প্রদীপকুমার দত্ত- সম্প্রতি সেন্ট্রাল অ্যাডভাইসরি বোর্ড অফ এডুকেশনের বৈঠকে কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণমন্ত্রী মানেকা গান্ধী প্রস্তাব করেছেন, পড়ুয়াদের মধ্যে সহিষ্ণুতা বাড়াতে স্কুলে স্কুলে আবার ধর্মীয় নীতিশিক্ষা চালু করা হোক, যাতে এক ধর্মের পড়ুয়ারা অন্য ধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবে। এতে পড়ুয়ারা একে–‌অন্য ধর্মের প্রতি সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল হবে। সে জন্য নীতিশিক্ষার নামে জন্য ধর্মভিত্তিক সব বই স্কুলগুলিতে পড়ানো দরকার। বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার সবচেয়ে বেশি ধর্মের কথা বলে, প্রবল ভাবে ধর্মের চর্চা করে। কিন্তু তাদের মধ্যে সহিষ্ণুতা কোথায় ? তাদের আচরণ কি আদৌ অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল? তারা কি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে না, সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে না? গো রক্ষার নামে মুসলমান ও দলিতদের ওপর নানা ভাবে আক্রমণ করছে না?‌ এমনকী তাদের হত্যা পর্যন্ত করছে না? তারা যুক্তিবাদী মানসিকতার মানুষদের এবং যাঁরা তাদের উগ্র হিন্দুত্ববাদী উন্মত্ততার বিরোধিতা করছেন তেমন লেখক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকদের হত্যা পর্যন্ত করছে। এমনকী কে ‌কী খাবে সে বিষয়ে ফতোয়া দিচ্ছে। বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দ ও সাংসদ থেকে শুরু করে নানা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে চলেছেন উগ্র বিদ্বেষের বিষ ফেনিয়ে তুলতে। এমনকী একটা সিনেমার মুক্তি নিয়েও তারা হাঙ্গামা করছে, স্কুল বাসও তাদের আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বিজেপি পরিচালিত সরকারগুলি এই হাঙ্গামা দমনে কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। তবে শুধু হিন্দু মৌলবাদীরা নয়, যারাই ধর্মীয় মৌলবাদের চর্চা করে, তারাও অসহিষ্ণুতার জন্য দায়ী। যেমন মুসলিম মৌলবাদীরা ধর্মের নামে মানুষের শিরশ্ছেদ করে তার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মের চর্চা বা ধর্মশিক্ষার সঙ্গে সহিষ্ণুতার কোনও সম্পর্ক নেই। এর সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্ন জড়িত।  
 কংগ্রেস–‌সহ অন্য দলগুলিও, যারা বিভিন্ন সময় কেন্দ্রে ও বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতাসীন আছে বা ছিল, তারাও কোথাও উগ্র ভাবে আবার কোথাও প্রচ্ছন্ন ভাবে ধর্মকে ভোটের স্বার্থে কাজে লাগায়। অর্থাৎ দেশে অসহিষ্ণুতার পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার জন্য দায়ী ভোটবাজ দলগুলি, আর তার মধ্যে প্রধান ভূমিকা মানেকা গান্ধীর দলের। আর একেই অজুহাত করে তিনি স্কুলে ধর্মীয় নীতিশিক্ষা চালু করার প্রস্তাব করছেন। এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় চিন্তাভাবনাগুলিকে আমদানি করতে চেষ্টা করেছে; রামায়ণ, মহাভারত, গীতা ও অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ পড়ানোর প্রস্তাব করেছে। তার জন্য তাদের প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। আর তাই কি এখন তিনি ‘ধর্মভিত্তিক সব বই’ পড়ানোর কথা বলছেন? কিন্তু ভারতের সংবিধান অনুযায়ী ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। তাই স্কুলে ধর্মশিক্ষা দেওয়ার তাঁর এই প্রস্তাব সংবিধান বিরোধী নয় কি? 
ছাত্রছাত্রী ও যুব সমাজের মধ্যে নীতি–নৈতিকতার অধঃপতন দেখে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব করা হয়েছিল স্কুলে নীতিশিক্ষা দেওয়ার জন্য ধর্মগ্রন্থ পড়ানো হোক। অতীতে এক সময় ধর্ম মানুষকে মুক্তির পথ দেখালেও, আজ তা শাসকশ্রেণীর হাতে তাদের শাসন এবং শোষণ টিকিয়ে রাখার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ধর্মশিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ আজ আর মানুষকে পথ দেখাতে পারে না, মানুষকে উন্নত নীতি–নৈতিকতার সন্ধান দিতে পারে না। তাই রামমোহন, বিদ্যাসাগর প্রমুখ ভারতীয় নবজাগরণের মনীষী ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শিক্ষা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। ধর্মবিশ্বাসী না হয়েও যে অত্যন্ত উচ্চ মূল্যবোধের অধিকারী হওয়া যায়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ আমাদের দেশে বিদ্যাসাগর। তা ছাড়া শহিদ ভগৎ সিং, শরৎচন্দ্রও ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন না। অথচ এঁরা উচ্চ মূল্যবোধের অধিকারী ছিলেন। শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, সব ধর্মই মিথ্যা, আদিম দিনের কুসংস্কার। একজন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হয়েও বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, সাংখ্য ও বেদান্ত ভ্রান্ত দর্শন। তিনি আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভাষা শিক্ষা, গণিত, বিজ্ঞান ও ইউরোপীয় বস্তুবাদী দর্শন শিক্ষার ওপর জোর দেন।  ছাত্রদের জন্য বিদ্যাসাগর অনেকগুলি বই লিখেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হল চরিতাবলী। এতে ছিল কয়েকজন বিজ্ঞানী ও মনীষীর জীবনচরিত। এই বইয়ে একজনও ধর্মীয় মানুষের জীবনী ছিল না । ছাত্রদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি রচনা করেছিলেন কথামালা। এতে গল্পের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হত।  তাঁর রচিত  ‘বর্ণ পরিচয়’ ও ‘বোধোদয়’–এ ঈশ্বর প্রসঙ্গে কোনও উল্লেখ না থাকায় মিশনারি জন মার্ডক তাঁর রিপোর্টে মিশনারি স্কুলের পাঠ্য থেকে এই দুটি বই বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। ‘বোধোদয়’ সম্বন্ধে তিনি বলেন, ‘এটি ইংল্যান্ডের Rudiments of Knowledge অবলম্বনে রচিত। কিন্তু এই বইয়ে পরলোকের উল্লেখ আছে এমন অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ঈশ্বরের পূজার নির্দেশ ছেঁটে বাদ দিয়েছেন; তাঁর নীতিশিক্ষায় ঈশ্বরের অভিপ্রায়ের কোন উল্লেখ নেই, এটা চূড়ান্ত বস্তুবাদের শিক্ষা দেবে।’ পরবর্তী সংস্করণে বিদ্যাসাগর  ছ’‌টি বাক্যে ঈশ্বর সম্বন্ধে একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করেন, যা থেকে ঈশ্বরে ভক্তি জাগ্রত হয় না। তাই স্কুলে ধর্মীয় নীতিশিক্ষা দেওয়া বিদ্যাসাগরের শিক্ষা-চিন্তার বিরোধী। 
বিজেপি–‌র একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যখন স্কুলে ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেন, তখন তার উদ্দেশ্য ধর্মীয় শিক্ষার নামে হিন্দুত্ববাদী চিন্তার প্রসার ঘটানো, ধর্মীয় অন্ধতা সৃষ্টি করা এবং ধর্মের নামে আরও বিভাজন সৃষ্টি করা, এ সন্দেহ কি অমূলক? কারণ আগেই বলা হয়েছে, ধর্মীয় মূল্যবোধ আজ আর প্রকৃত মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পারে না, অসহিষ্ণুতা দূর করতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শিক্ষা।   

লেখক প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান 
 

জনপ্রিয়

Back To Top