অংশু চক্রবর্তী: যেন রূপকথা!‌ যেন স্বপ্নের মতো সুন্দর!‌ যেন অগণিত তারার মতো ঝলমলে! যেন লক্ষ প্রদীপের মতো স্নিদ্ধ!‌
কোনও উপমাই যথেষ্ট নয়। যিনি সাক্ষী থাকলেন, একমাত্র তিনিই জানেন। জানেন কত আনন্দ, কত উচ্ছ্বাস, কত শিল্প, কত শ্রদ্ধা আর ভালবাসা দিয়ে সাজানো হয়েছে দেশের সবথেকে বড় কার্নিভাল‌। বৈভব, রুচি আর হৃদয় মিলেমিশে একাকার।
শুক্রবার কলকাতার ৭১ দুর্গাপ্রতিমার এক অভূতপূর্ব শোভাযাত্রা দেখল বাংলা। দেখল দেশ। দেখল বিশ্ব। বিদায়ও যে এমন মধুর, এমন উৎসবের হতে পারে কে–‌ই বা ভাবতে পেরেছে আগে?‌ ভেবেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। এই নিয়ে চারবার হল কার্নিভাল। প্রতিবারই সে হয়ে উঠেছে আগের থেকে উজ্জ্বল। এবারও তাই। গত বছরগুলিকে ছাপিয়ে গেল সাজে, আলোয়, নাচে, ‌গানে। 
সবথেকে বেশি মুগ্ধ হয়েছেন বিদেশিরা। দৃশ্যতই তাঁরা তারিয়ে তারিয়ে দেখে গেলেন বাংলার মুখ।  তাঁদের করতালি, উচ্ছ্বাস বলে দিয়েছে, এদেশ থেকে তঁারা ফিরবেন এক আলো ঝলমলে অভিজ্ঞতা নিয়ে। 
শুক্রবার দুপুর থেকেই ভিড় শুরু হয়ে যায়। সব রাস্তা মিলে যায় রেড রোডে। অজস্র মানু্ষ জায়গা নেন দু’‌পাশে। বিকেল থেকে শুরু হয় শোভাযাত্রা।
‌কার্নিভালের শুরুতে ছিল ছৌনাচ। পরে ফের তা দেখতে পেলেন দর্শকেরা। এবার ফতেপুর দুর্গোৎসব কমিটির শোভাযাত্রায়। রাজস্থানি লোকনৃত্য দেখলেন দর্শকেরা। সৌজন্যে একডালিয়া এভারগ্রিন। 
শোভাযাত্রার এক ফাঁকে কাশী বোস লেনের কচিকাঁচারা চলে গেল মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। তিনি তাদের তুলে দিলেন চকোলেট। তেলেঙ্গাবাগানের শিশুরা ফুল দিল মুখ্যমন্ত্রীকে। তিনিও তাদের উপহার দিলেন। ছড়িয়ে দিলেন খুশির হাওয়া। বরানগরের ন’‌পাড়া পুজো উদ্যোক্তারা স্থানীয় প্রবীণাদের হুইলচেয়ারে এনেছিলেন রেড রোডের কার্নিভালে। অশক্ত শরীরের কারণে তাঁরা যেন আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন, তাই এই উদ্যোগ। প্রবীণাদের দেখে এগিয়ে এলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের সঙ্গে কথা বললেন, কুশল বিনিময় করলেন।
কার্নিভাল শুরু হয় কলকাতা পুলিশের ‘‌টর্নেডো‌ বাহিনী’র কেরামতি দিয়ে‌। কেউ বাইকের ওপর দাঁড়িয়ে সেটি চালিয়ে নিয়ে গেলেন। কোনও পুলিশ দল সওয়ার এক বাইকে। তাঁদের এই কীর্তি দর্শকদের তাক লাগানোর প্রথম ধাপ। এরপর রয়েছে একের পর এক চমক। নাচে, গানে তৈরি হয় এক অন্য পরিবেশ। নৃত্য পরিবেশন করেন অভিনেত্রী, সাংসদ নুসরত জাহান। ছিল ছৌনাচের আসর। কার্নিভালে আবার পুলিশের কারিকুরি!‌ আলিপুর বডিগার্ড লাইনস আবাসিকদের শোভাযাত্রায়। লাল টিশার্ট, জংলা প্যান্ট পরা পুলিশকর্মীরা ঢাকের তালে কুকরি হাতে খেলা দেখালেন।

 
সিমলা ব্যায়াম সমিতির শোভাযাত্রায় মহিলারা শঙ্খ হাতে পুরোভাগে। তাঁদের পুজো সাবেকি। শঙ্খধ্বনির সঙ্গেই চলল ডান্ডিয়া। দমদম তরুণ দলের শোভাযাত্রায় যোগ দিলেন রূপান্তরকামী, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। এবার তাদের পুজোর থিম ছিল তৃতীয় লিঙ্গের সংগ্রাম। 
বাঘাযতীন তরুণ সঙ্ঘ সম্প্রীতির বার্তা দিল। ভিন্ন সম্প্রদায়, ভিন্ন পোশাক। কেউ কপালে তিলক লাগিয়ে, কেউ মাথায় টুপি পরে। একদল কচিকাঁচা তেমন সেজে এসেছিল। তারা একে অ্যনের হাত ধরে এগিয়ে গেল। ঐক্যের বার্তা দিল নরেন্দ্রপুর গ্রিন পার্কের পুজো কমিটিও। এ বছর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জহর রায়ের জন্মশতবর্ষ। বেশ কয়েকটি পুজো কমিটি তাদের শোভাযাত্রায় এই ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করল, শ্রদ্ধা জানাল। হিন্দুস্থান ক্লাবের পুজো মহিলা পরিচালিত। শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন ওই পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা, রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তাদের শোভাযাত্রায় ধরা পড়ল বাংলার লোকসংস্কৃতি। অংশগ্রহণকারীরা আদিবাসী সাজসজ্জায়। মাথায় পাতা, ধামসা, মাদল হাতে। ফরওয়ার্ড ক্লাবের পুজোয় একদল কিশোরী দুর্গা সেজে এসেছিল।আবার যুব মৈত্রীর পুজোয় শিশুদের কেউ দুর্গা, কেউ গণেশ, কেউ–‌বা সরস্বতী। হরিদেবপুর ৪১ পল্লী পরিবেশ বাঁচানোর বার্তা দিল। ৭৪ পল্লীর ট্যাবলোয় ফুটে উঠল ‘‌দিদিকে বলো’‌ কর্মসূচি। বেলঘরিয়া মানসবাগ ক্লাবের একদল সদস্যের কাঁধের ওপর অত্যন্ত সন্তর্পণে চড়ে গেলেন আর এক সদস্য। এক হাতে ধুনুচি, আর এক হাতে জাতীয় পতাকা তুললেন তিনি।
একের পর এক প্রতিমা নিয়ে এগিয়ে চলেছে ট্যাবলো, বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান, ক্ষণে ক্ষণে বেজে চলেছে ঢাক। ডান্ডিয়ার সঙ্গে মিলেমিশে গেছে ছৌনাচ। রাত অনেক হলেও চোখে লেগে রইল ঘোর। কোনও শোভাযাত্রা এমন বর্ণময়, স্বপ্নিল হতে পারে?‌ রেড রোডের পুজোর কার্নিভাল না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল।
পুজোর কার্নিভালের থিম ‘‌রাঙামাটির বাংলা’‌। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের আগে প্রতিমাগুলি রাখা হয়েছিল খিদিরপুর রোডে। কার্নিভালে রেড রোডে ছিলেন কলকাতায় বিভিন্ন উপদূতাবাসের প্রতিনিধি, বিদেশি পর্যটকরা। হাজার তিনেক অতিথি আমন্ত্রিত ছিলেন। আঁটসাঁট নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল। উপস্থিত দর্শক, বিদেশি পর্যটকরা সারাক্ষণ ব্যস্ত রইলেন নিজেদের ক্যামেরা, মোবাইল, ট্যাব নিয়ে। সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিমা আসছে রেড রোডে। আর তাঁরা ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন তার ছবি তুলতে।
কার্নিভাল উপলক্ষে ছিল কড়া নজরদারি। পুলিশ মেমোরিয়ালের সামনে থেকে হেঁটে রেড রোডে আসেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তখন ঘড়িতে সময় বিকেল ৪.‌১১ মিনিট।

সঙ্গে রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র, কলকাতার নগরপাল অনুজ শর্মা। দুর্গাপুজোর কার্নিভাল গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের দরবারে। এদিন কিংস লেন, লাভার্স লেন দিয়ে এক এক করে দুর্গাপ্রতিমা আনা হয়। সবাই যাতে ভাল করে কার্নিভাল দেখতে পারেন সেজন্য লাগানো হয়েছিল বেশ কয়েকটি এলসিডি জায়ান্ট স্ক্রিন। ফোর্ট উইলিয়ামের সামনে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল কার্নিভালে আসা পুজো কমিটির ট্যাবলোগুলি। সেখান থেকেই নৃত্য পরিবেশনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ট্যাবলোগুলি। প্রত্যেক পুজো কমিটি ৩ থেকে ৪টি সুসজ্জিত ট্যাবলো নিয়ে অনুষ্ঠানে আসে। ট্যাবলোগুলির মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক বার্তা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে পথ নিরাপত্তা, গাছ লাগানো, জল বাঁচানো। আলোকসজ্জার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় সরকারি প্রকল্পগুলিকে। প্রতিটি পুজোর জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ৩ মিনিট সময়।
নিরাপত্তার জন্য ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল রাস্তা। গোটা রেড রোডে তৈরি হয়েছিল অস্থায়ী ওয়াচ টাওয়ার। বেলা ১২টার পর থেকে রেড রোডে যান চলাচল বন্ধ করা হয়। আশপাশের রাস্তাতেও যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে তাঁদের জন্য তৈরি নির্দিষ্ট মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্যালারি ও রাস্তায় ছিলেন অসংখ্য পুলিশ কর্মী। ড্রোন, পুলিশ ক্যামেরায় নজরদারি চলে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এদিন ২৫০০ পুলিশ কর্মী নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। সিসিটিভি ক্যামেরাতেও নজর রাখা হয় গোটা অনুষ্ঠানে। ‌‌
কার্নিভালের মূল মঞ্চে ছিলেন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান ব্যানার্জি, রাজ্যের মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত মুখার্জি, পার্থ চ্যাটার্জি, ইন্দ্রনীল সেন, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, মলয় ঘটক, শশী পাঁজা, তাপস রায়, নির্মল মাজি। সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত বক্সি। বিশিষ্টদের মধ্যে ছিলেন জয় গোস্বামী, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, সুবোধ সরকার, শিবাজি চট্টোপাধ্যায়, অরুন্ধতী হোমচৌধুরি। ছিলেন ইন্দ্রাণী হালদার, জুন মালিয়া, অরিন্দম শীল, দিতিপ্রিয়া, সোহম, সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিরোধী দলনেতা আবদুল মান্নান। 
কার্নিভালের প্রতিমাগুলির নিরঞ্জন এদিনই হয়। সেই মতো প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কলকাতা পুরসভা জানিয়েছে, দশমী থেকে ভাসান শুরু হয়েছে। এদিন মূলত কার্নিভালের প্রতিমাগুলি বিসর্জন হয়। বার্জ, ক্রেন থাকছেই। ঘাটপিছু সাফাই কর্মী বাড়ানো হয়েছে। ঘাটে ৩–৪ জনের বেশি লোক যাতে ঢুকতে না পারে সেদিকে নজর দেওয়া হয়েছে। থাকছে ড্রোন।‌‌  

 

 

কার্নিভালে মুখ্যমন্ত্রী। রূপসী বাংলা। পুজো কার্নিভালের শোভাযাত্রা চলছে রেড রোডে। শুক্রবার। ছবি: কুমার রায়

জনপ্রিয়

Back To Top