বাপ্পাদিত্য বর্মন: ‘‌জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’‌। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি গল্প আছে। প্রথম বার ডুয়ার্সে গিয়ে হলংকে দেখে আমার সেইরকমই মনে হয়েছিল। আর এখানে থাকার ইচ্ছে কলেজ পড়ার সময় থেকেই ছিল। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম।  কাঙ্ক্ষিত সময় আসতেই দু’‌রাত্রির জন্য দুটি ঘর বুক করে বেরিয়ে পড়লাম।
উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়া জঙ্গলে হলঙের অবস্থান। জলদাপাড়ার চেকপোস্টে পৌঁছে যাবতীয় সইসাবুদ করে গাড়ি ছাড়ার অনুমতি পাওয়া গেল। এন এইচ ৩১সি থেকে জঙ্গলের মধ্যে ৬ কিমি ভেতরে হলং বাংলো। ভেতরে প্রবেশপথেই দেখা গেল বড় একটা সম্বর হরিণ। নিরিবিলিতে ঘাস খাচ্ছিল। আমাদের গাড়ির আওয়াজে রাস্তা পার হয়ে গেল। আর একটু এগিয়ে জোড়া হাতি। মালঙ্গি ও চম্পাকলি। এরা কুনকি হাতি। অবশেষে হলং কাঠের ঘরে পুরোপুরি আধুনিক সুযোগ–সুবিধাযুক্ত হলং বাংলো। বাংলোর সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে হলং নদী। নদীর ওপারে আছে সল্ট পিট। এখানে পশুরা লবণ খেতে আসে। সেইখানে দাঁড়িয়ে আছে বড় দাঁতাল হাতি। সল্ট পিটে সর্বক্ষণ হরিণ এবং ময়ূরের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সন্ধেয় চারদিকের নিস্তব্ধতার সঙ্গে কোজাগরীর চাঁদের আলো এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করল। সার্চলাইট দেওয়া হল আলো জ্বালিয়ে প্রাণী দেখার জন্য। সল্ট পিটে সন্ধেতেই হাজির এক গন্ডার। সঙ্গে বেশ কিছু বাইসন। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের শব্দ অদ্ভুত থেকে অদ্ভুতরতে পরিণত হতে লাগল।
হলঙে আছে ভিউ রুম। ভিউ রুম থেকে সামনের জঙ্গল এবং সল্ট পিট পুরোপুরি দেখা যায়। এখানে রাতের খাবার সময় সাড়ে আটটা। জঙ্গলের মধ্যে মোবাইলের নেটওয়ার্ক খুবই ক্ষীণ। খাওয়ার পরে নীচের নুড়ি বাঁধানো পথে মোবাইলে চেষ্টা করার সময় ঘটে গেল এক অবাক করা কাণ্ড। হঠাৎ দু’‌জন কর্মী আমাকে হাত ধরে তুলে নিয়ে ঢুকিয়ে দিল বারান্দায়। দেখি ঠিক আমার পেছনে একটা গন্ডার আপনমনে ঘাস খাচ্ছে। প্রায় দু’‌ঘণ্টা বাংলোর ঘাস খাওয়ার পর সেটা পেছনের জঙ্গলে অদৃশ্য হল। সারা রাত্রি জেগে চলল সার্চ লাইট জ্বেলে সল্ট পিট দেখা। দেখা গেল পনেরো–ষোলোটা হাতির দল।
পরের দিন সকালে এলিফ্যান্ট রাইড। ভোর ৫.‌৩০, সকাল ৬.‌৩০ এবং ৭-৩০ এই তিনটে সময়ে রাইড হয়। বাংলোর গেট থেকে হাতির পিঠে চড়তে হয়। একটি হাতির পিঠে চারজন। হাতির কানের পেছনে পা দিয়ে আঘাত করে অসামান্য দক্ষতায় মাহুতরা আমাদের নিয়ে চলল গভীর থেকে গভীরতর জঙ্গলের মধ্যে। যাওয়ার পথে দেখাতে লাগল হাতিদের প্রিয় ঘাস, বিভিন্ন গাছ, ফল ইত্যাদি।
১ ঘণ্টা হাতির পিঠে চড়ার বিরলতম অভিজ্ঞতার মধ্য দেখা গেল নদীতে একটা গন্ডারের ডুবে থাকা। একদল হরিণ, ময়ূর। সারাদিনে হলং নদীর বাঁধানো সিঁড়িতে বসে অগণিত ময়ূর, হরিণ, বাইসন, পায়রা, নাম না-জানা পাখি দেখে কেটে গেল।
এই সন্ধেয় ছিল কোজাগরী পূর্ণিমার রাত। গতদিনের মতো একটা গন্ডার সন্ধে হতে না হতেই হাজির বাংলোয় ঘাস খাওয়ার জন্য। ঠিক আমাদের জানালার নীচে তার ঘাস খাওয়ার মসমস আওয়াজ যেন বাংলোর সন্ধের নীরবতাকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিচ্ছিল। পূর্ণিমার স্বচ্ছ আলোয় হালকা শীতে জানলা থেকে সমগ্র জঙ্গল যেন অদ্ভুত মায়াবীতে পরিণত হল। নিজেকে কোলাহলপূর্ণ পৃথিবী থেকে বহুদূর গ্রহের একজন বলে মনে হল।
এল ফেরার দিন। সকালে দেখলাম ছোট হলং নদী পেরিয়ে একটা গন্ডার যেন আমাদের বাংলোয় আসার চেষ্টা করছে। তারপর আনমনে কোনও কারণে সে অন্যদিকের জঙ্গলে ঢুকে গেল। সে যেন আমাদের বিদায় জানিয়ে গেল।
হলঙে ঘর আছে মোট ৮টি। এর মধ্যে ৫টি ঘর সাধারণ ট্যুরিস্টদের জন্য। www.wbtdcl.com-এর মাধ্যমে এক মাস আগে বুকিং করা যায়। হলঙে বুকিং ক্যানসেল করা যায় না এবং বুকিংয়ে কোনওরকম ডিসকাউন্ট দেওয়া হয় না। বৃহস্পতিবার হলং বন্ধ থাকে। হলঙের নন–এসি রুমের ভাড়া ট্যাক্স ছাড়া ২৫০০ টাকা। ব্রেকফাস্ট, সন্ধের চা এবং ডিনার জনপ্রতি ৪০০ টাকা। এলিফ্যান্ট রাইড জনপ্রতি ৮০০ টাকা। বাংলোর চেকইনের সময় রাইডের ফর্ম ফিলআপ করে নেওয়া হয়। হলঙে আছে দু’‌টি ভিউ রুম। এখান থেকে সল্ট পিট উপভোগ করা যায়। আগে আসার ভিত্তিতে ভিউ রুম দেওয়া হয়।
এখান থেকে ঘুরে দেখা যায় চিলাপাতা জঙ্গল, খয়েরবাড়ি বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র, টোটোপাড়া, তিস্তা ব্যারেজ ইত্যাদি।
কাছাকাছি রেল স্টেশন হাসিমারা এবং ফালাকাটা। কলকাতা থেকে হাসিমারা যাওয়ার ট্রেন কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস। ফালাকাটা থেকে পাওয়া যাবে তিস্তা–তোর্সা, উত্তরবঙ্গ, কামরূপ এক্সপ্রেস।‌‌‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top