অশোক দাশগুপ্ত: তিনি প্রদেশ সভাপতি। কংগ্রেসের মিছিল। পোশাক খুব স্মার্ট নয়, সেদিন লম্বা ‌সাদা ফুলহাতা শার্ট, ধুতি, কেডস। হাতে একটা কঞ্চি। মিছিলের সামনে থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন, লক্ষ্য রাখছেন, আজেবাজে স্লোগান না হয়, অসভ্যতা না হয়। গোলমেলে দুই অত্যুৎসাহীকে কঞ্চির বাড়িও মারলেন। দিন কয়েক পরে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌হাতে কঞ্চি নিয়ে শাসন করছেন পিসিসি প্রেসিডেন্ট, কখনও দেখিনি তো এরকম।’ উত্তরটা মনে আছে। ‘‌আমি অসভ্যতা পছন্দ করি না। আর, দেখলি তো, যাদের মারলাম, তারা মাথা নিচু করে মেনে নিল। তোরা মানবি না, ওরা আমাকে লিডার মানে।’‌ সেই প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি আর নেই।
এত জাঁদরেল কংগ্রেস নেতা, সত্তর দশকে দলে উদ্ধত বাহুবলী অনেক, এই একজন কখনও মারপিটের রাজনীতি করেননি। অনেক পরে, জানলাম দেখলাম, দুই মারপিট–‌খ্যাত, খুনের দায়ে অভিযুক্ত নেতা তাঁর ঘনিষ্ঠ হয়ে গেছেন। ওই সময় একদিন, আমহার্স্ট স্ট্রিটে আজকাল অফিসে এসেছে। সরাসরি বললাম, ‘‌প্রিয়দা, তুমি এতটা পাল্টে গেলে?‌ এদের নিয়ে চলছ?‌’‌ তাৎক্ষণিক জবাব, ‘‌ঠিক। চলছি। কী করব, কংগ্রেসে টিকে থাকতে গেলে এমন লোকেদেরও সঙ্গে নিতে হচ্ছে। সরি। কিন্তু কিছু করার নেই। এজন্য ঘরের মধ্যে দুটো খারাপ কথা বলতে পারিস, যদি চাস।’‌ বলা হয়নি। পাশ–‌কাটানো উত্তর নয়। নিজের অবস্থানকে নির্ভুল বোঝানোর চেষ্টা নয়। কী বলব, ভাল লাগল।‌ সেই প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি আর নেই।
কংগ্রেস ছেড়ে গেছে তখন। তবু সুব্রত মুখার্জির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট। মাঝেমধ্যেই শুনি, তিক্ততা হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘‌সুব্রতর সঙ্গে তোমার সম্পর্ক এখন ঠিক কীরকম ‌প্রিয়দা?’‌‌ চমৎকার উত্তর। ‘‌চাঁদের মতো ব্যাপার। আমাদের সম্পর্কে কখনও শুক্লপক্ষ, কখনও কৃষ্ণপক্ষ। তবে, মাসে পঁচিশ দিন শুক্লপক্ষ!‌’‌ সত্তর দশকের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছাত্রনেতা, যুবনেতা। যেহেতু ছাত্র ফেডারেশন করতাম, রাজনৈতিক মিল ছিল না। এই উটকো সাংবাদিকের সঙ্গে প্রথম আলাপ ১৯৬৬ সালে, মালদায় অল বেঙ্গল ইন্টার কলেজ ডিবেট করতে গিয়ে। বয়সে কিছু বড়। প্রথমবার এই অধম ফার্স্ট, প্রিয়দা সেকেন্ড। দ্বিতীয়বার, ১৯৬৭ সালে, ফার্স্ট–‌সেকেন্ড পাল্টাপাল্টি হয়ে গেল। বলার কথা এই, ১৯৬৬ সালে সেই রাতে আড্ডা মারতে মারতে বলেছিল, ‘‌বাচ্চা বলে তোকে ফার্স্ট করেছে, সামনের বছর তোর বয়স অনেক বেড়ে যাবে, আমার বাড়বে না, ফার্স্ট হবই’। সেই টগবগে, প্রাণবন্ত রসিক প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি আর নেই।
একটা সময় এল, যখন এমন জনপ্রিয় প্রিয়রঞ্জন রাজনীতিতে কোণঠাসা, অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের কর্তা। এই ফুটবল–‌প্রেম নিয়ে কটাক্ষ করে লিখেছিলাম ছোট্ট সম্পাদকীয়। ফোন, ‘‌পলিটিক্স–‌এ কাজ নেই বলে ফুটবল করছি?‌ তুই, তোরা ভালবাসতে পারিস, আর আমি পারি না ফুটবলকে ভালবাসতে?‌’‌ কিছুদিন পর, দেশের মাটিতে নেহরু কাপ চ্যাম্পিয়ন হল ভারত। টেলিভিশনে দেখলাম, এআইএফএফ সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সাধারণ সমর্থকের মতো নাচছে!‌ সেদিন মনে মনে মেনে নিলাম, হ্যাঁ, ফুটবলপ্রেমী হওয়ার যোগ্যতা  এই মানুষটার আছে একশোয় একশো। সেই প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি আর নেই।
১৯৭৭। ইন্দিরার দল ছেড়েছেন। উত্ত্যক্ত করছিলেন সঞ্জয় গান্ধী। দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা  থেকে জগজীবন রামের  কংগ্রেস ফর ডেমোক্র‌্যাসি–‌র প্রার্থী প্রিয়রঞ্জন। হেরেছিলেন। জয়ী জনতা দলের দিলীপ চক্রবর্তী। কিন্তু, দুর্দান্ত বক্তৃতা শোনা গিয়েছিল জনসভায়। একটা কথা জীবনে ভুলব না। ‘‌ইন্দিরা গান্ধীকে দেখে কংগ্রেসে আসিনি, সঞ্জয় গান্ধীর অসভ্যতায় কংগ্রেস ছেড়ে যাব না। কংগ্রেসি ছিলাম, আছি, থাকব।’ সন্দেহ নেই, বাংলার‌ সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তা। সেই প্রিয়রঞ্জন আর নেই।
পার্লামেন্টে গেছেন, প্রথম দিকে ইংরেজিতে চোস্ত ছিল না, হিন্দিতেও না। দু’‌বছরের চেষ্টায় সব তৈরি করে নিল। কলকাতায় একটা সেমিনারে প্রিয়দার ইংরেজি শুনে মুগ্ধ। বললাম, কী করে পারলে?‌ উত্তর:‌ ‘‌চেষ্টা করলে সব পারা যায়। উত্তমকুমারের ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে নাক–‌উঁচু লোকেরা ঠাট্টা করত। পরে কী হল?‌ শিখে নিয়েছিল। উত্তমদা বলত, সবাই তো উৎপল দত্তর মতো ইংরেজি বলতে পারবে না, কিন্তু চেষ্টা করলে কিছুটা পারা যায়। উত্তমদার কথাটা মনে রেখেছিলাম। তাই পারছি। কিছুটা হচ্ছে, তবে আরও ভাল করতে হবে।’‌ সেই প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি আর নেই।
আজকের ভারতবর্ষে প্রিয়রঞ্জনের কথা বারবার মনে পড়তে বাধ্য। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আপসহীন যোদ্ধা। যখন চরম সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার চেষ্টা চলছে, কেউ আসছেন, কেউ ঢোঁক গিলছেন, প্রিয়দার আওয়াজ জরুরি ছিল। কোনও নামী মানুষের মৃত্যুতে একটা কথা বলাই হয়, অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। না। হয়ে গেল নয়, হয়ে গেছে, ৯ বছর আগে। প্রাণবন্ত মানুষটার এই ৯টা বছর প্রাপ্য ছিল না। ৯ বছর আগে থেকেই নেই। তবু। ২০ নভেম্বর দুপুর থেকে আবার জীবন্ত হয়ে গেছেন প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি। মৃত্যুর পরেও মানুষ যাঁকে ভোলে না, তিনিই তো চিরজীবন্ত। 

জনপ্রিয়

Back To Top