অযোধ্যা রায়ের পর অনেকে বলছেন, যা–‌ই হোক, ফয়সালা। একটা ব্যাপার কত বছর ঝুলে ছিল, মিটল, এবার শান্তি, রাম–‌রহিমের একসঙ্গে থাকা। ‘‌পরাজিত’‌ পক্ষ সংযত। ভয়?‌ বিষাদ?‌ নাকি, শান্তির আশা?‌ জয়ী পক্ষ সংযত, অন্তত রাজপথে হুঙ্কার বা হামলা নয়। নির্দেশ ছিল ওপর থেকে, ‘‌ভাল রায়’‌ আসছে, প্রকাশ্য উল্লাস নয়। বেশ, ভাল, স্বস্তি।
৪৯১ বছরের পুরনো বাবরি মসজিদ। তার ইতিহাস, প্রেক্ষিত নিয়ে বিস্তর আলোচনা। সুপ্রিম কোর্টের রায় চূড়ান্ত, অবশ্যমান্য। কিন্তু সেই রায় অভ্রান্ত, তা বলা যায় না। কাশ্মীরে ৩৭০ প্রত্যাহার। রামমন্দির। আরএসএস–‌বিজেপি–‌র হাতে আর মারাত্মক তাস থাকল না?‌ যুদ্ধজিগির থাকবেই। কাশীর জ্ঞানবাপী মসজিদ, মথুরার শাহি ইদগা ধ্বংস করার ইস্যু নিয়ে ভাবিত নয় আরএসএস, বলা হচ্ছে। রামমন্দির হচ্ছে, আর কী চাই, ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আমরাও পাচ্ছি। আর্থিক সমস্যা কাটাতে চরম ব্যর্থতা, রাজ্যে রাজ্যে অপ্রত্যাশিত ফল, চাকা ঘোরাতে নতুন ইস্যু আবার ঘোষণা হবে না, নিশ্চয়তা কোথায়?‌ আপাতত আমরা ভাবি, শান্তি।
রায় সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। সুপ্রিম কোর্টের মামলায় বিচারপতিরা যে–‌রায় দিলেন, তার ভিত্তি কী?‌ আইন নয়, ধর্মীয় আবেগ। আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার যে–‌রিপোর্টকে এত মান্যতা দেওয়া হল, তাতে অনেক ফাঁক। বাবরি সৌধের নীচে অন্য সৌধ ছিল, বক্তব্য। তা যে মন্দির, তার কোনও স্পষ্ট প্রমাণ নেই রিপোর্টে। বলা হচ্ছে, কিছু ছিল, ‘‌মনে হয়’‌ তা মসজিদ নয়। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রজতকান্ত রায় বলছেন, বাবরি সৌধের নীচে অনেকগুলো স্তর। নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে, বাবরি নির্মাণের আগে হিন্দু মন্দিরই ছিল। তিনি রোমিলা থাপারের সঙ্গে একমত। শেষবার যখন খনন হয় কোর্টের নির্দেশে, ২০০৩ সালে, অন্যতম পর্যবেক্ষক ছিলেন সুপ্রিয়া বর্মা। জেএনইউ–‌এর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান, সুপ্রিয়া স্পষ্ট লিখেছেন, বাবরি মসজিদের নীচের স্তরে যা ছিল, তা হিন্দু মন্দির এমন নির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি। দেশের অনেক মসজিদ হয়েছে মন্দিরের জায়গায়, ধ্বংসের মাধ্যমেই, তা নয়। কিন্তু, বৌদ্ধ মন্দিরের ওপরেও তৈরি হয়েছে হিন্দু মন্দির, তার নিদর্শন অসংখ্য। আমরা জানতাম, আদালত রায় দেয় আইন ও তথ্যের ভিত্তিতে। এবার দেখলাম, না, বিশ্বাসের ভিত্তিতেও। সাম্প্রতিক রায়ের ভিত্তিস্তম্ভ ‘‌বিশ্বাস’‌। আইনের কী হল?‌‌
সুপ্রিম কোর্টের রায় বলছে, ১৯৪৯ সালে রাতের অন্ধকারে মসজিদের তালা ভেঙে রামলালার মূর্তি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বলছে, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ‘‌আইনভঙ্গের বড় ঘটনা’‌।‌ কী দাঁড়াল?‌ হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক কাজকে মান্যতা দেওয়া হল?‌ সমালোচনা তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। যদি ভয় না পাই, মুখ বন্ধও করা যাবে না। আর একটা কথা। যদি মন্দির ভেঙেই মসজিদ হয়ে থাকে, সেটা তো দখলদারি, জুলুম। ‘‌দখলদার’‌ পক্ষকে ৫ একর জমি দেওয়ার যুক্তি কী?‌ তাহলে তো মনে হয়, দ্বিধা ছিল। আইন ‘‌বিশ্বাস’‌কে গুরুত্ব দেবে, ভারসাম্যকে সামনে রাখবে, সব গুলিয়ে যাচ্ছে তো!‌
রাম একটি পৌরাণিক চরিত্র। যে–‌পুরাণ, মহাকাব্য লেখা হয়েছিল আড়াই হাজার বছর আগে। মহাকাব্য, নিঃসন্দেহে অগ্রগণ্য মহাকাব্য, কিন্তু ইতিহাস নয়। মহাকাব্যের চরিত্রকে ঐতিহাসিক বলে দেওয়া কি আইনের দিক দিয়ে নির্ভুল?‌‌ তথ্য নয়, আইন নয়, ‘‌বিশ্বাস’‌ই হবে আদালতের বিবেচ্য?‌ তাহলে এত শুনানির দরকার ছিল কি?‌
মসজিদ, একটা মসজিদ হয়তো বড় কথা নয়। প্রধান কথা নয়। জানতে চাই, সংখ্যালঘু নিগ্রহ কি বন্ধ হবে?‌ গোরক্ষক বাহিনীকে তাণ্ডব চালাতে কি দেওয়া চলবেই?‌ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়ন, ভাবা হচ্ছে?‌ শুধু সংখ্যালঘু কেন, দেশের অসংখ্য সাধারণ মানুষের দুর্গতি কি সরকারের কাছে গুরুত্ব পাবে?‌ সাম্প্রদায়িক প্রচারের সূত্রে বিষ ছড়িয়ে ভোট পার হওয়ার বিষাক্ত পথ কি পরিত্যক্ত হবে?‌ ভরসা পাচ্ছি না। শুধু আরএসএস–‌বিজেপি–‌র মারাত্মক মনোভাব নয়, মহামান্য সর্বোচ্চ আদালতের বিশ্বাস‌মূলক রায়ও আমাদের দুশ্চিন্তায় রেখে গেল। 
আর একটা কথা না–‌বললেই নয়।
উগ্র সঙ্ঘ বাহিনীকেও আশ্বস্ত মনে হচ্ছিল, অনুকূল রায় আসবে। যে–‌দল রামমন্দির নির্মাণকে নির্বাচনে ইস্তাহারে প্রাধান্য দিচ্ছিল, তারাই কেন দেড় মাস আগে থেকে নির্দেশ দিল উগ্র সমর্থকদের, শান্ত থাকুন?‌ শুনতে কর্কশ 
শোনালেও বলতে হচ্ছে, তাহলে কি জানা ছিল, কী রায় আসতে চলেছে?‌ নিশ্চিত হয়েই কি ‘‌শান্ত’‌ থাকার নির্দেশ?‌ সুপ্রিম কোর্ট ‘‌সুপ্রিম’‌, কিন্তু, বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন থেকে গেল। জানি, কুৎসিত আক্রমণ আসবে, আসছে। যুক্তির কথা শোনার ইচ্ছা নেই উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের। ভোটের কথা ভেবে কংগ্রেস রায়কে স্বাগত জানাল। আমরা পারছি না। আক্রমণ?‌ সহ্য করব। এবং প্রতিহত করব। এটা আমাদের ‘‌বিশ্বাস’‌।‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top