প্রচেত গুপ্ত‌

করোনাকালে মেয়েদের জয়জয়কার দেখছি।
কথাটা শুনতে কেমন লাগছে?‌‌ মনে হয়, একথা শুনে বেশিরভাগ পাঠকই আমাকে মারতে আসবেন। বলবেন, হয় মাথায় জট পাকিয়ে লজিক গোলমাল করছে, নয় রসিকতা করছে।
করোনার সময় নারী–‌পুরুষ নির্বিশেষে মানুষের দুঃখ দুর্দশার শেষ নেই। জয় কোথায়?‌ সবটাই তো পরাজয়। জীবন চলে যাচ্ছে, কাজ চলে যাচ্ছে। এখন তো শুধু দুশ্চিন্তা, অবসাদের সময়। সমস্যার শেষ নেই।
তাহলে?‌‌ হ্যঁা, তারপরেও বলব করোনার দুঃসময়কে যেমন মনে রাখতে হবে, তেমন এই সময় মেয়েদের জয়কেও মনে রাখতে হবে। ইতিহাসে অন্ধকার এবং আলো দুটোই লেখা থাকবে। দুঃসময়ের আলো।
আজ মেয়েদের জয়ের কথা বলব।
‘‌অর্টেমিস’‌। এটা কী?‌ আগামী চন্দ্রাভিযানের নাম। এই অভিযান হবে ২০২৪ সালে। মার্কিন গবেষণা সংস্থা নাসা ফের মানুষকে পাঠাবে চঁাদে। ১৯৬৯ সাল থেকে চঁাদে মানুষের পা পড়ছে। মোট ১২ জন পুরুষ নভশ্চর এখন পর্যন্ত সেখানে গিয়েছেন। এবার তিনজনের টিমে একজন মহিলা নভশ্চরও থাকছেন। এই প্রথম। নাসা এই ঘোষণা করল সেদিন। এই করোনাকালেই। পৃথিবীর জন্য এর থেকে বড় সুখবর, গর্বের খবর আর কী রয়েছে?‌ মেয়েরা যে ছেলেদের থেকে একবিন্দু পিছিয়ে নেই, এই ঘোষণা, তা খুব বড় ভাবে আরও একবার প্রমাণ করল।  কেউ বলতে পারেন এর সঙ্গে করোনাকালের কী সম্পর্ক?‌ করোনা না হলে কি এই মহিলা নভশ্চর চঁাদে যেতেন না?‌ অবশ্যই যেতেন। আমি বলতে চাইছি, ঘোষণার সময়কালটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে যখন পৃথিবীর ইতিহাস লেখা হবে, সভ্যতার ইতিহাস লেখা হবে তখন সেখানে নিশ্চয় থাকবে, শুধু পরাজয় নয়, শুধু কান্না নয়, শুধু পিছিয়ে পড়া নয়, অতিমারীর এই ভয়ঙ্কর সময় জয়ের খবর, সভ্যতার খবরও মানুষ তৈরি করেছে।
এবার আসি দেশের কথায়।
করোনাকালেই আমাদের দেশের সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই প্রথম যুদ্ধজাহাজে সরাসরি যুক্ত হবেন দুই মহিলা অফিসার। এতদিন মহিলা নৌ সেনা অফিসাররা জাহাজে থাকতেন না, শুধু পুরুষরাই থাকতেন। এবার কুমুদিনী ত্যাগী এবং রিতি সিং নামের দুই বীর সেনানীও থাকবেন যুদ্ধ জাহাজে। হেলিকপ্টার চালাবেন। এ ঘটনাকে জয় ছাড়া কী বলব?‌ আর কোন সময় এই সিদ্ধান্ত জানলাম?‌ করোনা যখন সব সুখবর কেড়ে নিতে চায়। দুই অফিসারকে কুর্নিশ। আপনারা আরও একবার প্রমাণ করলেন, মেয়েরাও সব পারে।
আবার সেনাবাহিনীর উদাহরণে ফিরি।
সেদিন জানা গিয়েছে, বারাণসীর শিবাঙ্গি সিং, দেশের প্রথম মহিলা, যিনি যুদ্ধবিমান চালাবেন। চালাবেন রাফাল। ভাবা যায়!‌ এটা মেয়েদের জয় নয়?‌
চঁাদে যাওয়া, সেনাবাহিনীতে কঠিন দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে আনন্দ হচ্ছে বেশি। যারা মনে করেন, নারী সন্তান গর্ভে এলে গর্ভপাত, নারী মানে আতুপুতু, নারী মানে নরমসরম, নারী মানে শুধু রান্নাঘর, নারী মানে শরীরে কম শক্তি তাই পুরুষ নির্ভর,— তাদের মুখে এই জয় হল থাপ্পড়। আলতো থাপ্পড় নয়, কষিয়ে থাপ্পড়।
এবার আমাদের মতো ঘরের মেয়েদের জয়ের কথা।
কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়েদের কথা। কেন তাদের বাছলাম? দেখছি, এই ভয়ঙ্কর করোনাকালে কম বয়সি মেয়েদের নিয়ে চর্চা বেশি হচ্ছে। তবে চর্চার বিষয় ‘‌মাদক’‌। মাদক কে দিল, কে খেল, কে নিল। ‘‌করোনা ও মাদক সেবন’‌ নিয়ে পরে কেউ গবেষণা করতেও পারেন, আমি বরং একটু অন্যদিকে তাকাই। ‌
ছাত্রীরা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারছে না। ঘরে বন্দি। যাদের সঙ্গতি রয়েছে মোবাইল, ল্যাপটপ ব্যবহার করছে। না, শুধু সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, ফ্যাশন, সোশ্যাল নেট ওয়ার্কে চ্যাট নয়, আমি এমন অনেক ছাত্রীকে জানি, যারা করোনার চোখরাঙানিকে হারিয়ে নিজেদের নানা বিষয়ে পারদর্শী করে তুলছে। ইন্টারনেটে নানা বিষয়ে কোর্স করছে। ভাষা শিখছে। যাবতীয় জড়তা কাটিয়ে যোগ দিচ্ছে  কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবিনারে। করোনা না থাকলে এই সুযোগ হত কি?‌ এত তাড়াতাড়ি, এত অল্প বয়েসে দেশের বিভিন্ন নামকরা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কথা বলবার সুযোগ কে দিত?‌ বাড়ি থেকে যেতে দিত? সে খরচই বা কে দিত?‌‌ বিজ্ঞান পড়া তৃতীয়বর্ষের ছাত্রীটি  কলকাতায় বসে অনায়াসে যোগ দিচ্ছে চেন্নাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনায়। যতটুক পারছে বলছে। মনে জোর এবং শিক্ষা দুটোই বাড়াচ্ছে।
এটা মেয়েদের জয় ‌নয়?‌ অবশ্যই জয়। তারা করোনাকালকে কাজে লাগাচ্ছে। ছাত্ররাও কি এই জয়ের অংশীদার হচ্ছে না?‌ হচ্ছে বৈকি। কিন্তু আজ আমাদের মেয়েদের নিয়ে কথা। আমরা চাইব যাদের মোবাইল, ল্যাপটপ, ইন্টারনেটের সুযোগ নেই, সঙ্গতি নেই তাদের কাছেও সুযোগ পৌঁছোক। আমার স্থির বিশ্বাস, পৌঁছোবে।
আর একটা ছোট জয়ের কথা বলি।
সেদিন বালুরঘাটের শুভ্রদীপের কাছ থেকে হোয়াটস্‌অ্যাপে ভেসে এল এক শারদীয়া পত্রিকার খবর। শারদীয়া পত্রিকা তো অনেকই হচ্ছে। করোনাকাল বলে হচ্ছে ডিজিটাল। ই–‌‌ম্যাগাজিন। এই পত্রিকাটি দেখলাম এবার ই–‌‌ম্যাগাজিন। কিন্তু সে আলাদা করে নজর কাড়ল। বিজ্ঞাপন দেখে থমকে গেলাম। পত্রিকায় শুধুই নাকি ছোটদের লেখা আর ছোটদের অঁাকা ছবি থাকবে। বড়দের নো এন্ট্রি। চমৎকার ভাবনা। আসানসোল থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকার নাম, ‘‌আবার ক্ষীরের পুতুল’‌। কিন্তু এর সঙ্গে মেয়েদের জয়ের কী সম্পর্ক? আছে। বিজ্ঞাপনেই দেখলাম‌, পত্রিকার সম্পাদকের নাম মুনমুন দাশগুপ্ত। করোনার দুঃসময়ে এই অভিনব কাজটি করে  মহিলা সম্পাদক কি একটুও জয়ের আলো জ্বালাতে চাইছেন না?‌ অবশ্যই চাইছেন।
করোনার সময় মেয়েদের এই জয়জয়কার সভ্যতার মুখে হাসি ফোটায়। যারা নারীর ওপর অত্যাচার নিয়ে সদা মুখরিত, আলোড়িত হন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলেন, পাতার পর পাতা লেখেন, হাতে মোমবাতি নিয়ে মিছিল করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টের পর পোস্ট দেন, তারা কেন নারীর এই জয়জয়কার নিয়ে উচ্ছ্বসিত হবেন না?‌ কেন একটু লিখবেন না? কেন একটু বলবেন না?‌‌ কেন মুখে মাস্ক পরে মশাল হাতে একটা জয়ের মিছিল হবে না?‌ ‘‌নারীর ‌জয়’‌ কি ‘‌নারীবাদ’–‌এর মধ্যে‌ পড়ে না? শুধু অপমানই পড়ে?‌‌
জানি না। তবে আমার সেরকম একটা মিছিলের কথা ভাবতে ভাল লাগে। কল্পনা করি, সেই মিছিল দেখবে পথ চলতি কোনও ছোট মেয়ে। দরিদ্র বলে তার ফ্রক হবে মলিন। কিন্তু ধুলোমাখা মুখটি একেবারে রাজকন্যার মতো সুন্দর। মিছিল দেখে সে তার মায়ের হাত চেপে ধরবে।
‘‌মা, আবার আমাদের কষ্ট?‌ আবার অপমান?‌ তাই সবাই হাঁটছে?‌ যেমন আগেও দেখেছি?‌’‌
মেয়েটির মা চোখের জল লুকিয়ে বলবে, ‘‌না সোনা, কষ্ট নয়, এই মিছিল আমাদের জেতার জন্য।’‌
মেয়েটি কঁাপা গলায় বলবে, ‘আমরা কী জিতেছি মা?‌’‌
মেয়েটির মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলবে, ‘‌মা গো, আমরা আমাদের কষ্ট, অপমান আর ভয় জিতেছি।’‌
পথের রাজকন্যা তার চকচকে চোখ তুলে বলবে, ‘‌মা, তুমি কি কঁাদছ?‌’‌
মেয়েটির মা হেসে বলবে, ‘‌অবশ্যই কঁাদছি। আনন্দে কঁাদছি। জেতার আনন্দে।’‌
পথের রাজকন্যা বলবে, ‘‌মা, আমরাও কি ওই মিছিলে হঁাটতে পারি?‌ ওরা কি আমাদের নেবে?‌’‌
মেয়েটির মা বলবে, ‘‌অবশ্যই নেবে। চল।’‌
পাঠক, এরকম একটা মিছিলের স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে না?‌  

জনপ্রিয়

Back To Top