রঞ্জন লাহিড়ী: বিজেপি–‌র রথযাত্রায় আইনশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা নিয়ে রাজ্যের যুক্তিকেই মান্যতা দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আজ, শুক্রবার কোচবিহার থেকে রথযাত্রা করতে বিজেপি–‌কে অনুমতি দিলেন না বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ৯ জানুয়ারি। তার আগে রথযাত্রা করা যাবে না বলে বৃহস্পতিবার জানিয়ে দিয়েছে আদালত। সিঙ্গল বেঞ্চের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে গেছে বিজেপি। এদিনই সন্ধেয় সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ বিবেচনার জন্য প্রধান বিচারপতি দেবাশিস করগুপ্তের দ্বারস্থ হয় বিজেপি। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতি শম্পা সরকারের ডিভিশন বেঞ্চে বিজেপি–‌র আবেদনের শুনানি হবে।
বৃহস্পতিবার গোটা দিন জুড়ে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত ও বিজেপি–‌র আইনজীবীদের সওয়াল–‌জবাব চলে। শেষ বেলায় মামলায় অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়ে বিচারপতি জানিয়ে দেন, রথযাত্রার জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হবেন। রাজ্যের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। কোনও ঘটনা ঘটে গেলে তার দায়ও রাজ্যের ওপরে পড়বে। বিপুল সংখ্যক মানুষকে সামলে নিরাপদে রথযাত্রা পরিচালনার জন্য বিপুল সংখ্যক পুলিস এবং কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা দরকার। রথযাত্রায় কিছু হলে কি বিজেপি–‌র কেউ দায় নেবেন। কেউ তখন থাকবেন না। পুলিসকে যখন সব দায় নিতে হবে, তখন এই অল্প সময়ে কোচবিহারে রথযাত্রার অনুমতি দেওয়া যায় না। পাশাপাশি রথ যে–‌সব জেলা দিয়ে যাবে, সেখানকার জেলার পুলিস সুপারের রিপোর্ট প্রয়োজন। সেগুলি এলে পরে বিবেচনা করে দেখা যাবে।
কোচবিহার থেকে বিজেপি রথযাত্রা শুরু করতে চেয়‌ে প্রশাসনের অনুমতি না পেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়। বুধবার অনুমতির প্রশ্নে সেখানকার পুলিস সুপারের রিপোর্ট তলব করে আদালত। এদিন পুলিস সুপার মুখবন্ধ খামে আদালতে রিপোর্ট দিয়ে জানিয়ে দেন যে, রথযাত্রার অনুমতি দেওয়া যাবে না। তার জন্য নির্দিষ্ট কারণ দেখান পুলিস সুপার। তিনি জানান, কোচবিহার খুব স্পর্শকাতর জায়গা। বেশ কিছুদিন আগেই গোষ্ঠীসঙ্ঘর্ষ ও রাজনৈতিক অশান্তি হয়েছে। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে উত্তাপে এলাকার মানুষ আতঙ্কিত। অন্য রাজ্যে গোরক্ষা ও মাংস নিয়ে যাওয়া নিয়ে সঙ্ঘর্ষ ও খুনের ঘটনার আঁচ পড়েছে এই জেলাতেও। রথযাত্রা হবে বলে আতঙ্কে অনেকে দোকান বন্ধ করে রেখেছেন। কিছু এলাকার বাসিন্দারা অন্যত্র চলে গিয়েছেন। এলাকার সম্প্রীতির বাতাবরণ নষ্ট হতে বসেছে। পাশাপাশি রথযাত্রায় যে–‌সংখ্যক মানুষ ও নেতারা আসবেন তাঁদের নিরাপত্তায় যে সংখ্যক পুলিস দরকার তা নেই। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের রিপোর্টও তাই বলছে। তাই অনুমতি দেওয়া যায় না।
আদালতে বিজেপি–‌র আইনজীবীরা দাবি করেন, কোনও গোলমাল হবে না। তা শুনে বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, কিছু হলে তার দায় কি আপনাদের নেতারা নেবেন। কোন নেতা দায় নেবেন জানান। কিন্তু তার উত্তর মেলেনি। এর পরেই বিচারপতি বলেন, অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয় এই অবস্থায়। বিজেপি-র রুজু করা এই মামলার শুনানির সময় বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী অ্যাডভোকেট জেনারেলকে প্রশ্ন করেন,‘‌বিজেপি প্রথমে ডিজি এবং পরে আইজির কাছে অনুমতি চায়। তারপরেও অনুমতি দেওয়া হয়নি কেন?’‌ বিচারপতি বলেন, ‘‌স্বয়ং রাজ্যপাল এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন। তারপরেও কেন মনে হয়নি, অনুমতি দেওয়া যায়?’‌ জবাবে অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতকে স্পষ্ট জানান, ডিজি-আইজি ওই অনুমতি দেওয়ার উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নন। পাশাপাশি তিনি জানান, রাজ্যপালের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনও সাংবিধানিক অধিকার নেই।
বিচারপতি জানতে চান, রাজ্য সরকার বিজেপির সঙ্গে আলোচনা করে এ সমস্যার সমাধান করতে পারে কি না। অ্যাডভোকেট জেনারেল জবাবে বলেন, মাত্র এক দিনের মধ্যে বৈঠক করে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব নয়। এত কম সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় পুলিসি ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়, আদালতকে জানান অ্যাডভোকেট জেনারেল। এ দিন অ্যাডভোকেট জেনারেলের রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর আদালত জানায়, পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত রথযাত্রা করতে পারবে না বিজেপি। ৯ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে আদালত। বিচারপতি বলেন, জেলা পুলিশ সুপাররা বিজেপির সংশ্লিষ্ট জেলা সভাপতিদের সঙ্গে বৈঠক করে রিপোর্ট দেবেন। তারপর আদালত ফের এই মামলা শুনবে। তবে বিজেপি প্রধান বিচারপতির দ্বারস্থ হওয়ায়, রথযাত্রার ভবিষ্যৎ ঝুলে রইল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত। 

জনপ্রিয়

Back To Top