১৭৩৭, ২০২০। ২৮৩ বছর পর বাংলায় এত বড় দুর্যোগ। আমফান। প্রধানমন্ত্রী এলেন, ১০০০ কোটি টাকা ‘‌অগ্রিম’‌ হিসেবে দেওয়ার ঘোষণা করলেন। ক্ষয়ক্ষতি যে বহুগুণ বেশি, তিনিও জানেন। কেন্দ্রীয় দল এল। দুর্যোগের পর দেড় মাস কেটে গেল, আর সাড়াশব্দ নেই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলেন না। সাধ্যমতো সামর্থ্য নিয়েই ঝঁাপালেন। রাজ্যের আয়ের পথ বন্ধ, কেন্দ্রের কাছে প্রাপ্য পুরনো ৫৩ হাজার কোটি টাকাও আসছে না। তবু, ৬৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করলেন এবং ক্ষতিপূরণ ও প্রাথমিক পুনর্নির্মাণের কাজে প্রশাসনকে নামিয়ে দিলেন। নিজে, যথারীতি, অতন্দ্র প্রহরী। 
যখন ধাক্কা কিছুটা সামলে নিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা ভাবছেন, ধেয়ে এল আরেকটা ঘূর্ণিঝড়, যা আমফানের চেয়ে খুব কম ধ্বংসাত্মক নয়। বিরোধী শিবির, সংবাদমাধ্যমের একাংশ অপপ্রচারের তুফান তুলল। প্রতিদিন পঁাচ–‌সাতটা করে ‘‌স্টোরি’,‌ বোঝানোর চেষ্টা, যেন কেউ ত্রাণ পাননি, শুধুই দুর্নীতি হয়েছে।
দু–‌চারটে উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, প্রচারটা কত বায়বীয়। সঁাকরাইল। হরিপাল গ্রামীণ হাসপাতালে কিছু গাছ পড়ে গেল। হাসপাতালে ঢোকার পথও বন্ধ। পঞ্চায়েত প্রধান ছুটে গেলেন। ‘স্পট টেন্ডার’‌ করে গাছ বিক্রি করা হল। আগে কোনও ফঁাকা স্থানে সরিয়ে, যথাবিহিত পদ্ধতিতে গেলে হত। কিন্তু হাসপাতাল বলে কথা। বিক্রির ৭৫ হাজার টাকা পঞ্চায়েত তহবিলে জমা পড়ল। ওটাই নাকি বিরাট দুর্নীতি। মুর্শিদাবাদের এক পঞ্চায়েতে বিক্ষোভ (‌সম্ভবত সংগঠিত)‌, ‘‌ত্রাণ পাচ্ছি না’‌। অতিযোগকারী বলছেন, অনেকে পেল, পাশের পঞ্চায়েতগুলোতেও সবাই পেল, তঁারা কেন বঞ্চিত?‌ মানে, মানা হল, অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ ত্রাণ ও ক্ষতিপূরণ পৌঁছেছে। অভিযোগ শুধু জেলার একটি পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে না–‌পাওয়া প্রসঙ্গে।
একটু খতিয়ে দেখুন, খোঁজ রাখুন। বেশ কিছু পঞ্চায়েতে অভিযুক্ত বিজেপি–‌স‌হ বিরোধী দলের সদস্যরাও। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মথুরাপুর, উত্তর চব্বিশ পরগনার গাইঘাটা ও বাগদা, হুগলির চণ্ডীপুরে সরাসরি অভিযুক্ত পঞ্চায়েতের বিজেপি সদস্যরা। বিষাক্ত দ্বিতীয় ‘‌আমফান’ কিন্তু ধেয়ে আসছে শুধু তৃণমূলের দিকে। শাসক দলের কিছু লোক যুক্ত, অবশ্যই। মমতা ব্যানার্জি একদিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কড়া ব্যাবস্থা নিয়েছেন, দল না বেছে। তঁার নির্দেশে তৃণমূল নেতারাও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, যঁারা অন্যায়ভাবে ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েছেন, তঁাদের অবিলম্বে শো–‌ক‌জ। তারপর ব্যবস্থা। এর মধ্যেই বহিষ্কৃত অনেকে। বলা হয়েছে, টাকা ফেরতের সঙ্গেই গল্পটা শেষ হয়ে যাচ্ছে না, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তদের দল বিচ্ছিন্ন করে দেবে।
২০০৯ সালে আয়লার পরেও অনেক অভিযোগ এসেছিল। জানতে ইচ্ছে হয়, তখনকার শাসক দল তথা বামফ্রন্ট কত জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল?‌ মহাদুর্যোগে কিছু দুর্নীতি, অনিয়ম হতেই পারে। হয়। প্রশ্ন হল, সরকার তথা শাসক দল কতটা কঠোর?‌ এখন যা দেখছি তখন তা দেখেছি কি?‌ এজন্য স্বচ্ছতা লাগে, সাহস লাগে। সেজন্য অভিনন্দন প্রাপ্য মমতা ব্যানার্জির। উল্টে জঘন্য অপপ্রচার।
বাম জমানার শেষের দিকে দু’‌জন মন্ত্রীর কথা মনে পড়ছে। একজন টেলিভিশনে বলেছিলেন, পঞ্চায়েত স্তরে সবাই অসৎ নন, কিন্তু বেশির ভাগই অযোগ্য। ট্রেনিং নেওয়ায় উৎসাহী নন। আরেকজন মন্ত্রী বলেন, ‘‌বড় লালবাড়ি ততটা নয়, আমাদের বিপদের কারণ ছোট ছোট লালবাড়ি। পঞ্চায়েত। কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?‌ জানা নেই। এখানকার মতো কঠোরতা দেখা যায়নি। 
বিকেন্দ্রীকরণের নীতি রূপায়ণের সূত্রে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আগে দলের নেতা, পরে সরকারি প্রশাসক। কাঠামোটা কাজ করছিল না। মমতা ক্ষমতায় এসেই একটা বড় সিদ্ধান্ত নেন। বেশি দায়িত্ব ও ক্ষমতা তুলে দেন প্রশাসনের হাতে। বিডিও–‌রা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওঁরাই দিবারাত্র পরিশ্রম করে কাজ করে যান। বাম জমানায় জেলাশাসকের চেয়ে সভাধিপতি, বিডিও–‌র চেয়ে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি দাপুটে হয়ে যান। ৩৪১ জন বিডিও–‌কে নামে চেনেন মুখ্যমন্ত্রী। তঁাদের জন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরের ফোন খোলা। জেলায় জেলায় ৩০০–‌র‌ বেশি প্রশাসনিক বৈঠক করে নতুন কাঠামোকে পোক্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুধুমাত্র স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের সূত্রে ছড়ি ঘোরানো অনেকটা কমে গেল।
৩৪১ পঞ্চায়েত সমিতি (‌ব্লক ভিত্তিক)‌, ৩৩৪৩ গ্রাম পঞ্চায়েত। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে ৫১ হাজার জনপ্রতিনিধি। জঘন্য প্রচার যত, স্টোরি, খতিয়ে দেখুন, খুব বেশি হলে এক হাজার জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ (‌সব সত্যি না–‌ই হতে পারে)‌। তবু, কত শতাংশ?‌ ১.‌৮!‌ ঘটা করে ‘‌স্টোরি’। ও হ্যাঁ, তথ্য, ৩৪ হাজার নাকি অভিযোগ। আমফানে ক্ষতিগ্রস্তদের ১৯ লক্ষ জনকে এর মধ্যেই যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ১৯ লক্ষের মধ্যে ৩৪ হাজার কত শতাংশ?‌ ১.‌৮!‌ এই সংখ্যাটা দেখব, ৯৮ শতাংশকে দেখব না, এ কেমন বিচার?‌ যা চলছে, সন্দেহ নেই, দ্বিতীয় ‘‌আমফান’‌। ভয়ঙ্কর। মিথ্যার আমফান!‌  ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top