শ্রাবণী গুপ্ত: ‘মুষল পর্ব’ শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই ছোট বড় নেতা একে অন্যকে দায়ী করছেন ভোটে এই ফলাফলের জন্য। লক্ষ্য ছিল ‘সোনার বাংলা’। লক্ষ্য ছিল ২০০-র বেশি আসন পাওয়া। আদতে থেমে যেতে হল ৭৮-এ। কেন? প্রশ্ন উঠছে দোষ কার? প্রশ্ন উঠছে, ঠিক কোন কোন সিদ্ধান্তের জন্য এহেন ফল। রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে হেস্টিংস থেকে। আরএসএস, সংঘ পরিবার, এবিভিপি সহ একাধিক সংগঠন থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আর সব থেকে বড় কথা, শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে রাজ্য নেতা অনেকেই দলের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। ‘টার্গেট বেঙ্গল’ আটকে গেল কোথায়? চেষ্টার ত্রুটি ছিল না দীন দয়াল উপাধ্যায় মার্গ থেকে। পাঁচ রাজ্যের ভোট হলেও পশ্চিমবঙ্গে সবথেকে বেশি বার এসেছেন নরেন্দ্র মোদি,অমিত শাহ। একের পর এক সভা করেছেন যোগী আদিত্যনাথ। বাংলার ছেলে মিঠুন চক্রবর্তীকে দিয়েও রাজ্যজুড়ে প্রচার চালানো হয়েছে। ভোটের আগে প্রধান রাজনৈতিক শত্রু তৃণমূল কংগ্রেসের ঘর ভেঙে একের পর এক নেতাদের দলে নিয়ে আসা হয়েছে। বাংলার একাধিক পরিচিত সেলিব্রিটি-কে প্রার্থী তালিকায় জায়গা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাতেও বাংলার ‘চিঁড়ে’ ভিজলো না! আপাতত কর্মীদের নিরাপত্তা দেওয়া নাকি ভোটের ফল বিশ্লেষণ, এই দ্বিধায় গেরুয়া শিবির। কথায় বলে, ‘অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট’। রাজ্য বিজেপির একাধিক নেতা মনে করছেন, আসলে তাদেরও তাই হয়েছে। পুরনো নেতা, তৃণমূল থেকে আসা নতুন নেতা, সেলিব্রিটি নেতা সবমিলিয়ে কোথাও তাল পাকিয়ে গেছে। রাজ্য বিজেপির সমীকরণ যারা জানেন, একথা তাদের কাছে গোপন নয় যে এখানে একাধিক ‘লবি’ আগে থেকেই ছিল। বিজেপি সূত্রে বলা হচ্ছে, রাহুল সিনহা বনাম দিলীপ ঘোষ লড়াই আজকের কথা নয়। এমনকি সে সময় দলের মিডিয়া সেল ও আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গেছিল এই দুই শিবিরে। লোকসভা নির্বাচনের আগে মুকুল রায়েরও দলের মধ্যে একটি শক্তিশালী অনুগামী শিবির তৈরি হয়। নির্বাচনের আগে এর সঙ্গে জুড়ে যায় একদিকে শুভেন্দু অধিকারী ‘লবি’। কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার একটা অংশে আবার ‘শোভন বৈশাখী’ অনুগামীরা একজোট হন। মেঘালয় থেকে ফিরে এসে নিজের মত জায়গা তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন তথাগত রায়। একদিকে মুরলীধর সেন লেন আর অন্যদিকে ঝাঁ চকচকে নতুন হেস্টিংস পার্টি অফিস। দীর্ঘদিন গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে যুক্ত যাঁরা, তাদের বক্তব্য এত ‘লবি’ থাকাতেই তাল কেটেছে। যেমন ভোটের ফল প্রকাশের পরেই, রাজ্য বিজেপির এক নেতা শমীক দাশগুপ্ত ফেসবুকে লেখেন, ‘৭ বছর ধরে কর্মী হিসেবে যখন যেটুকু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেটুকু করার চেষ্টা করেছি। ২০১৯-এর পরে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা স্বঘোষিত আরএসএস হওয়া মানুষের বাড়বাড়ন্ত নেতাদের ছড়াছড়ি দেখলাম দলের স্থানীয় ক্ষেত্রে। কর্মীদের উপর অত্যাচার আটকানোর জন্য এবার তাদের এলেম কতটা আছে সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।’ নির্বাচনের আগে গোটা রাজ্য কে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে অবজার্ভার বসানো হয় রাজ্য বিজেপি তরফে। গন্ডগোল নাকি সেখানেও ছিল। এক একটি অঞ্চলে আবার একজন অবজার্ভার তলায় একাধিক কো অবজার্ভার রাখা হয়। সংগঠনকে চাঙ্গা করার থেকেও কে টিকিট পাবেন আর কে পাবেন না তাই নিয়ে চলতে থাকে দর কষাকষি। এই অভিযোগও উঠছে রাজ্য বিজেপির অন্দরে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কলকাতা জোনের দায়িত্বে সবমিলিয়ে চারজন ছিলেন। শোভন চ্যাটার্জি, বৈশাখী ব্যানার্জি, শঙ্কুদেব পান্ডা এবং দেবজিৎ সরকার। বিজেপির রথযাত্রা শুরু হবার পরেই বিভিন্ন জোনে অবজার্ভারদের মধ্যে মতান্তর শুরু হয় বলে সূত্রের খবর। ভোটের ঠিক আগে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে রাজ্যে পাঠানো হয় স্বপন দাশগুপ্ত, অনির্বাণ গাঙ্গুলীদের। জেলায় জেলায় এতদিন যাঁরা সংগঠন চালিয়েছেন, তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়েই কি ছন্দপতন? এমনকি এখন তো এমন প্রশ্নও উঠছে, ফিল্মি নায়ক নায়িকাদের ভোটের টিকিট দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসলে কার ছিল? যেমন এদিনই ফেসবুকে পোস্ট করেন তথাগত রায়। তিনি লিখেছেন, “পায়েল শ্রাবন্তী পার্নো ইত্যাদি ‘নগরীর নটীরা’ নির্বাচনের টাকা নিয়ে কেলি করে বেড়িয়েছেন আর মদন মিত্রর সঙ্গে নৌকাবিলাসে গিয়ে সেলফি তুলেছেন (এবং হেরে ভূত হয়েছেন) তাঁদেরকে টিকিট দিয়েছিল কে ? কেনই বা দিয়েছিল? দিলীপ-কৈলাশ-শিবপ্রকাশ-অরবিন্দ প্রভুরা একটু আলোকপাত করবেন কি?” এসবের পাশাপাশি এতদিন চুপ থাকার পরে গতকাল রাতে ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করেন ‘শোভন-বৈশাখী’। সেখানেও রীতিমতো সমালোচনায় বিদ্ধ করা হয়েছে বিজেপিকে। সব মিলিয়ে তাই এ যেন মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পরবর্তী অধ্যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গেরুয়া শিবিরের কর্মী বলছেন, যদুবংশ এভাবেই ধ্বংস হয়েছিল। গঠনমূলক আত্মসমালোচনার পথে না গেলে পশ্চিমবঙ্গে পদ্মফুলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই কপালে চিন্তার ভাঁজ থেকেই যাচ্ছে মাঠে–ঘাটে কাজ করা বিজেপির নেতা কর্মীদের মধ্যে।

Back To Top