স্মার্ট। গুছিয়ে কথা বলেন। কোম্পানির ডিরেক্টর। লন বোলিং, সুইমিংয়ে আছেন। কিন্তু নিজেকে সামলানোর বয়সে কোম্পানি সামলানো?‌ জানলেন সুতপা ভৌমিক

 মাত্র ২৭ বছরে একেবারে ডিরেক্টর!‌ ব্যবসাটা পারিবারিক বলেই কি সম্ভব হল?‌ সাধারণ কারও এত দ্রুত উত্তরণ হত?‌
রচিতা দে:‌ ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মেছি বলেই হয়ত। ’‌৮৭ সালে আমাদের ব্যবসা শুরু। ’‌৯১–এ আমার জন্ম। কোম্পানির কর্মীদের সঙ্গেই প্রায় বড় হয়েছি। ছুটি থাকলে দোকানে চলে যেতাম। বিশেষত পুজোর সময়। পুজোর সময় বাইরে ঘুরতে যাব, আমাদের তো সেই সুযোগটা ছিল না। আট বছর বিদেশে পড়াশোনার পর গত বছর দেশে ফিরে কোম্পানিতে যোগ দিই। এই পরিবারে ‌জন্ম না নিলে হয়ত স্ট্রাগল করতে হত। 
 জীবনে চ্যালেঞ্জ হারিয়ে যাবে ভেবে অনেক সময় পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিতে চায় না নতুন প্রজন্ম। আপনার মনে হয়নি?‌
রচিতা:‌ এত স্ট্রংভাবে ভাবনাটা আসেনি। হ্যাঁ এটা ঠিক, যখন বড় হচ্ছি, তখন শ্রীলেদার্স ব্র‌্যান্ডের সঙ্গে ‌একশো শতাংশ নিজেকে মানিয়ে নিতে পারতাম না। ব্র‌্যান্ডটা পুরোপুরি বাবার হাতে তৈরি। আর আমি সম্পূর্ণ আলাদা একটা মানুষ। যেমন একটু ফ্যাশনেবল আইটেম আমার বেশি পছন্দ। এ বছর এই কারণেই তো হাউস অফ এসএল ব্র‌্যান্ড সামনে এনেছি। তবে জানতাম, এই কোম্পানির জন্যই আমি বিদেশে পড়তে যেতে পেরেছি। তাই ফিরতেই হত। সে অর্থে অনীহা কখনও জন্মায়নি।
 আট বছর বিদেশে পড়াশোনা। এমবিএ পাশ। তার আগে রচিত দে কে ছিলেন?‌ ছোট থেকেই কি তিনি পড়ুয়া?‌ 
রচিতা:‌‌ (‌‌হেসে)‌‌ না–না। কলকাতায় জন্ম। এখানেই পড়াশোনা। লা মার্টিনিয়ার  স্কুলে। পড়াশোনার বাইরে ভীষণ প্রিয় ছিল নাচ। ক্লাসিক্যাল ডান্সে ভর্তি করিয়েছিলেন মা। স্কুলের পড়ায় ডুবে যাওয়ার ইচ্ছে অতটা হত না। বরং বিজনেস স্কুলের পড়াশোনায় অনেক বেশি ডুবে গিয়েছিলাম। 
 পুজো মানে তো দোকানে। ঠাকুর দেখা নেই। রাগ হত?‌ 
রচিতা:‌‌ পুরো দিন দোকানে থাকার মজাটাই ছিল অন্য। এত ভিড় হত দোকানে, যে ওটাই তখন একটা উৎসব। এনজয় করতাম। আর যাদের খুব ভালবাসি, তাদের সবাইকেই তো পেতাম দোকানে। একসঙ্গে বসে খেতাম। সে যে কী আনন্দ!‌ প্যান্ডেল হপিংয়ে বন্ধুরা যেত। তবে আমি ওই ব্যাপারটা মিস্‌ করিনি। 
 পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সাতাশের এক তরুণীর উত্থান সহজ?‌ 
রচিতা:‌‌ বাড়িতে কোনও বাধা পাইনি। স্নাতকস্তরের পড়া শেষের সময় সানফ্রান্সিকোতে চাকরির জন্য আবেদন করি। তখন বুঝতে পারি ছেলে–মেয়েদের পারিশ্রমিকে তফাৎ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দু’‌পক্ষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ব্যাপারগুলো। 
 হাউস অফ এসএল নিয়ে বাবার পরামর্শ পাচ্ছেন?‌
রচিতা:‌‌ বাবার (‌‌সত্যব্রত দে) ছায়াতেই তো বড় হয়েছি। উনি সবচেয়ে বড় প্রেরণা। যে কোনও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভাবি, বাবা হলে এখানে কী করতেন। শ্রীলেদার্স প্রচুর ভ্যারাইটি রাখে। আমি সিলেকটিভ, এক্সক্লুসিভ ডিজাইন রাখতে চাই। লাক্সারি বলতে লোকে বোঝে দামি। হাউস অফ এসএল প্রিমিয়াম প্রোডাক্ট। কোয়ালিটিতে জোর দিয়েছি। দাম বেশি করলেই জিনিস ভাল হবে, এই ভাবনাটা আমাদের কাছে একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। 
 এত কমবয়সী ডিরেক্টর। সবাই সব কথা শোনেন?‌ 
রচিতা:‌‌ (‌‌হেসে)‌‌ মিটিংয়ে ডিরেক্টর হিসেবে কথা বলি না। সবসময় ক্রেতার জায়গায় নিজেদের রেখে ভাবার চেষ্টা করি। ভাবতে চাই। ক’‌দিন আগে যেমন বাইরের এক কনসালটেন্ট এসে বললেন, ‌আপনারা যদি অমুককে ব্র‌্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করেন, তা হলে এতটা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে পারবেন।‌ আমাদের প্রতিষ্ঠানের যাঁরা কর্মী তাঁরা জানতেন, এই ভাবনার সঙ্গে একমত হতে পারি না।
 কলকাতা, ব্যবসা এবং তরুণ প্রজন্ম— এই তিনের মেলবন্ধন কতটা সহজ?‌ 
রচিতা:‌‌ এই বিষয়ে আমার ভিউ একেবারেই আলাদা। তবে রিয়েলিটি হচ্ছে, যারা কলকাতা থেকে একবার বেরিয়েছে, তারা আর ফেরত আসেনি। উন্নতির সুযোগটা কম। 
 অ্যামাজন, ফ্লিপকার্টে শপিং করতে আধুনিক প্রজন্ম এখন বেশ সড়গড়। অথচ শ্রীলেদার্স কেন এখনও ই–কমার্স সাইটে অভ্যস্ত হতে পারছে না?‌
রচিতা:‌‌ ভীষণই ভাল প্রশ্ন‌‌। যেহেতু হাতে টাকা ধরতে হচ্ছে না, ক্রেতারাও তাই না বুঝে কেনাকাটা করে ফেলছে!‌ ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনে দামের ওপর ৪০ শতাংশ, ৫০ শতাংশ অফ দেখিয়ে দেয়। আমরা সেটা পারি না। কারণ আমরা মার্জিন অতটা রাখি না। জানি নতুন ক্রেতাদের আকর্ষণ করা এতে কঠিন হয়। যাঁরা পুরনো ক্রেতা তাঁরা জানেন, ব্যবসায় টিকে থাকতে যতটুকু লাভের মাত্রা রাখা দরকার, আমরা ততটুকুই রাখি। 
 ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামে সক্রিয়?‌ এখন তো মিস। মিসেস হওয়ার চটজলদি কোনও ইচ্ছে?‌
রচিতা:‌‌ আমার ফেসবুক নেই। হোয়াটসঅ্যাপে অ্যাক্টিভ। পোস্ট করি ইনস্টাগ্রামেও। আর (‌‌হেসে)‌‌ না, এখন মিসেস হওযার ইচ্ছে নেই। হলে হবে। এখন পেশাটা নেশার থেকেও বেশি। সবে সবে তো কাজে ঢুকেছি। আগে ভিতটা মজবুত হোক। 
 আপনার হবি কি?‌ প্রিয় ফুটবলার কে?‌
রচিতা:‌‌ লন বোলিং খেলতে যাই। সুইমিং করি। সবাই মিলে ফুটবল ম্যাচ দেখি। আমাদের বাড়িতে ছোটরাই সব সিদ্ধান্ত নেয়। আমার থেকে আট বছরের ছোট আমার ভাই। ওর ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে পছন্দ। তাই আমাদেরও রোনাল্ডোকেই পছন্দ। 
 শ্রীলেদার্স কি আরও আধুনিক হবে আপনার হাত ধরে?‌
রচিতা:‌‌ আশা করছি। তবে দাবি করতে পারি না। একশো শতাংশ চেষ্টা করব কোম্পানির প্রতি ন্যায়বিচার করতে। 

জনপ্রিয়

Back To Top