দীর্ঘ এক মেসেজ এসে বসে আছে। পাঠিয়েছেন রাত তিনটেয়। রাত তিনি জাগতেন বহুবছর ধরেই। লেখা এবং পড়া রাতেই করতেন। ইদানীং তা হত না। কিন্তু দেবেশ রায় সেই অভ্যাসেই ছিলেন।  ক্লান্তিহীন দেবেশ রায়। তাঁর বয়স যে ৮৪–‌৮৫ তা তাঁর কথা শুনলে বিশ্বাস হত না। কুড়ি তিরিশ বছর আগের দেবেশদা, এখনও সেই রকম ছিলেন। তিনি চলে গেলেন দুদিনের শারীরিক বিপর্যয়ে, অবিশ্বাস্য। অবিশ্বাস্য হতেই হবে কেন না এখনও, এই এত বয়সে তিনি যেভাবে ভাবতেন, তার কোনও বিকল্প দেখতে পাই না।
অবাক হওয়ারই কথা, তিনি এত বয়সেও কী ভাবে লেখেন, “সম্মুখ যুদ্ধগুলি গেরিলা যুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে”। সেই আখ্যানে প্রবেশ করতে করতে ক্রমশ  বুঝতে পারি, রাষ্ট্রই গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেছে এক ভয়ানক কেলেঙ্কারিকে চাপা দিতে। পড়তে পড়তে রাষ্ট্রের লুকনো দাঁত নখ দেখতে পাই। একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছে সেই কেলেঙ্কারিতে জড়িত ব্যক্তিরা। প্রমাণ লোপের জন্য তাদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তারা জড়িয়ে ছিল লেনদেনের এই ভয়াবহ কেলেঙ্কারির সঙ্গে। যে সাংবাদিক এই কেলেঙ্কারি নিয়ে এসেছিল লোকচক্ষে, একের পর এক নথি স্পেশ্যাল ইনভেস্টিগেশন টিমের কাছে জমা দিয়েছে, আরও দেবে, সে নিজেকে রাষ্ট্রের হাত থেকে রক্ষা করবে কী ভাবে রাষ্ট্রেরই নিরাপত্তা নিয়ে? বিচারপতি কি বিচারপতির বিরুদ্ধে যাবেন? জড়িয়ে গেছে যে মন্ত্রী, আমলা থেকে বিচারপতি, সকলের নাম। তাহলে বিচার পাবে কী করে সে? চিনতে পারি সেই ভয়ানক এই বাস্তবতা। কিন্তু তার অন্তর্নিহিত বাস্তবতাকেও উপলব্ধি করতে পারি এই আখ্যান পড়ে। গেরিলা যুদ্ধে নেমেছে রাষ্ট্র, সাংবাদিক হয়ে উঠেছে সকল তথ্য নিয়ে ক্ষমতাবান। সেই ক্ষমতাকে ভয় পাচ্ছে রাষ্ট্রশক্তি।  
দেবেশ রায়ের এই সমাজ এবং সাহিত্যের প্রতি সত্যনিষ্ঠা  আমাদের সাহস জোগায়। তাঁর এই নবীনতা, নতুন ভাবনা, তাঁর দার্শনিকতা আমাকে এখনও তাঁরই শিক্ষার্থী করে রেখেছিল। এই তো তাঁর বই নিয়ে বসে আছি। উপন্যাসের পাতা উল্টাচ্ছি। তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, তিস্তাপুরাণ, থেকে  টৌন জল্পেশগুড়ি.‌.‌.‌ যেখানে সূর্য রোজ দুদিক থেকে ওঠে.‌.‌.‌ ও তার লোকজন। সেবার যখন মৌসুমী বায়ু এসেছিল... তিস্তা পেরিয়ে তিনি নগরে এসে, নগর ভেদ করে যেভাবে ভারতবর্ষের দিকে যাত্রা করেছিলেন, তা সমকালীন ভারতীয় সাহিত্যে বিরল। হ্যাঁ, আমার ভাষায় দেবেশ রায় যে উপন্যাস লিখেছেন, যে মহাকাব্যিক বিস্তার তাঁর উপন্যাসে দেখেছি, তা এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে বিরল। মনে পড়ে  কবে প্রথম পড়েছিলাম সারস্বত লাইব্রেরি প্রকাশিত দেবেশ রায়ের গল্প। দুপুর, নিরস্ত্রীকরণ কেন, কলকাতা ও গোপাল, আহ্নিক গতি ও মাঝখানের দরজা, তারপর থেকে আমি ক্রমাগত দেবেশ রায়ে আবিষ্ট হয়েছি। এখন যেন মনে হয় সৃজন ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে তিনি চলে গেলেন। উপন্যাস আর গল্পের ভিতরে এত শাণিত করে ভাবতে পারেন তিনি, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার কথা ভাবেন তিনি, যে উদাহরণ আমাদের সাহিত্যে নেই। আমাদের সাহিত্যে দেবেশ রায় একক, তিনি আর কারওর মতো নন। তাঁর কোনও পূর্বসূরি আমি খুঁজে পাই না। দেবেশ রায় ৮৪–‌৮৫তে পৌঁছেও এই জীবন এই দেশ, এই সমাজকে যেন নতুন করে চিনতে চেয়েছিলেন। বলতে পারি এত বয়সেও আমার লেখক দেবেশ রায় হারিয়ে যাওয়া এক নদী খুঁজতে বেরিয়েছিলেন (নদী ও শহরের যুগলগীতি)। দেবেশ রায়ের উপন্যাসে ডুবে আমি টের পেয়েছি চারদিকে যেন নেমে এল অখণ্ড নীরবতা, তাকে আমি সাঙ্গীতিক স্তব্ধতা বলতে পারি। দেবেশ রায় পড়তে পড়তে তেমন মনে হয়। অনেকের সঙ্গে মিলবে না। কিন্তু আমার কথা যে সত্য তা আমি নদী ও শহরের যুগলবন্দি নামের পরপর এক উপন্যাসের অংশ পড়তে পড়তে টের পেয়েছি।  সেই কবে থেকে দেবেশ রায়কে পড়ছি। কিন্তু এখনও সেই পাঠ থেকে সরে আসার কারণ ঘটেনি। ভাবুন দেখি এই বয়সে তিনি আরবীয় পুরাণের ইউসুফ জুলেখার অমরকাহিনি নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন পরপর তিন বছর! সে তো দীর্ঘ এক কবিতা। সঙ্গীত। মরুভূমি, নদীর চর, সমুদ্র বালুকা পার হয়ে অন্বেষণের যে দীর্ঘ বৃত্তান্ত দেবেশ রায় লিখেছিলেন, তা আমি ভুলব না। নদীর চর পেরিয়ে জুলেখার স্বপ্নপুরুষ অন্বেষণের যে কথা তিনি লিখেছিলেন, তাও ছিল কবিতা। হ্যাঁ, এই কারণেই দেবেশ রায়কে আমি পড়ি। পড়তে পড়তে এখনও শিখি। লকডাউনের প্রথম দিকে এক বিকেলে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন?
তিনি বললেন, অমর আমার খুব ভয় করছে।
আমি বললাম, ভয় কেন দেবেশদা, আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস তত সক্রিয় হতে পারবে না। আমাদের ইমিউনিটি বেশি.‌.‌.‌ ইত্যাদি ইত্যাদি।
তিনি বললেন, তুমি নিশ্চিত?
মনে হয় তা, আপনি কি ইউসুফ জুলেখা শেষ করবেন এবার।
হ্যাঁ, শেষ করছিলাম, ২৬শে মার্চ আজকাল নিয়ে যাবে কথা ছিল, সব গোলমাল হয়ে গেল, ৪ তারিখে আমেদাবাদ যাব কথা ছিল।
এখনও জানি না ইউসুফ ও জুলেখা শেষ করেছেন কি না, অসম্পূর্ণ থাকল তিস্তাদেশ, নদী ও শহরের যুগলগীতি... কিন্তু যেটুকু লিখে গেছেন তাই সম্পদ।
আমি বলেছিলাম, কোভিড–‌১৯ এ ভয় নেই দেবেশদা। এখন, এই ভয়ানক গ্রীষ্মের দুপুরে যখন এই লেখা লিখছি, তখন সমরেশ রায় ফোনে বললেন, এগজামিন করতে গেছে লালারস, করোনা কি না। তাঁরা অপেক্ষা করছেন। তারপর সব ব্যবস্থা হবে অন্ত্যেষ্টির। আমি কি তাকে ভুল স্তোকবাক্যে ভোলাতে চেয়েছিলাম? সন্ধের পর খবর পেয়েছি, আমার কথা মিলেছে। দেবেশদার করোনা হয়নি।
দেবেশ রায়ের শহর জলপাইগুড়ি কিংবা জল্পেশগুড়ির তিস্তার ভিতরে দাঁড়িয়ে তিনিই আবিষ্কার করতে পারেন সেই শহরের দুই দিক থেকে সূর্য ওঠে। টৌন জলপাইগুড়ির একদিকের সূর্য নিভে গেল আচম্বিতে।  প্রণাম সেই নিভে যেতে থাকা সূর্যকে।  নিভে যাওয়া নক্ষত্রর আলো ফুরোতে কত শত আলোকবর্ষ লাগে আমরা কেউ জানি না।

জনপ্রিয়

Back To Top