আফরোজা খাতুন: তিন তালাক রদ আইনে কী সুবিধা পেল মুসলিম মেয়েরা তার দিকেই আলোকপাত করতে চাইছি। তাৎক্ষণিক তিন তালাক রদ আইন তৈরির দৃঢ পদক্ষেপের প্রশংসা করছেন অনেকেই। অবশ্যই দৃঢ় পদক্ষেপ প্রশংসনীয় হয় যদি সেখানে মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। তাৎক্ষণিক তিন তালাক শুধু নয়, মৌখিক তালাকের বিরুদ্ধেই এদেশের অধিকার আন্দোলনের কর্মীরা দীর্ঘদিন সরব হয়েছেন। আন্দোলনটা চলছে লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে। মুসলিম পুরুষরা জন্মসূত্রেই তালাক দেওয়ার অধিকার অর্জন করে। সেখানে তালাক দেওয়ার ধর্মীয় বিধানে যতই কঠোর নিয়ম থাকুক না কেন, ক্ষমতা ভোগ করে পুরুষরাই। মুসলিম মেয়েদের সেই অধিকার নেই। ক্ষমতা অর্জন করতে হয় বিয়ের সময় কাবিলনামায় লেখাপড়া করে। কিন্তু সেটাও শুধু স্বামীর কাছ থেকে তালাক চাইবার অধিকার অর্জন, নিজের মুখে তালাক প্রয়োগ করার নয়। আর তাই তাৎক্ষণিক তিন তালাককে দেশের উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা করার পর অপেক্ষা ছিল সম–‌অধিকারের আইন।  যদি দুটি মানুষ একসঙ্গে থাকতে না পারে তাহলে আলাদা হবে, বিচ্ছেদ নেবে এটা যুক্তিসঙ্গত। মুসলিমদের বিয়ে হবে ছেলে–‌মেয়ের মত নিয়ে, চুক্তিভিত্তিক। বিয়ের বেলায়  সম–‌অধিকার কিন্তু বিবাহ–‌বিচ্ছেদে যেন প্রভুর হুঙ্কার, পিতৃতন্ত্রের দাপট। দাপট–‌মুক্তির আইন, লিঙ্গ সাম্যের আইনের আবেদন ছিল সরকারের কাছে। কিন্তু কী পেলাম? রাষ্ট্রশক্তি মুসলিম মেয়েদের নিয়ন্ত্রণে রেখে, মুসলিম পুরুষদের ক্রিমিন্যাল তকমা আঁটার প্যাঁচ কষা আইন ঘোষণা করল।  বিভাজন আর পিতৃতান্ত্রিকতার আধিপত্যে রচিত হল তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিল। ভারতের উচ্চ আদালত যে তালাককে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে, সরকারের ক্যারিশমার জোরে, আইনের ফেরে সেই তালাক মুসলিম পরিবার ভাঙনের কাজে লাগবে।    
তালাক বা মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদের কোনও সরকারি তথ্য পাওয়া যায় না। যেহেতু বিষয়টা মৌখিক। তাই পরিসংখ্যানের ব্যাপারটাও অভিজ্ঞতা সাপেক্ষ। মুসলিম মেয়েদের লিঙ্গ সাম্যের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে কয়েকটি কেস তো এসেছে, যাঁরা তালাক নিতে চান। অথচ মেয়ে বলে বিষয়টা থানা–‌পুলিশ গড়াল। ২০১১ সাল, ডায়মন্ড হারবারের এক উচ্চশিক্ষিত মেয়ে মেসেজ করলেন। তাঁকে সাহায্য করতে হবে। স্বামীর কাছ থেকে তালাক  নিয়ে বেরিয়ে আসতে চান। অত্যাচারী স্বামীর সঙ্গে জীবন কাটানোর রুচি তাঁর নেই। কিন্তু স্বামী তালাক দেবেন না। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যে স্বামীর বাড়ি তাঁর বাড়ির থেকে অনেক উচ্চে। তাই বাবা–‌মাও তালাক নিতে দিলেন না। মেয়েদের মেনে নিতে হয় এই জাতীয় উপদেশ দিলেন। কোনও মৌলবির কাছে আবেদন জানিয়ে স্বামীর মুখ থেকে তালাক বলিয়ে নিতে চাইছিলেন। সেটাও সম্ভব হয়নি। তালাক চাওয়ার অনেক কারণ মেয়েদের দর্শাতে হয়। তিনি নজরবন্দি অবস্থান থেকে বেরিয়ে এলেন প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কমিশনের সহযোগিতা কিছুটা রক্ষাকবচ হল তাঁর। সিদ্ধান্ত নিলেন, স্বামীকে দিয়ে তালাক বলানোর জন্য হাত জোড় করবেন না।  ২০১৮ সাল। ততদিনে তাৎক্ষণিক তিন তালাককে অবৈধ ঘোষণা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। ঝাড়খণ্ড থেকে ফোন এল। ইংরেজি সাহিত্যে এম এ পাস এক মেয়ে।  স্বামী চিঠিতে তালাক দিয়েছে। তাঁদের বনিবনাও হচ্ছিল না। ফলে, তালাক নিতে তাঁর আপত্তি নেই। কিন্তু গন্ডগোলটা অন্য জায়গায়। তাই পরামর্শ দরকার। তাঁর গ্রাম ফতোয়া দিয়েছে, এই তালাক হয়নি। অন্য কোথাও আবার বিয়ে করতে চাইলে নিয়ম মেনে আগে তালাক নিতে হবে। স্বামী বলেছেন আর নিয়ম মানতে পারব না। যেভাবে তালাক দিয়েছেন সেটাই বিবাহ–‌বিচ্ছেদ বলে মানতে হবে। স্বামী অন্যত্র বিয়েও করবেন জানিয়েছেন। তালাক হওয়া না হওয়ার ওপর মুসলিম পুরুষের বিয়ে আটকাবে না। স্বামীর গ্রামের মৌলবিও ফতোয়া দিলেন, চিঠিতে দিলেও তালাক হয়েছে। দুই গ্রামের দুরকম মত। কিন্তু নিজের গ্রামের কথা মেনেই কাজ করতে হবে। তাই মেয়ের বাড়ি টাকা খরচ করে কোন এক রাজনৈতিক দলের লোকজনের সাহায্য নিয়ে ছেলেকে বাধ্য করলেন মেয়ের গ্রামের ব্যবস্থা মতো তালাক দেওয়াতে। এই লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা দরকার নয় কি? 
অনেক সময় দেখা গেছে রাগের মুহূর্তে তালাক বলে ফেলা কোনও স্বামী এবং তালাক মানতে বাধ্য হওয়া স্ত্রী উভয়েই সমস্যায় পড়ছেন। এটা আর তখন রাগারাগি মুহূর্তের শব্দ  থাকে না। ঝগড়া থেমে গেলেও তাঁদের জীবন এক ছাদের তলায় রাখার অনুমতি হারায়। নিকাহ হালালার মতো পাশবিক নিয়ম পালনের মধ্য দিয়ে মেয়েটিকে পূর্ব স্বামীর জন্য শুদ্ধ করা হয়। তাৎক্ষণিক তিন তালাক অবৈধ এই রায়কে তাই দেশের অধিকাংশ মানুষ স্বাগত জানিয়েছিলেন। মুসলিম তালাক বিলও তাৎক্ষণিক তিন তালাককে অকার্যকর বলছে। কিন্তু জটিল করে তুলেছে একে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। স্বামীর তিন বছর পর্যন্ত জেল, জরিমানা হল। তারপর? তালাক তো হল না। স্বামী জেল থেকে বেরিয়ে আর একটা বিয়ে করলে? স্ত্রী কিন্তু আর বিয়ে করতে পারবে না বৈধ তালাক না পাওয়া পর্যন্ত। সেই স্বামীকেই বলতে হবে তালাককে বৈধ করার জন্য। অথবা ধর্ম গুরুরা ফতোয়া দিলেন, একসঙ্গে থাকতে গেলে নিকাহ হালালা পালন করতে হবে। তখন? কী অধিকার হাতে পেল মুসলিম মেয়েরা? যে তালাক বৈধ নয়, তা তো মানার প্রশ্নই ছিল না। তবু ঘর ছাড়া করতে চাইলে গার্হস্থ্য হিংসা আইনের সাহায্য নেওয়া যেত। মুসলিম পুরুষকে জেলে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই কি ফৌজদারি আইন? পিতৃতন্ত্রের অবসান চেয়ে আন্দোলন মানে কিন্তু পুরুষদের জেলে পাঠানো নয়। রাষ্ট্র যদি মৌলবাদী ভাবনা, পিতৃতান্ত্রিক ধারণা বহন করে তবে সম–‌অধিকার আইন তো আসবে না। 
শোনা যাচ্ছে ‘তিনশো সত্তর’ উঠে যাওয়ার ফলে কাশ্মীরিরাও বাঁচল। তাৎক্ষণিক তিন তালাক থেকে মুক্তি পাবে। তিন তালাকের চেয়ে বড় বিপদ নাকি মুসলিম মেয়েদের নেই। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলার কোনান, পোসপোরা গ্রামে ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষী গণধর্ষণ চালিয়েছিল। সেটা বুঝি মেয়েদের বিপদ নয়? পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় মেয়েদের শারীরিক, মানসিক নির্যাতন চলে নানা আঙ্গিকে। তাই হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টর বা মুজফ্‌ফরনগরের বিজেপি বিধায়ক বিক্রম সাইনির অবলীলায় অসম্মানকজনক এই মন্তব্য, বিয়ের জন্য কাশ্মীরি মেয়ে নিয়ে আসতে পারবেন। তাই প্রশ্ন অবশ্যই উঠছে সর্বার্থে মুসলিম মেয়েরা সুরক্ষিত থাকবে তো? 
কিছু মানুষ মনে করছেন তিন তালাক রদ চিহ্নিত হল মেয়েদের মুক্তির স্বাধীনতা হিসাবে। তাঁরা তলিয়ে ভেবেছেন তো? স্বামীকে জেলে পাঠানোর স্বাধীনতা? প্রকৃত সমস্যা কিন্তু আড়ালে চলে গেল। তালাক রদ আইন চাওয়া মানে কি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার দাবি? যদি সেটা কেউ করেও, তারপর? জেলে থাকা স্বামী ভরণপোষণ দিতে অপারগ হলে? স্ত্রীর উপার্জন না থাকলে? সন্তানসমেত সেই পরিবার কোথায় দাঁড়াবে? তাৎক্ষণিক তিন তালাক বিলে স্পষ্ট আছে কি তা?  সরকার আর্থিক দায়িত্ব নেবে তাও তো বলেনি। তাহলে তিন তালাক রদ আইনকে মুসলিম মেয়েদের রক্ষাকবচ বা মুক্তির স্বাধীনতা বলি কোন যুক্তিতে?‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top