বাহারউদ্দিন- আত্মকেন্দ্রিক আর ভোগবাদী সমাজ দেহপেশায় যুক্ত লক্ষ লক্ষ অসংগঠিত শ্রমিকের একাংশের নাম রেখেছে যৌনকর্মী। শ্রমজীবীদের খাতায় যাঁদের নাম নেই, সমাজ ও পরিবারে যাঁরা ব্রাত্য। রাষ্ট্রের তথাকথিত সম্ভ্রমবোধ, সোজা কথায় যাকে বলা উচিত ‘‌লজ্জা’‌— লজ্জাই তাঁদের ভোটাধিকার ও রেশন সরবরাহ ছাড়া প্রায় সব অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। যেমন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট করতে গেলে, কদাচিৎ কোনও কোনও সৌভাগ্যবতী ব্যাঙ্কের গ্রাহক হওয়ার সুযোগ পেলেও, ঋণ চাইলেও দেওয়া হয় না। খাদ্যের গণবণ্টন, জনশিক্ষা, জনস্বাস্থ্যের পরিষেবা ব্যবস্থা তাঁদের গোচরে কতটা পৌঁছয়, এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। লকডাউনের মুহূর্তে কোথাও কোথাও পশ্চিমবঙ্গ সরকার পাশে দাঁড়িয়েছে, সরকারি সরবরাহ হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য, তবুও সহনুভূতির নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা অস্বীকার করা অন্যায়।  
যে কোনও প্রাকৃতিক অথবা ম্যানমেড সঙ্কটে এসব মহিলার বেঁচে থাকার সমস্যা গুরুতর হয়ে ওঠে। অতিমারিতে তো আরও ভয়াবহ। করোনার দীর্ঘস্থায়ী আবহ, বিশেষ করে লকডাউন এঁদের লাগাতার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে প্রকটতর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে পাঠাল। সরকার চূড়ান্ত এসব প্রান্তজনের কথা ভাবতে কতটা অভ্যস্ত? যাঁরা দেশ–‌বিদেশ জুড়ে যে–‌সব ঘিঞ্জি, আলোহীন, অপরিচ্ছন্ন এলাকায় লকডাউনের বন্দিদশার ভেতরেও নিঃশব্দ বন্দিদশার শিকার হয়ে আছেন, তাঁদের আপাত নিষ্কৃতির রাস্তা কী? যে–‌সব এনজিও–‌কর্মী যৌনপল্লীতে কাজ করেন, তাঁদের বিত্ত আর চিত্ত, কতটা এঁদের এই মুহূর্তের গৃহহীন, রোজগারহীন, অন্নহীন দুর্বিষহ পরিস্থিতিকে স্পর্শ করার সুযোগ পাচ্ছে, তার ন্যূনতম খবর বাইরে বেরোচ্ছে না। আমরা অনেকেই উদাসীন। জনদরদি নেতৃত্বের মুখে কুলুপ। রাষ্ট্র এ পর্যন্ত এঁদের ব্যাপারে কোনও সহৃদয় মতামত পোষণ করেছে কি না, বলা যাচ্ছে না। উচ্ছিষ্ট খাবারের মতো কি আমরা সন্তান আর পরিবারের জন্য আত্মত্যাগী ও কণ্ঠহীন মহিলাদের রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলব? পরিযায়ী, স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা কথা বলছেন। প্রতিদিন তাঁদের মৃত্যু ও দুর্ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চাপে পড়ে রাষ্ট্র অসংগঠিত শ্রমিকদের কথা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু যৌনকর্মীদের ব্যাপারে রাষ্ট্রের বিধান কী? জানতে ইচ্ছে হয়, এঁদের কোন শ্রেণিতে চিহ্নিত করা হবে? বিনোদনকর্মী, না চিরায়ত দেহব্যবসার সুলভ পণ্য। বিষয়টি বিতর্কিত। পুরনো বিতর্ক উত্থাপনের সময় নয় এখন। যৌনকর্মীদের বহুতর সমস্যা নিয়ে লড়ছেন স্বেচ্ছাসেবী ‘‌দুর্বার’‌–‌এর ডাঃ স্মরজিৎ জানা। বিবেকবান মানুষ। পরিস্থিতি তাঁর কর্মস্থল আর মর্মস্থলের মধ্যে অবশ্যই সংযোগ তৈরি করেছে। স্মরজিৎ আর তাঁর সহযোগীদের হাহাকার আমরা অনুভব করছি। কিন্তু তাঁদের বিবেকের ডাক থেকে আমাদের নিরাপদ অবস্থানের দূরত্ব কতটা, তা পরখ করার প্রয়াস কোথায়?
হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুল এবং ইয়েলো স্কুল অফ মেডিসিনের একদল গবেষক সমীক্ষা চালিয়ে বলেছেন, লকডাউন তুলে দেওয়ার পর ভারতের ‘‌রেড লাইট’‌ এলাকাগুলিতে করোনার সংক্রামণ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এঁদের উদ্বেগ অহেতুক নয়। যৌনপল্লীর জনবিন্যাস, গৃহবিন্যাস, প্রতিদিন অচেনা খদ্দেরের আনাগোনা, অশালীনতা, ঠাসাঠাসি কুরুচির হামলা— এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত বহু অভ্যাস নিগৃহীত মহিলা ও তাঁদের সন্তানদের বড় রকমের বিপদ ডেকে আনবে। গবেষকরা তথ্য ও পরিসংখ্যান পেশ করে পরামর্শ দিয়েছেন যে, লকডাউন প্রত্যাহারের ১২ দিনের মধ্যে মুম্বইয়ে, ১৭ দিন অন্তর নয়াদিল্লিতে, ২৯ দিনের দূরত্বে পুনেতে, ৩০ দিন পর থেকে নাগপুরে এবং ৩৬ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর কলকাতায়— কোভিড–‌১৯ রেডলাইট এলাকাগুলিতে প্রকট হয়ে উঠবে। অতএব, সংক্রমক ব্যাধিটি রুখতে ব্যাপক প্রস্তুতি দরকার। প্রয়োজন দেহব্যবসায় আপাতকালীন নিষেধাজ্ঞা। এরকম বিধিনিষেধ চালু হলে, মুম্বইয়ে (শতকরা) ২১, পুনেতে ২৭, নয়াদিল্লিতে ৩১, নাগপুরে ৫৬, কলকাতায় ৬৬ শতাংশ সংক্রমণ ৪৫ দিনের মধ্যে কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, দেহজীবীদের এলাকায় লকডাউন, অতিরিক্ত ৬০ দিন চালু থাকলে ভারতের জনবহুল  ও শিল্পপ্রধান শহরগুলিতে করোনাজাত মৃত্যুর হার ৬৩ শতাংশ হ্রাস পাবে। হ্রাসের তালিকার শীর্ষে থাকবে কলকাতা, শতকরা ৬৬। তারপর নাগপুরে ৬১, পুনেতে ৪৩, দিল্লিতে ৩৮, মুম্বইয়ে ২৮ শতাংশ অতিমারিতে মৃত্যু কমবে। 
আক্রান্ত এক বা দু’‌জনকে সংক্রমিত করতে পারেন, এই হিসেব করেই গবেষকরা মৃত্যু ও সংক্রমণের হার নির্ণয় করেছেন। এই পরিসংখ্যান কতটা নির্ভুল, কতটা বাস্তব হতে পারে, বলা দুঃসাধ্য। কেন না সংক্রমণের পরিধি ও পরিস্থিতি প্রতিদিন বদলাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, রেডলাইট এলাকার তথ্য সহজে সামনে আসে না। ঢাকা পড়ে যায় আড়ালে। 
ন্যাশনাল এইডস নিয়ন্ত্রক সংগঠনের (এনএসিও) হিসেব, ভারতে যৌনকর্মীদের সংখ্যা ৬,৩৭,৫০০। প্রতিদিন গড়ে লাখ লাখ কাস্টমার নিষিদ্ধপল্লীতে আসা–‌যাওয়া করেন। এদের বড় অংশ অস্থায়ী। পরিযায়ী। কাস্টমার ছাড়াও যৌন এলাকায় ছড়িয়ে থাকে দালাল, নেশাখোর আর দেহলোভী নষ্ট–‌ভ্রষ্টরা। এদের নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর। এরা শোষণ, কেবল শোষণ করতে অভ্যস্ত। যাঁরা কান্না আর খিদের শরীর নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায়, গলিতে দাঁড়িয়ে  থাকেন; কান্নার শরীর নিয়ে শেষ রাতে ঘুমোতে যান, ঘুমিয়েও যাঁদের রেহাই মেলে না, প্রেমের অভিনয় করতে করতে যাঁদের যাপনের সব রেশ, সব মেজাজ নিঃশেষিত হয়ে যায়, তাঁদের রক্ষকরাই হামেশা তাঁদের ভক্ষক। বেঁচে থাকার সব রস নিংড়ে নিয়ে যাঁদের পারিবারিক সদস্যরা, এমনকী মা–‌বাবাও মুখ ফিরিয়ে নেন, তাঁদের করুণ হালহকিকত নিয়ে এমনিতেই সমাজ ভাবে না। সঙ্কটকালে ভাববে? এরকম দুরাশা অতিশয় দূরঅস্ত।
এইসব ভাগ্যহত, প্রেম ও সহমর্মিতা থেকে বঞ্চিত মহিলাদের সংস্পর্শে করোনার সংক্রমণ বাড়তে পারে, তাঁদের সংস্পর্শ বাড়াতে পারে মৃত্যু, এসব ব্যাপারে হার্ভার্ড আর ইয়ালে স্কুল অফ মেডিসিনের বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা আর পরামর্শকে হেয় করছি না। করা উচিত নয়। তবু প্রশ্ন তুলছি, লকডাউন প্রত্যাহারের পর ছায়াহীন, দুঃস্থ, সবচেয়ে বঞ্চিত, সব চেয়ে অবহেলিত রুদ্ধ গলির মহিলাদের, তাঁদের সন্তান–‌সন্ততিদের অন্ন জোগাবে কে? এই দায় কি শুধু আত্মরক্ষার্থক রাষ্ট্রের? দায়িত্ব নেই সমাজের? পোশাকি সম্মান আর সম্ভ্রমের আড়ালে লুকিয়ে রাখা ব্যবহৃত নারীসত্তার কঠিনতম সঙ্কটে পাশে দাঁড়াবে না আমাদের পৌরুষ? আমাদের দুঃসাহসী নারীত্ব?
দেশের সবচেয়ে ‘‌রেড ‌লাইট সিটি’‌ সোনাগাছি ছাড়াও কলকাতায় বৌবাজার ও ওয়াটগঞ্জে, গোপনে আরও কয়েকটি এলাকায় যৌনকর্মীরা ছড়িয়ে আছেন। সোনাগাছিতে, এঁদের সংখ্যা কয়েক হাজার। বহু মহিলা প্রতিদিন ট্রেনে–‌বাসে বাইরে থেকে আসেন। রাতে বাড়ি ফিরে যান। এসব মহিলার সংখ্যা কত, তথ্য অজ্ঞাত। বিশ শতকের গোড়ায় সোনাগাছি এলাকার দৈনিক টার্নওভার ছিল ১ কোটি টাকা। বিশ বছরে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু গরিব যৌনকর্মীদের ভাগ্য আগের মতোই অপ্রসন্ন। যাপন বিষও বিষাদগ্রস্ত। পাঁচ দফার লকডাউনে তাঁরা দিশেহারা। ঘরে খাবার নেই। বাইরে খদ্দের নেই। লুকিয়ে–‌চুপিয়ে কেউ কেউ আসে। কিন্তু ‘‌ভোগ্যবস্তুর’‌ খরচ জোগানোর দায় কি নেয় পলায়নবাদী নৃশংস? নেয় না। নিচ্ছে না। বাধ্য হয়ে মহিলাদের রাস্তায় বেরিয়ে আসতে হচ্ছে। এটাও এক গুরুতর শঙ্কার বিষয়। কেন না, সংক্রমণ ঢুকছে। গুজব আর দুঃসংবাদ উড়ছে। অবসাদ আর হতাশা ঘেরাও করছে প্রান্তিক, পীড়িত নারী জীবনকে। এখানে সরকার আর দু’‌একটি এনজিও–‌ই ভরসা। এঁদের নগদ টাকার দরকার। দরকার রেশনের সহজলভ্য বণ্টন। দায়িত্ব নেবে কে? এটা শুধু সজল প্রশ্ন নয়, বিবেকের অশ্রুত আর্তনাদও বটে।  

‌‌চিত্রণ: অর্ঘ্য চৌধুরি

জনপ্রিয়

Back To Top