আজকাল ওয়েবডেস্ক
ভারতে সরকারের আয়ের থেকে ব্যয় সবসময়ই বেশি। খাঁই বেশি বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের। করোনা পরিস্থিতিতে যখন সরকারি সাহায্য এবং ভরতুকির দাবি ক্রমশ জোরদার হচ্ছে, সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে, ওই হাঁ–মুখ যেন খুব বেশি বড় না হয়ে যায়। জাতীয় অর্থনীতি যেন শক্তপোক্ত থাকে। কারণ, করোনা সংকট কেটে গেলে লগ্নিকাররা সেখানেই আসবে, যে বাজার শক্ত জমিতে দঁাড়িয়ে। বললেন ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর উর্জিত প্যাটেল। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাজে কেন্দ্র সরকারের হস্তক্ষেপের জেরে বিরক্ত প্যাটেল চাকরি ছাড়লেও, সরকারের সাম্প্রতিক আর্থিক নীতির প্রশংসাই করেছেন। তবে আবারও বলেছেন অনুৎপাদক সম্পত্তির ভারে কাবু ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করার কথা। এবং চলতি করোনা পরিস্থিতিতে সতর্ক করেছেন, কম পরীক্ষা করার বিপদ সম্পর্কে।
প্যাটেলের যুক্তি, লক ডাউনের কারণে মানুষের রোজগার বন্ধ। সরকারকেই তাঁদের খাবারের বন্দোবস্ত করতে হচ্ছে। ফলে সরকারের খরচ বাড়ছে। আগামীদিনে খরচ আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতেও খরচ বাড়াতে হবে সরকারকে। কাজেই লক ডাউনের মেয়াদ যাতে আর না বাড়ে, সেজন্য সংক্রমণ ঠেকাতে হবে। সেই কারণেই যত বেশি মানুষের করোনা পরীক্ষা করা যায়, তত ভাল। স্বাস্থ্যখাতে খরচ বাড়িয়ে সেটা করা দরকার।
ওদিকে আমেরিকা–ব্রিটেন–জার্মানির মতো উন্নত এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ যে আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করতে পারে, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের সেই সামর্থ নেই। এদিকে ব্যয় বরাদ্দ না বাড়ালেও রাজকোষে ঘাটতি বেড়েই যাবে। কেন্দ্র সরকারের আয় কমবে, রাজ্যগুলোর ওপরও চাপ বাড়বে। তাদের ভাঁড়ারেও টান পড়বে। ইতিমধ্যেই তার লক্ষণগুলি দেখা দিতে শুরু করেছে। এখন অনেকে বলছেন, আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হোক বা সরকারি সম্পত্তি বেচে বাজারে টাকার জোগান বাড়ানো হোক। তাতেই অর্থনীতিতে গতি ফিরবে। তবে এখানেও একটি সূক্ষ্ম রেখা আছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটের মোকাবিলা করতে গিয়ে সরকারকে ঠিক করতে হবে, সে অতিসক্রিয় হবে নাকি বেপরোয়া হবে!‌ কারণ শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের কর ব্যবস্থা এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুদের হার নির্ধারণ নীতির ওপরেই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে। সরকারি বন্ডে বিদেশি লগ্নির পরিমাণ এখন প্রায় ৩০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। সম্প্রতি করোনা আতঙ্কের জেরে বিশ্ব বাজারে অস্থিরতার কারণে ১৫০০ কোটি ডলারের বিদেশি লগ্নি হারিয়েছে ভারত। এখন সরকারকে এমন আর্থিক নীতি বেছে নিতে হবে, যাতে বিদেশি লগ্নিকারীদের পাশাপাশি দেশি বিনিয়োগকারীরাও লগ্নিতে উৎসাহ পায়। আর সেই কারণে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিলে সরকারি বন্ড কেনাবেচার ক্ষেত্রে দেশি লগ্নিকারীদেরই বেশি গুরুত্ব দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
গত সপ্তাহেই বাজেটের ঘোষণা মাফিক কিছু সরকারি বন্ডে বিদেশি লগ্নির দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। বিদেশি লগ্নিকারীদের জন্য একটি পৃথক রাস্তা খোলা হয়েছে। তাদের জন্য ভারতীয় মুদ্রায় বিশেষ সরকারি ঋণপত্র ছেড়ে টাকা তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ডলারে নয়, ভারতীয় মুদ্রাতেই ঋণ নেওয়া হবে। কিন্তু বিদেশি লগ্নিকারীরা ইচ্ছে মতো সেই বন্ড কেনাবেচা করতে পারবেন। এতে এ দেশের সরকারি বন্ড আন্তর্জাতিক বন্ড সূচকে জায়গা করে নিতে পারবে। ফলে বিপুল বিদেশি লগ্নির দরজা খুলবে। তবে বিশ্ব বাজারে অস্থিরতার মধ্যে এই বন্ডে কতখানি লগ্নি আসবে, তা নিয়ে সংশয় থাকছেই। এদিকে শেয়ার বাজারেও প্রত্যেকদিন কোটি কোটি টাকার লোকসানের মুখ দেখতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার ওপর আস্থা বেশি হারিয়ে ফেলেছেন বিনিয়োগকারীরা। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, গত মাসে ডলারের হিসাবে শেয়ার বাজারে লগ্নির পরিমাণ ২৩ শতাংশ কমে গিয়েছে যেখানে ব্যাঙ্কিং সেক্টরে লগ্নি কমেছে ৩৫ শতাংশ। আর তার প্রধান কারণ উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়ছে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির নন পারফর্মিং অ্যাসেট (এনপিএ) বা অনুৎপাদক সম্পদের পরিমাণ। ব্যাঙ্কগুলি দেউলিয়া হয়ে পড়ছে। আর সেই কারণেই ব্যাঙ্কিং সেক্টরে টাকা ঢালতে ভয় পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। গত অর্থবর্ষে দেশের সব ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ২৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সুতরাং ব্যাঙ্কিংয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটুট রাখতে শুধু ডিভিডেন্ড বণ্টন করলেই চলবে না। পাশাপাশি দেখতে হবে, কীভাবে ঋণ দেওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা যাবে। মোদ্দা কথা, ব্যাঙ্কিং সেক্টরকে আরও মজবুত করে তুলতে হবে যাতে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ কমানো যায়।
ধীরে ধীরে বিশ্বের অর্থনীতি যখন আবার স্থিতিশীল হতে শুরু করবে, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেই সমস্ত দেশেই বিনিয়োগ করবে, যারা এই কঠিন পরিস্থিতিতেও অর্থব্যবস্থা মজবুত রাখতে পেরেছে। স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত ব্যয় করে এই সঙ্কটের মোকাবিলা করতে পেরেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটতেই যেসব দেশ ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তাদের ওপরেই নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের। 

জনপ্রিয়

Back To Top