দশমীর হারিয়ে যাওয়া স্বাদ! চন্দ্রপুলি, নিমকি, গজা থেকে বালুসাই, চিপস কুকিজের দাপটে বাঙালির মিষ্টিসুখ বিস্মৃতির পথে?
- 1
- 19
দশমী মানেই বিজয়ার প্রণাম, কোলাকুলি আর মিষ্টিমুখ। একসময় এই দিনটিতে বাঙালির ঘরে ঘরে সাজানো থাকত মিষ্টি আর নোনতার থালা। কোথাও নারকেল নাড়ু, কোথাও গুড়ের খই, কোথাও আবার বাড়িতে তৈরি নিমকি কিংবা মুড়ির মোয়া। আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এলে মিষ্টির প্লেট এগিয়ে দেওয়া ছিল রীতি।
- 2
- 19
চন্দ্রপুলি: মিষ্টির থালায় চাঁদের টুকরো৷ নারকেল, ক্ষীর ও চিনির মিশেলে তৈরি চন্দ্রপুলি বাঙালির সাবেকি মিষ্টির অন্যতম। অর্ধচন্দ্রের মতো আকৃতি আর নারকেলের মিষ্টি স্বাদ এই পদকে অন্য মিষ্টির থেকে আলাদা করে। একসময় পুজো-পার্বণ কিংবা বিশেষ অতিথি আপ্যায়নে চন্দ্রপুলির কদর ছিল। এখন অনেক মিষ্টির দোকানে তা সহজে চোখে পড়ে না। তবে যাঁরা পুরনো দিনের মিষ্টির স্বাদ ভালবাসেন, তাঁদের কাছে চন্দ্রপুলি আজও নস্টালজিয়ার নাম।
- 3
- 19
নিমকি: মিষ্টিমুখের সঙ্গে একটু নোনতা না হলে চলে? সাবেকি বাঙালি বাড়িতে তাই থাকত নিমকি। ময়দা, তেল, নুন আর কালোজিরে দিয়ে তৈরি এই মুচমুচে খাবার চায়ের সঙ্গে দারুণ মানানসই। আগে উৎসবের আগে বাড়ির মহিলারা অনেকটা নিমকি বানিয়ে কৌটোয় তুলে রাখতেন। অতিথি এলেই মিষ্টির পাশাপাশি এগিয়ে দেওয়া হত নিমকি। এখন বাজারে নানা ধরনের প্যাকেটবন্দি নোনতা খাবার পাওয়া যায়। তবু বাড়িতে তৈরি নিমকির স্বাদ আলাদা।
- 4
- 19
গুড় খই: সহজ উপকরণে মিষ্টি স্মৃতিখই আর গুড়ের মেলবন্ধনে তৈরি গুড় খই একেবারে ঘরোয়া স্বাদের খাবার। অল্প উপকরণে তৈরি হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতি। গুড়ের পাকের সঙ্গে খই মিশিয়ে তৈরি এই মিষ্টি কখনও শুকনো, কখনও দলা পাকানো অবস্থায় পরিবেশন করা হয়। এখন শহুরে জীবনে এমন খাবার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় খুব একটা দেখা যায় না। অথচ একসময় উৎসবের দিন কিংবা বিকেলের জলখাবারে এর জনপ্রিয়তা ছিল যথেষ্ট।
- 5
- 19
তিলের নাড়ু: ছোট্ট গোলায় পুরনো দিনের স্বাদতিল আর গুড়ের নাড়ু বাঙালির ঘরোয়া মিষ্টির তালিকায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তিল ভেজে গুড়ের পাকের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হয় এই নাড়ু। শীতকালে এর চল বেশি হলেও অনেক বাড়িতে পুজোর সময়ও তৈরি করা হত। তিলের নিজস্ব গন্ধ আর গুড়ের মিষ্টি স্বাদ একসঙ্গে মিলে তৈরি করে অন্য রকম স্বাদ। এখন দোকানের নানা বাহারি মিষ্টির ভিড়ে তিলের নাড়ু কিছুটা আড়ালে চলে গেলেও এর ঐতিহ্য আজও অটুট।
- 6
- 19
নারকেল নাড়ু: বিজয়ার মিষ্টিমুখে চিরকালীননারকেল নাড়ু ছাড়া বাঙালির উৎসবের কথা ভাবাই কঠিন। নারকেল কুরিয়ে গুড় বা চিনির সঙ্গে পাক দিয়ে তৈরি এই মিষ্টি বহু পরিবারের পুজোর প্রস্তুতির অংশ। একসময় বাড়ির বড়রা নিজের হাতে নাড়ু বানিয়ে কৌটোয় ভরে রাখতেন। বিজয়ার দিন আত্মীয়স্বজন এলে সেই নাড়ু দিয়েই হত মিষ্টিমুখ। আজও অনেক বাড়িতে এই রীতি রয়েছে। তবে ব্যস্ততার কারণে অনেক পরিবারেই বাড়িতে নাড়ু বানানোর অভ্যাস কমেছে। সেই কারণেই পুরনো দিনের এই স্বাদকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জরুরি।
- 7
- 19
গজা: চিনির আস্তরণে মুচমুচে মিষ্টিময়দা দিয়ে তৈরি, ভাজা এবং চিনির রসে বা চিনির আস্তরণে মাখানো গজা বাঙালির চেনা সাবেকি মিষ্টি। বাইরে মুচমুচে, ভিতরে স্তরযুক্ত এই মিষ্টি চায়ের সঙ্গে খেতেও বেশ ভাল লাগে। বিভিন্ন অঞ্চলে গজার আকার ও তৈরির পদ্ধতিতে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এখন নানা ধরনের আধুনিক মিষ্টির ভিড়ে গজা আগের মতো আলোচনায় না থাকলেও পুরনো দিনের মিষ্টির দোকানের স্মৃতিতে এর জায়গা রয়েছে।
- 8
- 19
মালপোয়া: উৎসবের মিষ্টি, বাড়ির রান্নাঘরের গন্ধময়দা বা সুজি, দুধ, চিনি এবং কখনও মৌরি দিয়ে তৈরি মালপোয়া বাঙালির পরিচিত মিষ্টি। ভেজে চিনির রসে ডুবিয়ে তৈরি এই পদ নরম ও রসালো স্বাদের জন্য জনপ্রিয়। অনেক বাড়িতে বিশেষ দিন কিংবা পুজো-পার্বণে মালপোয়া তৈরি করা হত। এখন রেস্তরাঁ ও মিষ্টির দোকানেও মালপোয়া পাওয়া যায়, কিন্তু বাড়িতে তৈরি মালপোয়ার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি আলাদা। দশমীর মিষ্টিমুখে তাই ফিরিয়ে আনা যেতে পারে এই পুরনো পদ।
- 9
- 19
গুজিয়া: পুরভরা মিষ্টির অন্য রকম স্বাদময়দার খোলের ভিতরে নারকেল, ক্ষীর, খোয়া কিংবা শুকনো ফলের পুর দিয়ে তৈরি গুজিয়া ভাজা হয় অথবা নির্দিষ্ট রীতিতে রান্না করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে এই মিষ্টির নানা ধরন রয়েছে। বাংলার কিছু পরিবারেও উৎসবের সময় গুজিয়া তৈরির চল ছিল। দোকানের মিষ্টি কিনে আনার বদলে বাড়িতে তৈরি গুজিয়া অতিথি আপ্যায়নে নতুনত্ব আনতে পারে। এর মুচমুচে খোল আর মিষ্টি পুর একসঙ্গে তৈরি করে অন্য রকম স্বাদ।
- 10
- 19
মুড়ির মোয়া: গুড়ের পাকেই বাঁধা স্মৃতিমুড়ি ও গুড় দিয়ে তৈরি মোয়া বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবার। বিশেষ করে গ্রামবাংলায় এই খাবারের সঙ্গে উৎসব ও শীতের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। গুড়ের পাক ঠিক হলে তবেই তৈরি হয় ভাল মোয়া। পাক বেশি হলে শক্ত, কম হলে আবার ঠিকমতো বাঁধে না। এই সূক্ষ্ম কৌশলই মোয়া তৈরিকে বিশেষ করে তোলে। এখন দোকানে মোয়া পাওয়া গেলেও বাড়ির হাতে তৈরি মোয়ার স্বাদ অনেকের কাছেই নস্টালজিক।
- 11
- 19
চিড়ের মোয়া: চেনা উপকরণে অন্য রকম মিষ্টিমুড়ির বদলে চিড়ে ব্যবহার করে তৈরি হয় চিড়ের মোয়া। গুড়ের পাকের সঙ্গে চিড়ে মিশিয়ে ছোট ছোট আকারে বাঁধা হয় এই মিষ্টি। সহজ উপকরণে তৈরি হলেও এর স্বাদে রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। ঘরোয়া মিষ্টির তালিকায় একসময় এমন খাবারের কদর ছিল। আজকাল অবশ্য অনেকেই এই ধরনের পদ বাড়িতে তৈরি করেন না। বিজয়ার মিষ্টিমুখে চিড়ের মোয়া ফিরিয়ে আনলে সাবেকি স্বাদের সঙ্গে পরিচয় হবে নতুন প্রজন্মেরও।
- 12
- 19
বালুসাই: স্তরে স্তরে মিষ্টির স্বাদবালুসাই হল ময়দা দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভাজা মিষ্টি, যার বাইরের স্তর কিছুটা খসখসে এবং ভিতরটা তুলনায় নরম হতে পারে। ভাজার পর চিনির রসে ডুবিয়ে তৈরি করা হয় এই মিষ্টি। বাংলার বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে একসময় বালুসাই বেশ পরিচিত ছিল। এখন অবশ্য রসগোল্লা, সন্দেশ কিংবা আধুনিক মিষ্টির পাশাপাশি বালুসাই অনেকের পছন্দের তালিকায় পিছিয়ে পড়েছে। তবে সাবেকি মিষ্টির স্বাদ ফিরিয়ে আনতে এই পদও হতে পারে দশমীর বিশেষ আয়োজন।
- 13
- 19
ছাঁচের সন্দেশ: মিষ্টির গায়ে শিল্পের ছোঁয়াছানার সঙ্গে চিনি মিশিয়ে তৈরি সন্দেশকে কাঠের ছাঁচে ফেলে নানা নকশা দেওয়া হত। ফুল, পাতা কিংবা অন্য নকশার ছাপ পড়ত মিষ্টির গায়ে। ফলে সন্দেশ শুধু স্বাদের জন্য নয়, তার সৌন্দর্যের জন্যও আকর্ষণীয় হয়ে উঠত। পুজো-পার্বণ ও বিশেষ অতিথি আপ্যায়নে এই ধরনের সন্দেশের চল ছিল। আজও অনেক মিষ্টির দোকানে ছাঁচের সন্দেশ পাওয়া যায়, তবে আগের মতো হাতে তৈরি নকশার বৈচিত্র্য সর্বত্র দেখা যায় না।
- 14
- 19
সীতাভোগ-মিহিদানা: বর্ধমানের গর্বসীতাভোগ ও মিহিদানা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের বিখ্যাত মিষ্টি। সীতাভোগ দেখতে অনেকটা সাদা ভাতের মতো, আর মিহিদানা ছোট ছোট দানার মতো মিষ্টি। দু’টিরই স্বাদ ও তৈরির পদ্ধতি আলাদা। বর্ধমানের এই মিষ্টি বাংলার খাদ্যঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এখনও জনপ্রিয়। তাই এগুলিকে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া মিষ্টি বলা যায় না। তবে কলকাতা বা অন্য অঞ্চলের প্রতিটি বিজয়ার মিষ্টির থালায় যে নিয়মিত দেখা যায়, এমনও নয়। দশমীর ফিচারে এই দুই মিষ্টির উল্লেখ বাংলার আঞ্চলিক স্বাদের বৈচিত্র্য তুলে ধরবে।
- 15
- 19
মনোহরা: চিনির আস্তরণে লুকিয়ে ঐতিহ্যহুগলির জনাই অঞ্চলের মনোহরা বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির মধ্যে বিশেষ পরিচিত। ছানা দিয়ে তৈরি মিষ্টির উপরে চিনির শক্ত আস্তরণ থাকে। নামের মতোই এর স্বাদ ও গড়ন আলাদা। মনোহরার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার মিষ্টি তৈরির পুরনো কারিগরি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্য। এখনও নির্দিষ্ট মিষ্টির দোকানে এই মিষ্টি পাওয়া যায়। তবে আধুনিক মিষ্টির বিপুল সম্ভারের মধ্যে নতুন প্রজন্মের অনেকে এর ইতিহাস বা বিশেষত্ব সম্পর্কে জানেন না।
- 16
- 19
চানাচুর-ঝুড়িভাজা: মিষ্টির পাশে নোনতার আসরবিজয়ার মিষ্টিমুখে শুধু মিষ্টি নয়, থাকত নোনতা খাবারও। চানাচুর কিংবা ঝুড়িভাজা ছিল তেমনই পরিচিত সঙ্গী। মুচমুচে, ঝাল-নোনতা এই খাবার চায়ের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার উপযুক্ত। আগে মিষ্টির দোকান থেকে নোনতা কিনে বাড়িতে রাখা হত, আবার অনেক বাড়িতে নিজেরাও নানা ধরনের ভাজাভুজি তৈরি করতেন। এখন প্যাকেটবন্দি স্ন্যাকসের নানা বিকল্প থাকলেও পুরনো দিনের ঝুড়িভাজা বা স্থানীয় মশলার স্বাদ আলাদা করে মনে পড়ে।
- 17
- 19
দানাদার: দানাদার বাংলার পরিচিত ছানার মিষ্টি। ছোট ছোট দানার মতো গড়ন, চিনির রসের স্বাদ এবং বিশেষ টেক্সচার এর বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন অঞ্চলে দানাদার তৈরির পদ্ধতিতে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এখনও অনেক মিষ্টির দোকানে এটি পাওয়া যায়, তবে নতুন প্রজন্মের পছন্দের তালিকায় সবসময় প্রথম সারিতে থাকে না। দশমীর মিষ্টির থালায় দানাদার রাখলে সাবেকি স্বাদের পাশাপাশি বাঙালির মিষ্টি তৈরির বৈচিত্র্যও তুলে ধরা যায়।
- 18
- 19
আসলে এই তালিকার সব মিষ্টি বা নোনতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কোনওটি এখনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে জনপ্রিয়, কোনওটি মিষ্টির দোকানে পাওয়া যায়, আবার কোনওটি বাড়িতে বিশেষ উপলক্ষে তৈরি হয়। তবে বদলেছে দৈনন্দিন জীবনযাপন, রান্নার সময় এবং অতিথি আপ্যায়নের ধরন। আগে বাড়িতে তৈরি নাড়ু, মোয়া, নিমকি কিংবা গজা দিয়ে বিজয়ার আয়োজন করার যে রীতি ছিল, তা অনেক পরিবারেই এখন কমে এসেছে।
- 19
- 19

















